ইতিহাসের ভয়াবহ কয়েকটি মহামারি এবং মুসলামানদের পদক্ষেপসমূহ

মাওলানা মাহমুদুল হাসান ।।

মহামারি নতুন কোনো বিষয় নয়।  অতীত জাতিবর্গের ইতিহাসেও মহামারির উল্লেখ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকগণ ঐ সকল ঘটনার কথা তাদের গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ইসলামী ইতিহাসেও বিভিন্ন  মহামারীর বিবরণ পাওয়া যায়।

ইসলামী ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন মহামারি  তা‘ঊনে আমওয়াস যা ১৮হিজরীতে হয়েছে। তাতে ২৫ হাজার লোক মারা গিয়েছিলো।

তা‘ঊনে জারেফ (৬৯হি. / ৬৮৮ঈ.), তা‘ঊনে ফাতায়াত ওয়াল আশরাফ (৮৭হি./ ৭০৫ঈ.),  তা‘ঊনে ‘আদি ইবনে আরতাত ১০০হিজরীতে, তা‘ঊনে গুরাব ১২৭ হিজরীতে, তা‘ঊনে সালামাহ ইবনে কুতাইবাহ ( ১৩১হি./৭৪৮ঈ.) ইত্যাদি প্রসিদ্ধ কয়েকটি মহামারির নাম।

ইবনে কাসীর রহ. লিখেছেন, ৬৫৬হি./ ১২৫৮ঈ.তে যখন মোগলরা বাগদাদে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং সবকিছু ধ্বংস করে দেয় তখন সকল মসজিদের জামাত ও জুমআ কয়েক মাস যাবৎ বন্ধ ছিলো। বাগদাদের মুসলমানদের রক্ত ও লাশ পচে বাতাস দূষিত হয়ে যায়। আর এ কারণে মহামারী দেখা দেয়। এমনকি তা শাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেখানে বাতাস দূষিত হয়ে অনেক মানুষ মারা যায়। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘ঊন।(ইবনে কাসীর: ১৩/২০৩)

৭৪৮ হিজরীতে শাম ও দামেশক, কুদ্স শহরগুলোতে প্লেগ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। যাতে শেষ পর্যন্ত দেড় লক্ষ মানুষ মারা যায়।

৪২৩ হিজরীতেও অনারব দেশগুলোতে এক ভয়াবহ মহামারি দেখা দেয় । গজনী খোরাসান জুরজান রাই ইসপাহান থেকে নিয়ে ইরাকের মসুল শহর পর্যন্ত এলাকা এ মহামারিতে মারাত্মভাবে আক্রান্ত হয়। বর্ণিত আছে, শুধু ইস্পাহান থেকে ৪০হাজার জানাযা বের হয়েছে।

৪২৫ হি. সিরাজে এমন ভয়াবহ মহামারি দেখা দিয়েছিল যে, মানুষ ঘরে মরে পড়ে থাকত। পরিবারের সবাই মারা যাওয়ার কারণে দরজা খোলার লোকও পাওয়া যেত না। জানাযা দাফনের লোক তো আরও পাওয়া যেত না।

এই মহামারি যখন বসরায় ওয়াসেত বাগদাদে পৌছে তখন একদিনে প্রচুর সংখ্যক মানুষ মারা যেত। বলা হয়, অল্প কয়েকদিনে সেখানে ৭০হাজার মানুষ মারা যায়।

বলখ সমরকন্দের এক মহামারি সম্পর্কে বলা হয়, সেখানে প্রতিদিন ছয় হাজার মানুস মারা যেত। তখন জানাযা দাফন কাফনের জন্যই জীবিত লোকদের ব্যস্ত থাকতে হত। শহরে দুই হাজারের অধিক এমন ঘর পাওয়া গেছে যাতে দরজা খোলার লোক নেই। পরিবারের সবাই মহামারিতে মারা গেছে।

এই শাস্তি এসেছিল পাপাচার ছড়িয়ে পড়ার কারেণ। তখন যে ঘরে মদ পাওয়া গেছে সে ঘর উজাড় হয়ে গেছে এক রাতের মধ্যে। যারা ব্যভিচারে জড়িয়েছে, তারা উভয়ে মুহুর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।

এমনও ঘটনা ঘটেছে, মৃত্যু শয্যায় এক লোক তার কাছে সংরক্ষিত মদের ভাণ্ডার ধ্বংস করতে বলেছে। যখন লোকজন তা ধ্বংস করে তখন  আল্লাহ তাকে সুস্থ করে দেন।

