করোনা থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার শিক্ষণীয় ঘটনা

রফিকুল ইসলাম ।।

আমি একজন সেলফ আইসোলেটেড পারসন। যাকে বলে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। গৃহবন্দি বললে ভুল হবে, বরং বলা যায় রুমবন্দি। কিন্তু কেন? করোনা? উত্তরে বলব- না। কেননা এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত করোনা আক্রান্ত ১৬৪ জনের মাঝে আমার নামটি নেই। কাজেই আমি চরম আহ্লাদে বলতেই পারি- “আমি করোনা আক্রান্ত নই।” তাহলে কেন আইসোলেশনে গেলাম? সেরেফ সন্দেহের বশে, নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে। কেননা যে দেশে করোনা পরীক্ষার কিট নেই, পর্যাপ্ত বেড নেই, আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই, ভেন্টিলেটর নেই, ডাক্তার নেই, নার্স নেই, কোন সুচিকিৎসা নেই; শুধু নেই আর নেই। সেদেশে নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থাটা প্রথমে নিজেকেই নিতে হয়। তাই নিজ থেকেই কনডেম সেলে ঢুকে গেলাম। সেই বিভীষিকাময় দিনগুলিই আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই।

ঘটনাপ্রবাহ

আমি একজন ফার্মাসিস্ট ( ফার্মেসি ওনার)। প্রতিদিন শত-শত, হাজার মানুষের সাথে সাক্ষাৎ, মেলামেশা হয়ে থাকে। কাজেই কখন, কিভাবে, কার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছি জানিনা। কিংবা আদৌ আক্রান্ত কিনা তাও জানিনা। তবে ঘটনাপ্রবাহ থেকে সন্দেহ হলো- হয়তো আমি ইনফেক্টেড।

তাসলিমা আপা। আমার একজন বিগ কাস্টমার। বাড়ি কিশোরগঞ্জের বয়লা এলাকায়। উনার হাসব্যান্ড থাকেন মিডলইস্টে। তারিখটা ১৫ই মার্চ। তাসলিমা আপার হাসব্যান্ড এলেন দোকানে, উইদাউট এনি মাস্ক। সালাম দিলাম, বললাম- আরে ভাই কখন এলেন? হ্যান্ডশেক করলাম। বললেন- এইতো ৩/৪ দিন হবে। তো কী অবস্থা? সব খবরাখবর ভালো তো? বললেন- আলহামদুলিল্লাহ। ঔষধ নিয়ে চলে গেলেন। দ্বিতীয়বার আবার এসেছিলেন ১৯শে মার্চ। সেদিন অবশ্য মাস্ক পড়া ছিলেন। তখন তাসলিমা আপাকে বলেছিলাম- ভাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখেন, নয়তো পুলিশ কিন্তু ধরে নিয়ে যাবে।

যাইহোক, আফটার সেভেন ডেজ। ২২শে মার্চ। হালকা জ্বর। আমলে নিলাম না। প্যারাসিটামল খেলাম। না, কাজ হচ্ছে না। তাই সাথে ৫০০ মিগ্রা এজিথ্রোমাইসিনও খাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু জ্বর থামছে না, ছয় দিন পার হয়ে গেল। ভাবলাম- টাইফয়েড নয়তো? মেডিস্ক্যানে গেলাম ভিডাল ( widal) টেস্টটা করালাম। পরদিন রিপোর্ট আনলাম। নেগেটিভ। তাহলে? সন্দেহের তীর ওদিকে——-। বাসায় শেয়ার করলাম। সবাই একটু ঘাবড়ে গেলেন। শাটডাউন ফার্মেসি। আমি বন্দি কারাগারে।

এটাচড্ বাথরুমের একটা রুমে আমি একা, শুধুই একা। দরজা জানালা বন্ধ। এন্ট্রি রেস্ট্রিকটেড, কারো প্রবেশাধিকার নেই। আমার জন্য প্লেট-বাটি, জগ-মগ সবকিছু আলাদা করা হলো। দরজার পাশে একটা টুল রাখা আছে। খাবার সময় হলে ভাবী হ্যান্ড গ্লাভস পড়ে খাবারটা টুলের উপর রেখে যান। আস্তে করে দরজাটা একটু ফাঁক করে প্লেট-বাটিটা রুমে নিয়ে আসি। খাওয়া শেষে আবার তা টুলের উপর রেখে দিই। সতর্ক। ভয়ে সবাই একটু বেশিই সতর্ক। কথা বলতে গেলেও নিরাপদ দূরত্ব (৩/৬ ফুট) বজায় রেখে বলতে হয়।

