করোনায় নারায়ণগঞ্জে হিন্দু ব্যবসায়ীর মৃত্যু: সৎকারে ছিল না আপন কেউ!

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: নারায়ণগঞ্জে  করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া এক হিন্দু ব্যবসায়ীর পাশে মৃত্যুর সময় কেউ ছিল না। মারা যাওয়ার পর ঘণ্টাখানেকেরও বেশী ভবনের সিঁড়িতেই পড়েছিল তার মৃতদেহ।

জানা গেছে, ওই ব্যবসায়ী তার ছয় বন্ধুকে নিয়ে  একটি সাত তলা ভবন তৈরি করেছিলেন সবাই কাছাকাছি থাকবেন বলে। কিন্তু করোনাভাইরাসের  যখন তিনি মারা গেলেন, তখন তিনি ছিলেন একা।

ছয় বন্ধুর সঙ্গে খুব সখ্যতা ছিল ওই ব্যবসায়ীর। ভবনটি তৈরির পর ফ্ল্যাটগুলো ভাগাভাগি করে বসবাস করতে শুরু করেন তারা।

কিন্তু হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়েন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ওই ব্যবসায়ী। করোনাভাইরাস তার দেহে জেঁকে বসেছে এমন আলামত পাওয়া যাচ্ছিল।

পরিবারে স্ত্রী এবং দুই মেয়ে। স্ত্রীও খানিকটা অসুস্থ।

তবে রবিবার তারা চেষ্টা করেছিলেন ব্যবসায়ীকে হাসপতালে নেওয়ার। কিন্তু সিঁড়ি পর্যন্ত নিতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

ব্যবসায়ী হিন্দু হলেও মৃত্যুর পরে তার পাশে কেউ না থাকায়  সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ডের মুসলিম কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার নেতৃত্বে একদল স্বেচ্ছাসেবী ওই ব্যক্তির শেষকৃত্য করেন।

কাউন্সিলর  খন্দকার  জানান, সাত তলা ভবনের চতুর্থ তলায় স্ত্রী, কিশোরী দুই মেয়ে আর মাকে নিয়ে থাকতেন ওই ব্যবসায়ী।

পরিবারের সদস্যদের কাছে তিনি শুনেছেন যে গত দুই-তিন দিন ধরে কাশি আর শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন ওই ব্যবসায়ী, এছাড়া আর অন্য কোন শারীরিক সমস্যা তার ছিল না।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের এসব উপসর্গ থাকার কারণে তাদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। ফলে উপায়ান্তর না দেখে ব্যবসায়ীর স্ত্রী আর তাই দুই মেয়ে মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

তবে খুব বেশি দূর নিয়ে যেতে পারেননি তারা। চার তলা থেকে মাত্র কয়েকটি সিঁড়ি অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। এর পরপরই মারা যান তিনি, আর সেখানেই অনেক সময় পড়ে থাকে তার মরদেহ – জানাচ্ছিলেন মাকছুদুল আলম খন্দকার।

“এমনকি তার স্ত্রী আমাদেরকে বলে যে, মৃত্যুর আগে একটু পানি চেয়েছিল তারা। সেই পানি পর্যন্ত কেউ দিতে আসেনি।”

কাউন্সিলর খন্দকার জানান, মৃত ব্যক্তির ভাই ও শ্যালকের কাছ থেকে তিনি খবর পান। তিনি বলেন, তারা তাকে ফোন করে মৃতদেহ সৎকারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন।

নারায়ণগঞ্জের এই কাউন্সিলর করোনাভাইরাসে মৃত কিংবা কোভিড-১৯ রোগের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া বেশ অনেকের মরদেহ দাফন বা সৎকার করেছেন। তিনি যখন ফোনটি পান, তখন তিনি করোনাভাইরাসে মৃত আরেক ব্যক্তির দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছিলেন।

কাউন্সিলর খন্দকার বলেন, “আমরা গিয়ে দেখি যে সাড়ে তিন তলার সিঁড়িতে লম্বালম্বিভাবে লাশ পড়ে আছে।”

এর পর ওই ব্যক্তির ফ্লাটে গিয়ে তার স্ত্রীর সাথে কথা বলেন মি. খন্দকার। তখন তার স্ত্রী তাদেরকে ওই ব্যক্তির শেষকৃত্য করার অনুরোধ করেন।

“আমরা গিয়ে বলি যে আপনার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন কেউ-ই তো আসতেছে না। আমরা তো মুসলিম। আমরা যদি সৎকার করি তাহলে কি কোন আপত্তি আছে?”

স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে ওই ব্যবসায়ীর লাশ সিটি কর্পোরেশনের কেন্দ্রীয় শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে থাকা সরকারি পুরোহিতের সহায়তায় শেষকৃত্য করা হয়।

কাউন্সিলর খন্দকার জানান, “আমরা নিজেরাই ওই ব্যক্তির মুখাগ্নি করি।”

“ওই ব্যবসায়ীর আপন শ্যালক শেষকৃত্য করার জন্য ফেসবুকে আমাকে অভিনন্দন জানায়।”

তবে নারায়ণগঞ্জে এটিই এ ধরণের একমাত্র ঘটনা নয়।

কাউন্সিলর খন্দকার জানান, এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কিংবা রোগের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ৩৪টি মরদেহ দাফন ও সৎকার করেছেন তিনি এবং তার সহযোগীরা।

এর মধ্যে ছয় জন হিন্দু ছিলেন। আর বাকিরা মুসলিম। এই ছয় জনের মধ্যে পরিবারের কোন সদস্য না আসায় অন্তত তিন জনের মুখাগ্নি করেছেন তিনি নিজেই।

মরদেহের শেষকৃত্য ছাড়াও বাড়ি লকডাউন করতে কিংবা রোগী আনতেও যান তারা।

কাউন্সিলর খন্দকার বলেন, সে সময় আশেপাশের অনেক মানুষ ওই রোগীদের প্রতি যে ধরণের আচরণ করে, তা অমানবিক।

“আমারে বলে ভাই নিয়া যান। আগুন দিয়া পুইড়া ফালান, এই করেন, সেই করেন। মনে হয় একটা জন্তু ধরা পড়ছে, তারে নিয়া কোথাও আটকাইতে হইবো। কিন্তু তারা যে কখনো আক্রান্ত হইতে পারে বা তার কারণে যে আমরা আক্রান্ত হতে পারি, সেই চিন্তাটা কেউ করতেছে না।”

কাউন্সিলর খন্দকারের স্বেচ্ছাসেবী দলের সদস্য মোট ১২ জন। এরমধ্যে মাত্র দুই জনকে আগে থেকেই চিনতেন তিনি। বাকি ১০ জনই অপরিচিত ছিলেন।

ফেসবুকে তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে দাফন আর শেষকৃত্যের এই কাজে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছেন তারা।

“এদের কেউ কাঠমিস্ত্রি, কেউ গার্মেন্টস কর্মী, কেউ শিক্ষার্থী,” বলেন তিনি।

আক্রান্ত কিংবা আশেপাশের মানুষের ফোন, পুলিশের ফোন কিংবা পারিবারিক ফোন পেলেই সেখানে ছুটে যান কাউন্সিলর মি. খন্দকার ও তার দল। প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করে সম্পন্ন করেন শেষকৃত্য।

পূর্ববর্তি সংবাদকাল থেকে রাজধানীর রেস্তোরাঁগুলো ইফতার বিক্রি করতে পারবে
পরবর্তি সংবাদমঙ্গলবার রাজধানীতে বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে