বাঙালী সংস্কৃতি : রয়ে যাওয়া কিছু প্রশ্ন

মুহাম্মাদ ইলিয়াছ খান।।

কথা হচ্ছিল পরিচিত একজনের সাথে। বাঙালি জাতির সংস্কৃতির বিষয়ে বলছিলেন। বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আমরা আসলে কতটা যত্নবান? আমরা কি এটাকে গুরুত্ব দেব? নাকি উপেক্ষা করব? দিলে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত? এ ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী? নানা কথা হয়েছিল তার সাথে। সে কথাগুলোই তুলে ধরতে চাই। খুব সংক্ষেপে।

প্রথমেই সংস্কৃতি নিয়ে কিছু প্রশ্ন। সংস্কৃতি বলতে আমরা কী বুঝি? বিশেষ করে আমাদের জাতির? কোন সংস্কৃতি গ্রহণ-বর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি কী? সংস্কৃতির কোন অংশ আমরা গ্রহণ করব? কোনটিকে বর্জন করব? এক্ষেত্রে মাপকাঠি কী?

বিজ্ঞজনদের ব্যাখ্যা হল সংস্কৃতি অনেক ব্যাপক। জীবনাচার, কর্মপন্থা, ধর্মীয় রীতি-নীতি, খেলা-ধূলা, বিনোদন সবই সংস্কৃতি। তবে কি আমাদের পূর্বপুরুষগণ যা যা করে গেছেন তার সবই আমাদের সংস্কৃতির অংশ? তাদের কিছু কাজ প্রাত্যহিক। কিছু মাসিক। কিছু বাৎসরিক। কিছু নৈমিত্তিক। এগুলোর কোনটা সংস্কৃতির অংশ? কোনটা নয়? এবং কেন?

জানা কথা, সকল কাজকে সংস্কৃতির অংশ বলে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটা হতেও পারে না। মানুষ কিছু কাজ শুধুই অভ্যাসগত করে থাকে। বিশেষ প্রয়োজনে করে থাকে। বা বিশেষ অবস্থায় করে থাকে। সেগুলোও কি সংস্কৃতির অংশ? আমাদের কি সেসবগুলোকে অনুসরণ করতে হবে? কেউ যদি এমন দাবী করেও থাকে তবুও তা সম্ভব নয়। সময়, প্রেক্ষাপট, রুচি ও মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে সেগুলো এখনের মানুষের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

তেমনি পূর্বপুরুষগণ করে গেছেন। তাই আমাদেরকেও করতে হবে। এই নীতি কতটা যৌক্তিক? আমরা তো একবিংশ শতাব্দীর মানুষ। ‘বিবেকপূজা’র যুগের মানুষ। এই যুগেও এমন অযৌক্তিক নীতি আমরা কি করে অনুসরণ করতে পারি? কোন কাজ করা কিংবা বর্জন করার মাপকাঠি কি পূর্বপুরুষদের করা কিংবা বর্জন করা? চাই তা ভালো হোক বা মন্দ? নাকি অন্য কিছু? রয়ে যায় এমন অনেক প্রশ্নই।

এখানেই শেষ নয়। আরো প্রশ্ন রয়ে যায়। কোন সময়ের মানুষদের কাজগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হবে? হাজার বছর নাকি কয়েক হাজার বছর আগের, শত বছর নাকি কয়েক শত বছর আগের? এক শ্রেণীর বাঙালির সাথে অন্য শ্রেণীর সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব হলে কোনটি চূড়ান্ত হবে? এক যুগের বা শতাব্দীর বাঙালির সাথে অন্য যুগের বা শতাব্দীর বাঙালির দ্বন্দ্ব হলে কোনটি প্রাধান্য পাবে? বাঙালি জাতির ভৌগলিক সীমারেখা কতটুকু? পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতি কি বাঙালি সংস্কৃতির অংশ? একসময় তো উভয় বাংলা একসাথেই ছিল।

