সাগরে ভাসছে ৫০০ রোহিঙ্গা: আমাদের কি কোনোই দায়বদ্ধতা নেই!

আরজু আহমাদ ।।

ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম শরণার্থী হয়ে পাড়ি জমালেন। মূসা আ. রিফিউজি হিসেবে আশ্রয় নিলেন মাদায়েনে। প্রথম দফায় মক্কায় মুসলমানদের অর্ধেকের বেশি আশ্রয় নিলেন আফ্রিকায়।

খোদ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য একের পর এক আরবের প্রায় সব গোত্রের কাছে কড়া নাড়লেন। এমনকি তায়েফে প্রত্যাখ্যাত তো বটেই বরং অবর্ণনীয় নির্যাতন ও উপহাসের মুখোমুখি হলেন।

শেষ পর্যন্ত মদিনার সবচে’ দূর্বল আর দরিদ্র গোত্রটি তাঁকে গ্রহণ করার প্রস্তাব করলো। মক্কার অবশিষ্ট সব মুসলমান হিজরত করলেন। মদিনায় আনসাররা কেবল তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ই দিল না। ঘর, বাড়ী চাষাবাদ যোগ্য জমির ভাগও দিল। পৃথিবীতে এইরকম ঘটনা ছিল অশ্রুতপূর্ব।

দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, ক্রুসেডারদের হাতে জেরুসালেম ও আশপাশের শহরের পতন হয়। খ্রিস্টান বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তা থেকে যেসব মুসলমান বাঁচতে পেরেছিলেন তাঁরা বাগদাদ এলেন।

প্রথম যে দলটি এসেছিল তা ছিল আজকের ইসরায়েলের এস্কেলেন থেকে। তারা বাগদাদে, দামেস্কে এবং মিসরের বিভিন্ন জায়গায় বসতি গড়ে তোলে।

ফাতেমী সালতানাত একটা অস্থির ও বিপদসংকুল সময় অতিবাহিত করছিল। কিন্তু শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে কোনও কার্পণ্য তারা করে নি। এই শরণার্থীরা মূল ধারায় মিশে গিয়েছিল।

আর সেই শরণার্থীদের বংশধরদের মধ্য থেকে কাযী আবুল ফযল আল আস-কালানী, ভূগোলবিদ আল মাকদিসী, আল কিনানী রহ. এঁর মত লোকের জন্ম হয়েছে।

ইবনে আসীর সে সময়ে একেরপর এক শহরের পতন আর শরণার্থী আগমনের এইসব ঘটনা উল্লেখ করেছেন। সেদিন কেউ তাদের প্রত্যাখ্যান করে নি। উসামা বিন মুনকিদ রহ. নিজেও শরণার্থী ছিলেন।

তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে সে সময়কার ঘটনাবলী লিখেছেন। লিখেছেন, কিভাবে মুসলমানগণ তাঁদের স্বাগত জানিয়েছে। ইসলামের ইতিহাস আদতে এই আশ্রয়দানের ঘটনায় পূর্ণ।

কা’ব বিন জুবায়ের বিন আবু সুলামা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন সে যদি কা’বার গিলাফ ধরেও ঝুলে থাকে তবুও তাকে হত্যা করতে। কিন্তু সেই তিনিই যখন মদিনায় গিয়ে আশ্রয় চাইলেন। নিরাপত্তা প্রার্থনা করলেন। তাঁকে তা দেওয়া হয়েছিল।

আল্লাহ্‌ কোরআনে এই উম্মতকে নির্দেশ দিচ্ছেন,

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّى يَسْمَعَ كَلاَمَ اللّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ

‘আর মুশরিকদের কেউ যদি আশ্রয় চায়। তবে তাকে নিরাপত্তা প্রদান করুন। যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিন।’

আল্লাহ্‌ তো তাঁর সাথে শরিক করে এমন মুশরিককেও আশ্রয় দিতে, নিরাপত্তা দিতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এই যে আল্লাহ্‌র বাণী শোনার কথা বলছেন, এটা কিন্তু আশ্রয় দেওয়ার মধ্য দিয়েও হয়।

একজন নির্যাতিত, সে যদি মুশরিকও হয়- তবুও যে ধর্ম তার স্বীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সেই মুশরিককেও আশ্রয় ও নিরাপত্তা দানের নির্দেশ দেয়। এটুকুই আল্লাহ্‌র বাণী তার কাছে পৌঁছে যাওয়া নয়?