বলা হয়, তখন মানুষ তওবা করে। দান খয়রাত করে। সবাই মসজিদে পড়ে থাকে এবং তিলাওয়াতে মশগুল থাকে। গানবাজনার যন্ত্র ভেঙ্গে ফেলে। মদের মটকা ভাসিয়ে দেয়।

১৭৯৮ঈ. সনে মরোক্কতে মহামারী দেখা দেয়। সেখান থেকে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তা আরো বিভিন্ন শহর যেমন ইস্কান্দারিয়া, তিউনুস, আরো বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দৈনিক ১৩০ জন লোক আক্রান্ত হয়ে মারা যেত। (আল বাযযায: ৯২/১৯৯২)

ইতিহাসে এ ধরণের আরো অনেক মহামারীর কথা পাওয়া যায়। এখানে  কয়েকটি ঘটনার দিকে শুধু ইশারা করা হলো। এ সকল মহামারী ও দুর্ভিক্ষে মুসলিমদের আমল কেমন ছিলো? এবং ইসলামী আকীদার আলোকে তারা কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন? তাও কিতাবাদিতে লেখা আছে। আমাদের বর্তমান মহামারিতে কেমন পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত-  এ বিষয়ে ইতিমধ্যে আলেমদের অনেক দিকনির্দেশনা এসে গেছে।

এ বিষয়ে প্রথম করণীয় খাঁটি দিলে তওবা করা এবং আল্লাহমুখী হওয়া। সবাইকে একথা চিন্তা করা যে,  এসব বিপদাপদ হয়ত আমার আমলের পরিণতি।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাআলার নিকট আফিয়াত চাইতে হবে। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে,

اسألوا الله العفو والعافية، فإن أحدا لم يعط بعد اليقين خيرا من العافية.

অর্থ: তোমরা আল্লাহ তাআলার নিকট ক্ষমা ও সকল বালা মসিবত থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করো। কেননা ইয়াকীনের পর আফিয়াত বা নিরাপত্তা থেকে শ্রেষ্ঠ কোন নেআমত কাউকে দেয়া হয় নি। তিরমিযী: ৩৫৫৮ মুসনাদে আহমদ: ৩৪

৩. আল্লাহর ফায়সালার উপর নিজেকে ন্যস্ত করবো। এবং তাঁর ফায়সালাতেই সন্তুষ্ট থাকবো। ভালো মন্দ সব তাকদীর তাঁর পক্ষ থেকেই এ বিশ্বাস রাখবো। এরশাদ হয়েছে,

قُلْ لَّنْ یُّصِیْبَنَاۤ اِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلٰىنَا وَ عَلَی اللهِ فَلْیَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُوْن

হে নবী আপনি বলে দিন, আমাদের জন্য আল্লাহ যা নির্দিষ্ট করেছেন তা ব্যতীত আমাদের জন্য কিছু হবে না। তিনি আমাদের অভিভবক। আর আল্লাহর উপরই মুমিনের নির্ভর করা উচিত। সূরা তাওবা: ৫১

৪. আমরা মহামারি থেকে রক্ষার জন্য চিকিৎসাগত বিভিন্ন আসবাব অবলম্বন করব। কারণ এটা তাকদীর থেকে পলায়ন নয়। বরং উপায় অবলম্বন করাও একটি তাকদীর।

৫.এই রোগে আমাদের আজর ও সাওয়াব রয়েছে যদি আমরা সবর করি। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ” الطاعون شهادة لكل مسلم প্লেগ মহামারী প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শাহাদাত। -বুখারী ২৮৩০ ও মুসলিম ১৯১৬

৬. এসব অবস্থায় রোগীদের খোঁজ খবর নেয়া। এরশাদ হয়েছে,

من عاد مريضا، نادى مناد من السماء: طبت، وطاب ممشاك، وتبوأت من الجنة منزلا

অর্থ: যে ব্যক্তি কোন রোগীকে দেখতে যায়, আকাশ থেকে একজন ফেরেশতা ঘোষণা করে, তোমার জীবন সুখের হোক, এবং তোমার চলা উত্তম হোক। তুমি জান্নাত তোমার ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছো। – ইবনে মাজাহ: ১৪৪৩ইতিহাসে মহামারি ও প্লেগ রোগ এবং মুসলামানদের পদক্ষেপ

পূর্ববর্তি সংবাদসিঙ্গাপুরে করোনায় আক্রান্ত বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়ছে
পরবর্তি সংবাদজমি নিয়ে বিরোধ, মানিকগঞ্জে প্রতিপক্ষের হামলায় বৃদ্ধ নিহত