এনাম হাসান জুনাইদ ।।
ভারত বর্ষের ইতিহাসে যে সব মুসলিম শাসক ইতিহাসকে উজ্জ্বল করেছেন ন্যায়পরায়ণতা, দুনিয়াবিমুখতা, এবং কর্ম ও কীর্তিতে, সুলতান মাহমুদ বিন মুহাম্মদ গুজরাটি ছিলেন তাদের অন্যতম।
তার পুরো নাম আবুল ফাত্তাহ সাইফুদ্দিন মাহমুদ বিন মুহাম্মদ। তিনি ৮৪৯ হিজরীর ১০ রমজানে জন্মগ্রহণ করেন।
দাউদ শাহের পরে ৮৬২ হিজরীতে তিনি সিংহাসনে বসেন । সে দিনটি ছিল এক স্মরণীয় দিন । তার রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা ছিল একদিকে মালওয়া, অন্যদিকে সিন্ধু। তিনি রাজত্ব পরিচালনা করেন ৫৫ বছর। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে কোন মুসলিম দেশ দখলের ইচ্ছাও তার অন্তরে জাগে নি। অন্যের দিকে চোখ তুলে তাকাননি। যখন শক্তিশালী কোন দুর্বলের উপর আক্রমণ করত তিনি তার সাহায্যে ছুটে যেতেন। তিনি ছিলেন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী। শরীয়তের বিভিন্ন বিধান তার আমলের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এত বড় রাজত্ব পরিচালনা তাকে শরীয়তের হুকুম আহকাম পালন থেকে তাকে বাধা দিতে পারত না।
তার আমলে নতুন নতুন অনেক শহর আবাদ করা হয়েছিল। বিভিন্ন মসজিদ মাদ্রাসা খানকা চালু করা হয়েছিল। কৃষি ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি করা হয়েছিল। বিভিন্ন রাস্তার পাশে ফলদার ছায়াদার গাছ রোপণ করা হয়েছিল। মানুষকে এসব বিষয়ে উৎসাহিত করা হত। বিভিন্ন জায়গায় কূপ খনন করা হত। মানুষকে কূপ খনন ও ঝর্ণা নির্মাণে সহায়তা করা হত।
তার এ মনোভাবের কারনে বিভিন্ন দেশ থেকে বড় বড় ডাক্তার, প্রকৌশলি তার দরবারে আগমন করত। তারা গুজরাটে এসে বিভিন্ন জিনিস নির্মাণ করতে লাগলেন। ফলে গুজরাট হয়ে গেল সবুজ শ্যামল এবং বিভিন্ন ফলের বাগানে সমৃদ্ধ নগরী। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজনের আগমনের ফলে গুজরাট থেকে মূল্যবান কাপড় অন্যান্য দেশে রফতানি করা হত।
সুলতান আলেম ওলামাদের তত্ত্বাবধান করতেন। তিনি ইলম এবং আহলে ইলেমদের ছায়ায় গড়ে উঠেছেন, তাই তার কাছে আরব দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হতেন। এভাবে গুজরাট হয়ে গেল আলেমদের পূণ্যভূমি। গুজরাটে আরব দেশ থেকে মুহাদ্দিসগণ আগমন করতে লাগলেন। এভাবে হিন্দুস্তানের মধ্যে সব দিক থেকে গুজরাট সবার উপরে উঠে গেল।
তিনি সংযম এবং লাজুক প্রকৃতির লোক ছিলেন। উত্তম চরিত্র ছিল তার ভূষণ। উচ্চ মনোবল আর অদম্য স্পৃহা ছিল তার বৈশিষ্ট্য। ছিলেন মহানুভবতার মূর্তপ্রতীক। সাধারনের প্রতি অনেক দান দখ্যিনা করতেন। ঐতিহাসিকরা তার গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক পৃষ্ঠা লিপিবদধ করেছেন।
৯১৬ হিজরীতে তিনি ‘নহরওয়ালা’ নামক স্থান পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি জীবিত আলেমদের সাথে স্বাক্ষাত করেন। এবং মৃতদের জিয়ারত করেন। তাফসীর ও হাদীসের মজলিসে প্রতিষ্ঠা করেন। আলেমদেরকে বিভিন্ন পুরস্কার দেন। তাদের নিকট দোয়া চান।
মৃত্যুর আগে শায়খ আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এর কবরের পাশে তিনি নিজের কবর রচনা করেন। এবং জীবিত থাকতেই নিজের কবর দেখাশোনা করতেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে তিনি নিজের কবরে নেমে বলেন, হে আল্লাহ, এটা আমার আখেরাতের প্রথম মঞ্জিল। আপনি একে আমার জন্য সহজ করে দিন। তাকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে রাখুন। অতঃপর কবরকে রূপা দিয়ে ভরে সেই পরিমাণ রূপা সদকা করলেন। তাঁর ওফাত হয়েছিল ৯১৭ হিজরী ২ রমজান সোমবার আসরের সময়। তার রাজত্বকাল ছিলো ৫৫ বছর।
