এই অবস্থাটা সত্যিই পেইনফুল, বেদনাদায়ক। নিজের আপনজন, রক্তের সম্পর্কের ভাই-বেরাদার, এমনকি জন্মদাত্রী মাকেও কত দূরের মনে হয়। এ যেন হাশরের ময়দানের সেই বিভীষিকাময় দিনের মতো। যেদিন সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। আর বলতে থাকবে- ইয়া নাফসী, ইয়া নাফসী! আল্লাহুম্মা সাল্লিম, ওয়া সাল্লিম।

যাইহোক, জ্বরের সাথে যুক্ত হলো- শুকনো কাশি, হালকা সর্দি ও সামান্য গলাব্যথা। অতঃপর এর সাথে যুক্ত হলো আরো কয়েকটা উপসর্গ- বমি বমি ভাব, অবসাদগ্রস্ততা, শারীরিক দুর্বলতা ও ঘন ঘন টয়লেট দর্শন।

এহেন পরিস্থিতিতে একজন ডাক্তার, আমার ছোট ভাই আতাউর রহমানকে ফোন দিলাম। বলল- এজিথ্রোমাইসিনের পরিবর্তে cef-3 DS (400mg) সকাল-বিকাল খেয়ে যান। দু’দিন খেলাম। কিন্তু কোন উন্নতি হচ্ছে না। তাই পরিচিত আরেকজন ডাক্তার, সেলিম সাহেবকে ফোন দিলাম। তিনি বললেন- ভয়ের কিছু নেই। cef-3 DS ই খেয়ে যান। তবে কিছুদিন একটু আলাদা থাকেন। কেননা অনেকের শরীরে, বিশেষ করে যাদের ইমো সিস্টেম অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী তাদের শরীরে করোনার লক্ষণগুলো পুরোপুরি প্রকাশ পায় না। অতঃপর ১৪/১৫ দিন পর এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।

একটু ধাক্কা খেলাম। সন্দেহটা আরেকটু বাড়লো। তবে ঘাবড়াইনি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে দোয়া-ইস্তেগফার, তাসবীহ-তাহলীল, নামায ইত্যাদি পড়ে যেতে থাকলাম। আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা আর বিশ্বাস নিয়ে বলতে লাগলাম, আল্লাহ যা ফায়সালা করেন তাতেই আমি রাজি, তাতেই খুশি। কিন্তু দু’টো বিষয় নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম। (১) আমার দ্বারা যেন কেউ আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কেননা এতে সবাই গালমন্দ করবে। (২) যদি সত্যিই আল্লাহ মৃত্যু লিখে রাখেন, তবে দাফন-কাফন, জানাজা পাবো তো?

যাইহোক, চৈত্রের এই কাঠফাটা রোদে, ভর দুপুরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে সময়টা কাটতো। এভাবেই দিন যেতে লাগলো। ওষুধগুলো ঠিকঠাক মতো খেতে লাগলাম, সাথে করোনার ঔষধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ( ইনসেপ্টা কো. – reconil ) ট্যাবলেটটাও দিনে দু’বেলা খেতে থাকলাম।

বেশি বেশি পানি খেতাম, বারবার ওযু করতাম, দিনে কম করে হলেও ১০/১২ বার। অতঃপর ভিজা হাত দিয়ে শরীরটা মুছে নিতাম। আল্লাহর কসম, যতবার ওযু করেছি ততোবারই শারীরিকভাবে সুস্থতা অনুভব করেছি। এছাড়া প্রতিদিন নিয়ম করে গোসল, কাপড় ধোয়া এবং নিজ রুম ও টুকিটাকি জিনিসগুলি হেক্সিসল-লাইজল দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত রাখতাম।

দিন যায়, রাত আসে। রাতের শেষে দিন। এভাবে জ্বরের ১৬তম দিন (৬ই এপ্রিল ) থেকে আমি সুস্থ, পুরোপুরি সুস্থ। আলহামদুলিল্লাহ, সকল প্রশংসা তাঁরই।

পরিশেষেঃ এই একটি ঘটনা থেকে এক বিরাট শিক্ষা পেলাম- “প্রকৃতপক্ষে এ জীবনে কেউ কারো নয়।” একমাত্র তিনিই (রব্বে করীম) ইহকাল ও পরকালের একমাত্র ত্রাণকর্তা ও শেষ ভরসা।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া

পূর্ববর্তি সংবাদমুন্সিগঞ্জের পরিচিত আলেম মুফতি আবদুল্লাহ বিক্রমপুরীর ইন্তেকাল
পরবর্তি সংবাদকরোনাভাইরাস : তুরস্কের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূয়সী প্রশংসায় এরদোগান