মালয়েশিয়ায় যেভাবে কমছে করোনার প্রভাব

মুকিম আহমদ।। মালয়েশিয়া থেকে

গত এক সপ্তাহ যাবত মালয়েশিয়ায় করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯-এর প্রভাব কমতে শুরু করেছে। প্রতিদিন করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া রোগীদের চেয়ে কমছে অথবা সমান থাকছে। এই সংখ্যাটা প্রায় দেড়শর কাছাকাছি। কোনো কোনো দিন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা লোকের হার আক্রান্তের চেয়ে বাড়ছে।

গত কয়েকদিনে একদিনে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা মানুষের সর্বোচ্চ সংখ্যা ২২০ জন। ধারণা করা হচ্ছে, এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এবং রমজানের শুরুতে করোনার প্রভাব কমে গিয়ে মালয়েশিয়াতে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু হতে পারে। তবে পরিস্থিতির উন্নতির পেছনে নানারকম সরকারি ব্যবস্থাপনা ও উদ্যোগের বড় ভূমিকা কাজ করছে।

করোনার রোগী ধরা পড়ার পর থেকে মালয়েশিয়ার প্রধান প্রদেশ সেলেঙ্গারে ৪৩ টি হাসপাতলে স্ক্রীনিং বা করোনাভাইরাস টেস্টের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। চিকিৎসা চলছে ২৯ টি হাসপাতলে। সন্দেহভাজন রোগী কিংবা নাগরিকদের খুঁজে খুঁজে করোনা টেস্ট করানো হচ্ছে। টেস্টে পজিটিভ ধরা পড়লেই হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪৬৮৩ । এরমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২১০৮ জন। চিকিৎসা চলছে ২৪৯৯ জনের, আর মৃত্যু হয়েছে ৭৬ জনের। জানা গেছে, অসুস্থদের মধ্যে মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছেন ১০ থেকে ১২ জন।

কুয়ালালামপুরের শ্রী পাতালিং মারকাজ মসজিদে গত ফেব্রুয়ারি মাসের ২৭ তারিখ থেকে মার্চের ১ তারিখ পর্যন্ত চারদিনের একটি ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় তাবলীগ জামাতের। এর কয়েকদিন পর থেকেই মালয়েশিয়ায় করোনায় আক্রান্ত রোগী ধরা পড়তে থাকে। মালয়েশিয়ায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের বড় সংখ্যাটা এমন, যারা শ্রী পাতালিং মসজিদের ওই ইজতেমায় অংশ নিয়েছিলেন। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সেখানে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক মালয় নাগরিকের স্ক্রিনিং করা হচ্ছে। বেশিরভাগ লোকের স্ক্রিনিং হয়ে গেলেও অল্প কিছু লোককে এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। এটাকে প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ একটা ব্যাপার মনে করা হচ্ছে। ২৯ টি হাসপাতলে পূর্ণ মনোযোগ ও যত্নসহকারে করোনা রোগীদের চিকিৎসা চলছে। এরপরও গোটা মালয়েশিয়ায় লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে।

ঝুঁকির দিক থেকে কুয়ালালামপুর শহরকে রেডজোন ঘোষণা করা হয়েছে। লকডাউন-এর কঠোরতার স্তর হিসেবে এশিয়ায় মালয়েশিয়া চতুর্থ স্থানে রয়েছে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। মসজিদগুলো পুরোপুরি বন্ধ। মাইকে শুধু আযান দেওয়া হয়। জরুরী প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে কেউ বের হলে একজনের বেশি সেই গাড়িতে থাকলে জেল জরিমানা করা হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় বাজারের জন্য একটি পরিবার থেকে বের হতে পারছে মাত্র একজন। নিজের বাসা বা অবস্থান স্থল থেকে ১০ কিলোমিটারের বেশি দূরে যাওয়ার কারো সুযোগ নেই। কঠোর পুলিশি পাহারা দিয়ে এ নিয়মগুলো রক্ষা করা হচ্ছে। ১০ কিলোমিটারের আওতা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যুতবিলের কপি নিয়ে বের হতে হচ্ছে রাস্তায়। লকডাউনের তারিখ তৃতীয়বারের মতো বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে আগামী ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত।

এদিকে কঠোর লকডাউনের পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় নানারকম আর্থিক সহযোগিতা দিচ্ছে সরকার। গোটা মালয়েশিয়ায় প্রত্যেক কর্মক্ষম নাগরিককে এই করোণা সংক্রমণ কালে সরকারের পক্ষ থেকে ৬০০ রিঙ্গিত অনুদান দেওয়া হচ্ছে। সেলেঙ্গার প্রদেশের প্রতিটি তালিকাভুক্ত মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক শিক্ষকের জন্য ৮০০ রিঙ্গিত অনুদান বরাদ্দ হয়েছে।

জানা গেছে, বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেই বরাদ্দকৃত অনুদান পৌঁছে গেছে। এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছেন স্যালেঙ্গার প্রদেশের নতুন ধর্মমন্ত্রী ডক্টর মুফতি যুলকিফল। স্বাভাবিকভাবে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। কিন্তু অনলাইনে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস চলছে। আসন্ন রমজান মাসের প্রস্তুতি উপলক্ষে লকডাউনের মধ্যেই অনলাইন শপিং -এর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, রমজান মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি লকডাউনমুক্ত বা স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর প্রদেশ, যা রাজধানী কুয়ালালামপুরের সংলগ্ন, এখানকার বিভিন্ন মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনা ভাইরাস টেস্টের জন্য সরকারি উদ্যোগে ডাক্তাররা আসছেন। টেস্টে কেউ পজিটিভ হলে তাকে যত্নের সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে উন্নত ও মনোযোগী পরিচর্যায় তাদের চিকিৎসা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রথমদিকে সেলেঙ্গার প্রদেশের একটি মাদ্রাসার ৩০০ ছাত্রের বেশিরভাগই করোনা পজিটিভ ধরা পড়ে। হাসপাতালে নিয়ে তাদের চিকিৎসা করা হয়। ওই মাদ্রাসার অসুস্থ প্রায় সব ছাত্রই কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ফিরে আসে। বাংলাদেশের এক তরুণ আলেম মাওলানা হুজাইফা ছিলেন ওই মাদ্রাসার শিক্ষক। করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলে ৩/৪ দিন। তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন।

পূর্ববর্তি সংবাদনবীনগরে লকডাউন ভেঙে সংঘর্ষ, জয় বাংলা শ্লোগানে প্রতিপক্ষের পা কেটে উল্লাস
পরবর্তি সংবাদহাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন বরিস জনসন