শরীফ মুহাম্মদ।।
জীবন হরণকারী করোনা ভাইরাস গোটা দুনিয়াকে ঘরে আবদ্ধ করে ফেলেছে। দেশে দেশে চলছে লকডাউন। ঘর বন্দী জীবন কাটছে কোটি কোটি মানুষের। কিছু দেশে মসজিদে নামাজের জামাত পড়া বন্ধ হয়ে গেছে, মুসল্লির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ হয়েছে আর কিছু দেশে। নিয়ন্ত্রিত মুসল্লী সংখ্যা নিয়ে সরকারিভাবে মসজিদে জামাতের সিদ্ধান্ত হয়েছে বাংলাদেশেও। এ পরিস্থিতিতে এসেছে রমজানুল মোবারক।
বাংলাদেশ রমজানের প্রথম রাত যাচ্ছে আজ। এদেশে রমজানের রাত মানেই রাত আটটার পর থেকে মহল্লার মসজিদে মুসল্লিদের ভিড়। এশার নামাজ তারাবিতে অংশ নেন দলে দলে মুসল্লি। রাত এগারোটা পর্যন্ত গলিতে গলিতে রমজানের মুসল্লিদের বিচরণ কেনাকাটা চলতে থাকে। আর এর মাঝে ঘন্টা দেড়েক মসজিদগুলোতে চলে নামাজ, এশা -তারাবি। মাইক ও সাউন্ড বক্সের আওয়াজে কোরআন তেলাওয়াতের সুর ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশে। আজ সেসব চিত্র কিছুই চোখে পড়ে নি।
করোনা ভাইরাস যেন মুসলিম দেশগুলোর রমজানের মুখরিত চিত্রটাই পাল্টে দিয়েছে। নির্জনতার বিষাদ ভর করেছে চারদিক। আতর সুবাসিত পরিবেশ ‘উধাও’ হয়ে গেছে। দুঃখভরা এ পরিস্থিতির মধ্যেই উল্টোদিকে তৈরি হয়েছে অন্যরকম এক চিত্র। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব কটি শহরের ঘরে ঘরে আজ তারাবির তেলাওয়াতের ধ্বনি শোনা গেছে।
ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের কয়েকটি সূত্র ও অনুসন্ধান থেকে ধারণা পাওয়া গেছে যে, দেশজুড়ে বিভিন্ন বাসায় প্রায় ১০ লাখ তারাবির জামাত আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কোথাও খতম তারাবি, কোথাও সুরা তারাবি। কোথাও পরিবারের তিনজন মিলে জামাত হয়েছে, কোথাও ছিলেন চারজন পাঁচজন। বাংলাদেশের শহরগুলোতে রমজানের প্রথম রাতের তারাবি এভাবেই কেটেছে।

যেসব পরিবারে কোনো একজন সদস্য হাফেজ রয়েছেন, অথবা কোনো একজন হাফেজ সাহেবের খেদমতের ব্যবস্থা করা গেছে, সে বাসাতেই ঘরোয়াভাবে খতম তারাবির সূচনা হয়েছে আজ রাতে। যেখানে হাফেজ সাহেব নেই, কিন্তু সহিহভাবে কিছু তেলাওয়াত করার যোগ্য একজন মানুষ রয়েছেন, সেসব বাসায় সুরা তারাবি হয়েছে আজ। অনেকেই একা একা তারাবি পড়েছেন বাসায়।
গত কিছুদিন যাবত করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ওয়াক্তিয়া নামাজে পাঁচজন এবং জুমার নামাজে দশজন মসজিদে উপস্থিত হওয়ার নিয়ন্ত্রিত সিদ্ধান্ত এসেছে। গতকাল সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়, মসজিদের তারাবীতে সর্বোচ্চ ১২ জন অংশ নিতে পারবেন। এ পরিস্থিতিতে দ্বীনদার মুসলিম পরিবারগুলোতে কুরআন শরীফ সহিহভাবে তেলাওয়াত করে নামাজের ইমামতি করতে পারে, এমন অন্তত একজন পরিবারের সদস্য প্রস্তুত হওয়ার ইচ্ছা বা প্রত্যয় গড়ে উঠছে।
আধুনিক শিক্ষিত দ্বীনদার অনেক পরিবারে পরিবারের একজন শিশু-কিশোর সদস্যকে হাফেজ বানানোর আগ্রহ গড়ে উঠছে। লকডাউন পরিস্থিতিতে মসজিদের জামাতে শরিক হতে না পারার বেদনা থেকে শহুরে বহু মুসলিম পরিবারে এমন মনোভাব জেগে ওঠার কথা জানা গেছে তাবলীগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও মহল্লার ইমাম-মুয়াজ্জিনদের কাছ থেকে। সংকট, দুঃখ ও অক্ষমতার ভেতর থেকেই অন্যরকম একটি প্রেরণার জন্ম হতে চলেছে। করোনা ভাইরাসের এই জটিল সংক্রমণ এবং তা থেকে আত্মরক্ষা জনিত সুরক্ষা কৌশল হিসেবে যে ঘরবন্দী জীবনের চর্চা চলছে, তার মধ্যেই এদেশে রমজানের প্রথম রাতের প্রায় অর্ধেকটা সময় কেটে গেছে।
মুখরিত পরিবেশ নেই, কিন্তু ঘরে ঘরে ছোট্ট ছোট্ট তারাবির জামাত হয়েছে এ রাতে। এ যেন নির্জনতার মধ্যেও এবাদতের এক অন্যরকম ঘরোয়া উৎসব। আল্লাহর কাছে নিবেদিত বান্দারা সুখে দুঃখে সঙ্কটে নিজেদের সমর্পণ করার উপায় নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছেন। জীবন ঘরবন্দি হলেও তারাবি ও ইবাদত থেকে নিজেদের গাফেল রাখতে রাজি নন নিষ্ঠাবান মুসল্লী রোজাদাররা। রমজানের প্রথম রাতের তারাবিতে এ চিত্রটাই ফুটে উঠেছে।
