আরো ভাবার বিষয় আছে। তাদের মাঝে যা প্রচলিত ছিল তার সবই কি কল্যাণকর? তাতে কি মন্দ বলতে কিছু ছিল না? আমাদের সমাজে তো অনেক কুসংস্কার আছে। কুপ্রথা আছে। এখনো বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মাঝে আছে। যেগুলো হয়ত শত শত বছর ধরে চলে আসছে। এগুলোও কি আমাদের সংস্কৃতি? আমরা কি এগুলোকে অনুসরণ করব? শুধু এই বলে, এগুলো আমাদের সংস্কৃতি। এগুলো পূর্বপুরুষেরা করে গেছেন।

আশা করি এই মাপকাঠির সাথে কোন পাঠক একমত নন। তাহলেই বড় একটি প্রশ্ন দাঁড়ায়। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং কুপ্রথা ও কুসংস্কারের মাঝে পার্থক্য রেখাটা কী হবে?

একটা পার্থক্য রেখা তৈরী করা যায়। ভালো অভ্যাসগুলোকে বলব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। আর মন্দগুলোকে বলব কুপ্রথা ও কুসংস্কার। এরপরও কিন্তু বিস্তর প্রশ্ন রয়ে যায়। এই ভালো-মন্দ নির্ধারণ করবে কে? সমাজের কোন শ্রেণী ভালো বললে কাজটি ভালো হবে? কারা মন্দ বললে সেটি মন্দ হবে? বাঙালী মুসলিমগণ নাকি বাঙালী হিন্দুগণ? বাঙালি শিক্ষিত সমাজ নাকি অশিক্ষিত সমাজ? বাংলার গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারীগণ নাকি শহুরে মানুষজন?

সমাজের একেক শ্রেণীর কাছে ভালো-মন্দ একেক ধরণের হয়ে থাকে। তাই এক শ্রেণী কোন কাজকে ভালো বলবে। অন্য শ্রেণী সেটাকে বলবে মন্দ। এ সকল ক্ষেত্রে ফায়সালা হবে কিসের ভিত্তিতে? এমন অসংখ্য কেন রয়ে গেছে। হয়তো কোনদিন এগুলোর সমাধান হবে না।

এক্ষেত্রে একটি বিষয়ের সমাধান আগে করতে হবে। ভালো মন্দ নির্ধারণের মৌলিক মাপকাঠি কী? কে তা নির্ধারণ করতে পারেন? এটা নির্ধারণ করতে হলে কী কী প্রয়োজন? কোন কোন গুণবিশিষ্ট সত্তা এটি করতে পারেন?

যিনি মানুষের যাবতীয় ভালো-মন্দ সম্পর্কে অবগত। যিনি মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত। যার কাছে মানুষের কোন অবস্থা অজানা নয়। মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের সম্ভাব্য সকল দিক যার সামনে স্পষ্ট। তিনিই কেবল পারেন ভালো-মন্দের মাপকাঠি ঠিক করতে। কোন একটি যদি গুণ কম থাকলে হবে না। তিনি ভালো-মন্দের মৌলিক মাপকাঠি নির্ধারণ করতে পারবেন না। কিংবা তা চূড়ান্ত হবে না।

এই শেষ নয়। ভালো-মন্দ কেউ নির্ধারণ করলেই কি সবাই তা মেনে নেবে? মেনে নিতে বাধ্য হবে? হবে না। মানুষ মানুষের বিবেকের গোলাম নয়। মানুষের তৈরী ভালো-মন্দের ফায়সালা মানতে বাধ্য নয়। তাই ভালো-মন্দ নির্ধারণ হতে হবে এমন সত্তার পক্ষ থেকে যার আদেশ-নিষেধ সকলেই মেনে নিতে বাধ্য। যার সামনে সকলেই নত হয়। যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। আমাদেরকে খোঁজ করতে হবে কে এমন সত্তা? কার সামনে সবাই নত হয়? কার সিদ্ধান্তের পর আর কারো সিদ্ধান্ত চলে না? কে তিনি? তিনি কে? রয়ে গেল এ প্রশ্নও।

বছর ঘুরে একবার আসে পহেলা বৈশাখ। এ দিন আমরা আমাদের সংস্কৃতির কোন অংশটুকু পালন করব? যুক্তি ও বিবেক কী বলে? এ দিন করা উচিত আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো। সবচেয়ে ব্যাপক প্রচলিত ভালো কাজগুলো। যেন আমাদের সংস্কৃতির ভালো দিকগুলো ফুটে ওঠে। আমাদের সংস্কৃতি সকলের সামনে ভালো সংস্কৃতি হিসেবে ভাস্বর হয়ে ওঠে। বিশ্ববাসীর সামনে আমরা গৌরবময় সংস্কৃতির অধিকারী হিসেবে গর্ব করতে পারি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের সামনে আমরা আমাদের ভালোটা তুলে ধরতে পারি।

আমাদের দেশের মূলধারা তো ইসলাম। খুব সীমিত অংশ ছাড়া বাকি সবাই মুসলিম। তাই আমাদের সংস্কৃতির মূল অংশ জুড়েও আছে ইসলাম। আর ধর্মীয় রীতি-নীতিও তো সংস্কৃতির অংশ। বিজ্ঞ সমাজবিজ্ঞানীগণই এমনটা বলেছেন। পহেলা বৈশাখে আমরা আমাদের সংস্কৃতির প্রদর্শনী করে থাকি। সেদিন কেন আমাদের সংস্কৃতির বিশেষ অংশ ধর্মীয় ইবাদতগুলোকে তুলে ধরব না?

ইসলামে নির্দেশিত ইবাদত মানুষ প্রতিদিন অনেক বার পালন করে। পাঁচ বার নামায আদায় করে। নামাযের আগে অযু করে। কুরআন তেলাওয়াত করে। কুরআনের আলোচনা করে। সকাল-সন্ধ্যায় যিকির করে। শত শত বছর ধরে দেশে ব্যাপকভাবে এগুলো পালিত হয়ে আসছে। শীত কিংবা গরম, রোদ কিংবা বৃষ্টি কোন অবস্থাই এক্ষেত্রে বাধা হয় না। প্রচণ্ড শীতেও অজপাড়া গ্রামের চাদর না থাকা ঐ কৃষকটিও মসজিদে যায় নিয়মিত। চৈত্রের দুপুরেও মসজিদ খালি থাকে না। বৃষ্টি মাথায় করে ৭০ বছরের বৃদ্ধ মানুষটিও যায় মসজিদে। বাধা হয় না কোন কিছুই।

এগুলো আমাদের সংস্কৃতির অংশ। গৌরবময় অংশ। ‍ৃআমাদের সংস্কৃতির এই গৌরবোজ্জ্বল অংশকে কেন আমরা তুলে ধরব না? কেন এগুলোকে উপেক্ষা করব? পহেলা বৈশাখে যদি কোন কিছু তুলে ধরতে হয় তাহলে তো এগুলো তুলে ধরার অধিক উপযুক্ত।

আমরা এখন সংস্কৃতির নামে গান-বাজনা করে থাকি। মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে থাকি। আমাদের দেশের মানুষ কি প্রতিদিন পাঁচবার করে গান-বাদ্য করে থাকে? প্রতিদিন মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করে? কিংবা সপ্তাহ অন্তর? তাহলে মানুষ যে কাজগুলো নিয়মিত করে সেটা সংস্কৃতির অংশ না হয়ে অন্যটা সংস্কৃতির বিশেষ অংশ হয় কি করে? যুক্তি ও বুদ্ধির দাবী কী? বিবেক কী বলে? মুক্ত চিন্তা নিয়ে ভাবলে কী ফলাফল আসে? এসব প্রশ্নের আসলেই কোন উত্তর নেই। জানি না কোন দিন কেউ দেবে কিনা এসব প্রশ্নের উত্তর। সংস্কৃতিমনাদের উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।

পূর্ববর্তি সংবাদউন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা হচ্ছে আল্লামা আহমদ শফীকে
পরবর্তি সংবাদকরোনায় মার্কিন সেই রণতরির নাবিকের মৃত্যু