মহামারি সংক্রান্ত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ : পরিচিতিমূলক কয়েকটি কথা

মাওলানা মাহমুদুল হাসান জুবাইর।।

হাফেজ ইবনে হাজার রহ. রচিত মহামারি সংক্রান্ত একটি বিখ্যাত কিতাব  ‘বাযলুল মা‘ঊন ফি ফাযলিত তা‘ঊন’ । লেখক কিতাবটি তখন  রচনা করেছিলেন যখন তার দুই কন্যা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে শাহাদাত লাভ করেন।

লেখক নিজেই কিতাবটি রচনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, বাদশাহ মুআইয়িদ এই মহামারী যেন আল্লাহ তাআলা উঠিয়ে নেন এ লক্ষে সম্মিলিতভাবে সকলে তিন দিন রোজা রেখে এক মাঠে জমা হয়ে ইস্তিসকার নামাজের মত নামাজ পড়ে দুআ করেছিলেন।

বাদশাহের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তিনি তখন বাদশাহের দরবারে উপস্থিত হননি।  বরং তিনি তার বিরোধিতা করে এই কিতাব রচনা করে প্রমাণ করেছেন, এটিই সুন্নাহ সম্মত পন্থা নয়। এবং তিনি বাদশাহের মতের বিপরীত ফতওয়া প্রদান করেছেন। তখন অধিকাংশ আলেমের ফতওয়া ছিলো, এমন মনগড়া আমল তরক করাই উত্তম। পাশাপাশি কিতাবটিতে তিনি তা‘ঊন সম্পর্কে ইসলামের সকল দিকনির্দেশনা, করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

 

গ্রন্থটিতে কী আছে?

এই কিতাবে  ৫টি অধ্যায় এবং ১টি পরিশিষ্ট রয়েছে।

প্রথম অধ্যায়: তিনি তাতে মহামারী বা তা‘ঊনের মূল উৎস বর্ণনা করেছেন যে, তা মূলত পূর্ববর্তী উম্মতের জন্য শাস্তি ছিল, আর তা এই উম্মতের জন্য রহমত। তিনি এই অধ্যায়কে চারটি অনুচ্ছেদে সাজিয়েছেন এবং তাতে অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়: তা‘ঊন-এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এবং তার শাব্দিক অর্থ বর্ণনা করে এ ব্যাপারে ডাক্তারদের বিভিন্ন উক্তি তুলে ধরেছেন। এবং কিছু হাদিস শরীফ উল্লেখ করেছেন। আর হদীস শরীফে রয়েছে, যে তা‘ঊন জিনদের আঘাত  যা তারা মানুষকে করে থাকে। এবং এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তৃতীয় অধ্যায়ঃ তিনি তাতে তা‘ঊন মুসলমানদের জন্য শাহাদাত হওয়ার স্বপক্ষে অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন। শহীদের অর্থ, শহীদদের মর্যাদা ও শাহাদাতের বিভিন্ন শর্ত নিয়েও আলোচনা করেছেন। এবং মদীনা শরীফে তা‘ঊন আসবে না একথা হাদীস থেকে বর্ণনা করেছেন। সাথে সাথে এই হাদীসের বিভিন্ন ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছেন।

চতুর্থ অধ্যায়ঃ তা‘ঊন বা মহামারী চলা কালীন এ সম্পর্কিত বিধান আলোচনা করেছেন। যেমন, আক্রান্ত এলাকা থেকে বের হওয়া বা সেখানে যাওয়া সম্পর্কে। এবং ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর শামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে তা‘ঊন সম্পর্কে সংবাদ পেয়ে সার্গ নামক এলাকা থেকে প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে। এবং এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরামের মাঝে মতানৈক্য। সাথে সাথে এ অধ্যায়ে রোগ সংক্রমণ হয় কিনা, এ নিয়ে হাদীস থেকে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

পঞ্চম অধ্যায়: মহামারীর সময় মানুষের করণীয় কী? তা উল্লেখ করেছেন।  যেমন, তা‘ঊন উঠিয়ে নেয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করা। এবং এ সম্পর্কে আকীদার উপর উত্থাপিত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আর মহামারী উঠিয়ে নেয়ার জন্য ইস্তিস্কার নামাজের মত সমবেত হওয়া বৈধ কি না? এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, যা ছিলো এই কিতাব রচনার মূল উদ্দেশ্য।  এবং তা‘ঊন কি মরযে মাখূফ অর্থাৎ এমন ভয়ানক রোগ কি না যার ফলে তখন আক্রান্ত ব্যক্তির ওয়ারিসদের ওয়ারাসাত যেমন, ঐ অবস্থায় তিন তালাক প্রাপ্ত মহিলা তার স্বামীর ওয়ারিস হবে কি না?  আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত অন্যান্য আদাব ও রোগী দেখতে যাওয়ার আদব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

