রোযা কবুল হওয়ার ৬ টি শর্ত

ইমাম আবু হামেদ গাযালি ।।

মানুষের অবস্থাভেদে রোযা তিন প্রকার। ১. সাধারণ মুসলমানের রোযা। ২. আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের রোযা। ৩. আল্লাহর অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের রোযা।

সাধারণ মুসলমান রোযা অবস্থায় খাওয়া দাওয়া এবং যৌন চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকেন।

আল্লাহর বিশেষ বান্দারা খানাপিনা ছেড়ে দেওয়ার পাশাপাশি অশালীন কিছু শোনা, দেখা এবং বলা থেকেও বিরত থাকেন। পাশাপাশি যাবতীয় অন্যায় এবং অনাচার থেকেও নিজেদের দূরে রাখেন।

আর আল্লাহর অতি নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দারা রোযা অবস্থায় দুনিয়াবি সকল চিন্তা পরিহার করে সারাদিন একাগ্রতার সাথে রবের ধ্যানে মগ্ন থাকেন। মনে দুনিয়াবি কোনো চিন্তা উদয় হলেই তারা রোযা ভেঙ্গে গেছে ধারনা করতে থাকেন। কেননা রোযা তো পরকালের সম্বল। এর সাথে দুনিয়াবি কোনো চিন্তার মিশ্রণ হতে পারে না।

 

আল্লাহ যাকে তার অতি নৈকট্যের স্তরে পৌঁছার তাওফিক দেন তার জন্য এটা বড়ই সৌভাগ্যের বিষয়। আর এ পর্যায়ে পৌঁছা সবার পক্ষে সম্ভব নয়।

রোযার বাতেনি ছয়টি শর্ত 

রোযার বেলায় সকল মুসলমানেরই করা উচিত নিজেকে অন্তত দ্বিতীয় স্তরে উন্নীত করা। আর আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের রোযার যে প্রকৃতি তা ছয়টি শর্ত পূর্ণরূপে পালনের মাধ্যমে হাসিল হবে।

১. নযর তথা দৃষ্টির হেফাজত করা। অশালীন সকল কিছু এবং যেসব বস্তু আল্লাহর যিকিরের ব্যাপারে উদাসীন করে তুলে সেসকল বস্তু থেকে দৃষ্টিকে সয়যত রাখা। হাদিসে দৃষ্টিকে ইবলিসের তীর বলা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে, দৃষ্টি ( কু- দৃষ্টি) ইবলিসের বিষাক্ত তীর। আল্লাহর ভয়ে যে ব্যক্তি কু- দুষ্টি ছেড়ে দিবে অন্তরে সে ঈমানের পূর্ণ স্বাদ অনুভব করতে পারবে।

২. যবানের হেফাজত। অনর্থক গল্প, মিথ্যা, গুজব, পরনিন্দা, অশ্লীল, রুক্ষ এবং বিবাদপূর্ণ কথাবার্তা থেকে জিহ্বাকে সংযত রাখা। পাশাপাশি বেশি চুপ থাকা বা যবানকে আল্লাহর যিকির কিংবা তিলাওয়াতে ব্যস্ত রাখা। এটা যবানের রোযা। সুফিয়ান সাওরি রহ. বলতেন, পরনিন্দার কারণে রোযা ভেঙ্গে যায়। ইমাম আবু লায়স মুজাহিদ রহ. সূত্রে বর্ণনা করেন, দু’টি বদগুণ রোযা নষ্ট করে দেয়। মিথ্যা এবং পরনিন্দা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম এরশাদ করেছেন, রোযা ঢাল স্বরূপ। তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় মুর্খতাপূর্ণ এবং অনর্থক কথাবার্তা বলবে না। যদি কেউ রোযাদারকে মারতে আসে বা তাকে গালি দেয় তাহলে তাকে বলে দিবে- ভাই, আমি রোযাদার।

৩. কানের হেফাজত। অনর্থক গল্পগুজব এবং নিষিদ্ধ বস্তু শোনা থেকেও বিরত থাকা। কেননা যা দেখা বা বলা হারাম তা শুনাও হারাম। আল্লাহ তাআলা কুরআনে নিষিদ্ধ কিছু শোনাকে অপরাপর গোনাহের বরাবর উল্লেখ করেছেন। সূরা মায়িদায় তিনি এরশাদ করেন, سماعون للكذب اكالون للسحت অর্থাৎ তারা মিথ্যা শোনার জন্য ললায়িত হয়ে থাকত এবং ঘুষ গ্রহণ করত।

৪. হাতপা সহ অন্য অঙ্গ-প্রতঙ্গ দ্বারাও কোনো গোনাহের কাজ না করা। বিশেষ করে ইফতারে হারামের মিশ্রণ থেকে বেচে থাকা। কেননা সারাদিন হালাল খাদ্য খাওয়া থেকে বিরত থেকে ইফতারে যদি হারাম খাওয়া হয় তাহলে এই রোযার কোনো তাৎপর্য থাকে না। এমন রোযার দৃষ্টান্ত এভাবে দেওয়া যায়, একজন খুব মজবুতভাবে বাড়ি নির্মাণ করল কিন্তু পরেরদিন ভূমিকম্পে পুরো শহল উজাড় হয়ে গেলো। অনেক রোযাদার আছে, রোযার বিনিময়ে যাদের কেবল উপোসই থাকা হয়। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেছেন, এরা ওইসব ব্যক্তি, যারা হারাম দ্বারা ইফতার করে।

৫. হালাল খাদ্যও ইফতারে বা রাতে অধিক পরিমাণে গ্রহণ না করা। অর্থাৎ, যেন খাদ্য প্রস্তুতির চিন্তা এবং পরিপাকের যন্ত্রণায়ই রমযানের বেশি সময় নষ্ট না হয়ে যায়। যদি রাতের বেলায় প্রচুর খাওয়াই হয়, তাহলে রোযার যে মাকসাদ তা ব্যাহত হয়।

রোযার মাকসাদ হল, প্রবৃত্তির দমন এবং তাকওয়ার অনুশীলন। আর তা হাসিল হবে কম খাওয়ার মাধ্যমে। অর্থাৎ রমযার ছাড়া রাতে যে পরিমাণ খাবার খাওয়া হয় রমযানেও সে পরিমাণই খাওয়া।

অনরূপভাবে রোযা রেখে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতেও নিষেধ করা হয়। কেননা সারাদিন ঘুমানোর কারণে ক্ষুধা-পিপাসার কষ্টই যদি অনুভূত না হয় তাহলে তাহলে তাকওয়া হাসিল হবে কীভাবে?

৬. প্রত্যেকটি রোযার সমাপ্তির পর কবুলের ব্যাপারে ভীত এবং আশান্বিত অবস্থায় থাকা। কেননা জানা তো নেই রোযা কবুল হয়েছে কি না। ভয় এবং আশা সকল ইবাদতের কবুলের ব্যাপারেই থাকা উচিত।

 

হাসান বসরী রহ.-এর একটি ঘটনা জানা যায়। একবার রমযানে এক মজলিসে তিনি উপস্থিত হয়ে দেখেন, লোকেরা জোরে জোরে হাসছে, গল্প করছে। তখন তিনি বলেন, রমযান হল প্রতিযোগিতার উন্মুক্ত ময়দান। সৎকর্মশীলরা রমযানে অনেকদূর এগিয়ে যান। বদকাররা গোনাহেই ডুবে থাকে। ফলে তাদের ভ্রষ্টতা দিনদিন বাড়তেই থাকে। সুতরাং আফসোস তাদের প্রতি, যারা রমযানের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে হেলায় কাটিয়ে দেয়। আল্লাহর শপথ, যদি অদৃশ্যের পর্দা উঠিয়েও দেওয়া হত তবু সৎকর্মশীলরাই ইবাদত করত আর বদকাররা ডুবে থাকতো তাদের পাপাচারে।

আহনাফ ইবনে কায়স থেকে বর্ণিত, একবার তাকে বলা হল, আপনার তো অনেক বয়স হয়েছে। আর রোযা তো আপনাকে আরও দুর্বল করে তুলবে। কিছুদিন কি বিরতি দিবেন?  আহনাফ ইবনে কায়স উত্তরে বললেন, আমি তো দীর্ঘ সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আল্লাহর ইবাদতের কষ্ট সহ্য করা তো তার আযাবের কষ্ট সহ্য করা থেকে অনেক ভাল।

এসবই হল রোযার বাতেনি শর্ত। বাহ্যিকভাবে তো খানাপিনা এবং শারীরিক চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকলেই রোযা আদায় হয়ে যায়। ফকীহগণ এতটুকুতেই রোযা সহীহ হওয়ার হুকুম দেন।

 

জাহের এবং বাতেনের পার্থ্যক্য

কোনো আমল শুদ্ধ হওয়ার জন্য যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে সেগুলো পাওয়া গেলেই জাহের তথা বাহ্যিকভাবে সে আমলটি আদায় হয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হয়। তবে বাতেনিভাবে আমলশুদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো কবুল হওয়া। অর্থাৎ কবুল উপযোগগী হওয়া। সুতরাং খানাপিনা এবং শারীরিক চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকলেই বাহ্যিকভিবে রোযার দায়িত্ব আদায় হয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হবে। কিন্তু বাতেনিভাবে রোযা শুদ্ধ হওয়া তথা কবুল হওয়ার জন্য উপরের শর্তগুলো অবশ্য পালনীয়।

কেননা রোযার উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী চরিত্র গঠন করা এবং ফেরেশতাদের অনুসরণ করা। সুতরাং ফেরশতাগণ যেমন পাপ পঙ্কিলতা এবং প্রবৃত্তির প্রবঞ্চনামুক্ত রোযাদারকেও প্রবৃত্তির অনুসরণমুক্ত হতে হবে। আর উপরোল্লেখিত শর্তগুলো পালনের মাধ্যমেই তা সম্ভব।

মাকালাতুল ইসলামিয়্যিনা ফি শাহরি রমাযান গ্রন্থ থেকে অনুবাদ: ওলিউর রহমান

পূর্ববর্তি সংবাদত্রাণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জে পরিবহন শ্রমিকদের বিক্ষোভ
পরবর্তি সংবাদসুসংবাদ: শীঘ্রই জন সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে হারামাইন শরিফাইন