প্রশ্ন উঠতে পারে, একের পর এক শরণার্থী কি গ্রহণ করেই যাওয়া হবে? না, কোরআন বলছে প্রয়োজনে তাদের প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থাও করতে। তবে তা হবে ‘নিরাপদ স্থান।’ সেখানে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও মুসলমানের দায়িত্ব। এরপর আল্লাহ্‌ তাঁদের পুশব্যাক করার কথা বলছেন।

আজকে এতগুলো দিন ৫০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী সাগরে ভাসছে। কেউ তাদের গ্রহণ করছে না। এরা তো আমার ভাই, রাসুলের পেতে দেওয়া ভাতৃত্বের এই বন্ধন।রাসুলের ভাষায়, আমরা একই শরীরের অংশ। সাহরিতে, ইফতারে তারা কি আহার করে? জানি না ঠিক কতখানি অনুভূতিহীন হলে- এরপরও গলা দিয়ে কি করে খাবার নামে আমার?

ইসলাম বিজয়ী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর প্রথমবারের মত মুসলমান শরণার্থী সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিল প্রথম ক্রুসেডে। ইবনে আসীর বর্ণনায় বুঝা যায়, আটশত বছর আগে সে সময়ও রমযান মাস ছিল।

এখনো রমযান মাস, কিন্তু উম্মতের কী পরিবর্তন। উম্মতের জাতীয়তাবাদী অহংকার সাগরের নোনাজলে মানুষের মৃত্যুকে অবধি মেনে নেয়-জীবন বাঁচানোর আহ্বানের বদলে!

খুব আশ্চর্য হবার মত ব্যাপার, পত্রিকাগুলোর অনলাইন জরিপে নব্বুই ভাগ মুসলমানের দেশে প্রায় নব্বুইভাগ লোকই এই মাজলুম মানুষগুলোকে গ্রহণ না করার পক্ষে ভোট দিয়েছে।

যে ইসলাম মুশরিককেও আশ্রয় দিতে নির্দেশ দেয়, সেই ইসলামের অনুসারীরা আজ মাজলুম মুসলমানদেরও আশ্রয় দেওয়ার বিরুদ্ধে। আমরা তাহলে কোন ইসলামকে ধারণ করি?

কিম্বা কতখানি ধারণ করি? আহা! অথচ আমরা তো রিফিউজি নবীর উম্মত। এই জাত্যবোধ, এ অহংকার কতকাল? কত কত জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। খোদা না করুন, যদি সাগরে ভাসমান সেই লোকগুলোর একজন আমি হতাম?

মাজলুমের বিরুদ্ধে আমার এই অহমবোধের ফলস্বরূপ আমার উপরও ব্যক্তিগত কিম্বা জাতীয় জীবনে যদি কোনও জুলুম চেপে বসে? আর তখন যদি এভাবেই মুখ ফিরিয়ে নেয় সবাই? আল্লাহ্‌ আমাদের ক্ষমা করুন।

এই যাবতীয় জাত্যবোধ, অহংকার আর ঘৃণা- সাগরে ভাসমান মানুষগুলোর স্রষ্টা যে পরাক্রমশালী আল্লাহ্‌, তিনি দেখছেন। সব কিছু লিখে রাখা হবে। যেদিন সবাই তাঁর বিচারের অপেক্ষায় নতমুখে থাকবে।

আর তিনি ঘোষণা দেবেন, লিমানিল মুলকুল ইয়াওম?

‘আজ যাবতীয় সার্বভৌমত্ব কার কাছে?’ (গাফির, ১৬)

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া।

পূর্ববর্তি সংবাদনতুন ৫ জনসহ মোট মৃত্যু ১৬৮ জনের, ২৪ ঘন্টায় আক্রান্ত ৫৬৪ জন
পরবর্তি সংবাদঅবশেষে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে কিট পরীক্ষার অনুমতি দিল ওষুধ প্রশাসন