পরিশিষ্টে সংক্ষিপ্তভাবে  ইসলামী ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন মহামারী যা তার যুগ ৮৪৮ হিজরী পর্যন্ত ঘটেছিল তা উল্লেখ করেছেন। তারপর একটি অনুচ্ছেদে তা‘ঊন সম্পর্কে সাহিত্যিকদের বিভিন্ন কবিতা ও বাণী উল্লেখ করেছেন।

প্রত্যেক অধ্যায় শেষে উক্ত অধ্যায়ে উল্লেখিত বিভিন্ন কঠিন শব্দের শাব্দিক বিশ্লেষণ ও যাবত বা উচ্চারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন।

তাছাড়া একই বিষয়ে বহু কিতাব থেকে অনেক হাদীস ও বিভিন্ন ব্যাখ্যা এবং ইসলামের মূল ফিকহকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে  তিনি জমা করেছেন, যা আলেম ও আহলে ইলমের  উলূমুল হাদীস ও ফিকহ বিষয়ে অনেক উসূলী আলোচনা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করার ক্ষেত্রে অনেক সহায়ক হবে, ইনশাআল্লাহ।

 

লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবনী

ইবনে হাজার রহ. -এর নাম হাফেজ আহমদ বিন আলী ইবনে হাজার আসকালানী। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ৭৭৩ হিজরীতে। ছোটকালেই তাঁর আব্বা আম্মা ইন্তেকাল করেন। তাকে লালন পালন করেন তার আব্বার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবু বক্কর নুরুদ্দিন। তিনি মিশরের একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি তার দেখাশোনা এবং  লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

যখন তিনি মক্কায় থাকতেন তাকে তার সাথে রাখতেন। ৯বছর বয়সে কুরআন মুখস্থ করেন। পাশাপাশি আরও কিছু কিতাব মুখস্ত করেন যেমন আব্দুল গনি আল-মাকদিসীর ‘উমদাতুল আহকাম, মুখতাসার লিবনে হাযেব, মানহাজুল উসূল লিল কাযী বায়যাবী, আলফিয়া লিল হাফেজ ইরাকি, আলফিয়া লিবনে মালিক ইত্যাদি। তিনি তখনকার জমানার বড় বড় শায়েখদের কাছে হাদিস অধ্যায়ন করেন। তার শায়খদেরে মধ্যে রয়েছে,  যায়নুদ্দীন আল-ইরাকী, ইবনুল  মুলাক্কিন মাজিদুদ্দীন শীরাযী রহ.। এভাবে হাফেজ সাখাবী রহ. তার ৬০৫ জন শায়খের নাম উল্লেখ করেছেন।

তিনি বহু কিতাব রচনা করেছেন। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো, বুখরী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফত্হুল বারী, বুলূগুল মুরাম, এবং আল ইসাবাহ ফি মা‘রিফাতিস সাহাবা ইত্যাদি।

তিনি ইন্তেকাল করেন৮৫২ হিজরীতে।

ইবনে ফাহাদ উল্লেখ করেন, সা‘দুদ্দীন  ইবনুদ্দায়রী আল হানাফী তার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাকে তার অবস্থাসম্পর্কে জিজ্ঞাসাকরেছেন। হাফেজ তখন আবুল কাসেম যিমাখশারিরকয়েকটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।  তিনি বলেন,

قرب الرحيل إلى ديار الآخرة    فاجعل إلهي خير عمري أخره.

و ارحم مبيتي في القبور و وحدتي    و ارحم عظامي حين تبقى ناخره.

فأنا المُسيكين الذي أيامه     ولَّت بأوزار غدت متواتره.

فلئن رحمت فأنت أكرم راحم    فبحار جودك يا إلهي زاخره.

আমার সওয়ারী আখেরাতের  ঘরবাড়ির নিকটে পৌঁছে গেছে। ইয়া এলাহি আমার শেষ আমার জন্য কল্যাণকর বানিয়ে দিন। কবরে আমার রাত্রিযাপনে রহম করুন, আমাকে রহম করুন একাকিত্বে। আমার হাড়ের উপর রহম করুন, যখন তা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আমিতো মিসকিন যারদিন গুজরান হয়েছে লাগাতার গুনাহের বোঝা নিয়ে। যদি আপনি রহম করেন, আপনি তো সবচেয়  বড় রহমকারী।  আপনার দানের  সমুদ্র হে আল্লাহ!পরিপূর্ণ যার কোন শেষ নেই।

লেখক : শিক্ষক, বিক্রমপুর বাদশাহী মাদরাসা 

পূর্ববর্তি সংবাদশ্রমিকদের পাশে নেই নেতারা, কল্যাণ তহবিলের নামে তোলা চাঁদা গেল কোথায়
পরবর্তি সংবাদবরিশালে মদ বিক্রি ও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলী