শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামা : আদবের কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

শায়েখ মুহিউদ্দীন বিন মুহাম্মাদ আওয়ামা ।।

। এক।

শায়েখ মুহিউদ্দীন আওয়ামার ভাষায়- ‘আমার ওয়ালেদ মাজেদের ছাত্র যামানার প্রথম দিকের ঘটনা। হালাবের জনৈক বর্ষীয়ান পাগড়ী ও সুবেশধারী শায়েখের আলোচনা উঠল। (সেই শায়েখের উপর আরোপিত বিরূপ মন্তব্যের দায়ভার  তো তাঁর উপর বর্তায়।) ওয়ালেদ মাজেদ সেই বর্ষীয়ান শায়েখের সমালোচনা করে বসলেন। বর্ষীয়ান শায়েখকে নিয়ে এই বাড়ন্ত বালকের সমালোচনা মুহতারাম দাদাজান লক্ষ করলেন। তাঁর সমালোচনা যদিও মোক্ষম ও যথার্থ ছিল; কিন্তু এ দুঃসাহসিকতা ও ব্যাপারটি তাঁকে ক্রোধান্বিত করে তুলল। তিনি তাঁর সন্তানের ব্যাপারে শঙ্কিত ও চিন্তিত হয়ে পড়লেন। এই নিন্দিত ও কুঅভ্যাস নিয়েই তাঁর সন্তান বেড়ে উঠবে বড়দের প্রতি দুঃসাহসিকতা! তিনি ক্রোধে অগ্নিশর্মা হলেন। ছেলেকে ভর্ৎসনা করলেন। উপদেশ দিলেন। তাকে সতর্ক করে বললেন-

يا ولدي، والله لو رأيت قطة تخرج من بيت شيخ لاحترمتها.

বৎস! আল্লাহ্র কসম! যদি কোনো শায়েখের বাড়ী থেকে কেনো বিড়ালীও বের হতে দেখি, তাহলে আমি অবশ্যই তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব।

মুহতারাম আব্বাজান সতর্ক ও সচেতন হয়ে গেলেন। বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবন করলেন। বড়দের যে বিশেষ সম্মান ও বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি নতুন বর্ণমালার পাঠ গ্রহণ করলেন। বড়দের সমকক্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরাই বড়দের মুখোমুখি হতে পারেন। অন্তরঙ্গ ও নিকটস্থ বন্ধুরাই তাঁদের উপর ‘নক্দ’ করতে পারেন। আর তিনি? তিনি তো একজন তালিব। অপ্রাপ্ত বয়স্ক নগণ্য তালিব। তার যামানার বিশাল হাস্তি ও বিশিষ্ট আলেমগণের উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি কীভাবে এ বিষয়ে দুঃসাহস দেখাতে পারেন?! কীভাবে সমালোচনা ও ‘নক্দ’ করতে পারেন?! কীভাবে সংশোধনী পেশ করতে পারেন?! আল্লাহ তাআলা আমার দাদাজানের প্রতি রহম করুন। [মুহতারাম দাদাজান ঘটনাটি আমার পিতার কৈশরিক ভাবনায়, কৈশরিক বোধের জগতে এমনভাবে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে, পরবর্তী জীবনে কদমে কদমে তা কাজে লেগেছে; আলোর মিনার হয়ে পথনির্দেশ করেছে।]

যদি তিনি আমাদের যুগের চিত্র দেখতেন! ঠিকমত অযু-গোসলই করতে পারে না এমন সব লোক (‘পুঁচকে ছোকরা’) কেবল যুগশ্রেষ্ঠ মাশায়েখদেরই সমালোচনা করে ক্ষান্ত না; বরং দ্বীনের বড় বড় ইমামদেরও সমালোচনা করে বসে!

 

। দুই।

আমার ওয়ালেদ মাজেদ তখন [হালাবের বিখ্যাত দ্বীনি বিদ্যাপীঠ] আলমাদরাসাতুশ শাবানিয়া’র [ছানবিয়্যাহ মারহালার] তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। আল্লামা শায়েখ আবুদর রহমান যাইনুল আবিদীন (১৩৩০ হি.-১৪১০ হি.) ইমাম ইবনে হিশামের লেখা কতরুন নাদা কিতাবটি পড়াতেন। তৎকালীন বর্ষীয়ান তবকার শায়েখগণ অনুজ তবকার কথা বাদই দিলাম এই শায়েখ আবুদর রহমানকে বিস্ময় ও উঁচু দৃষ্টিতে দেখতেন। তিনি দরসে ছাত্রদেরকে লক্ষ্য করে বলেন-

والله لو دخل علينا الآن ابن هشام، ورآني أدرس كتابه لخلع حذائه وضربني، وقال لي : أنا لم أؤلف كتابي هذا لتدرسه أنت وأمثالك.

আল্লাহর কসম! যদি ইবনে হিশাম এখন আমাদের এখানে এসে আমাকে দেখেন যে, আমি তাঁর কিতাবের দরস দিচ্ছি, তাহলে তিনি অবশ্যই জুতা খুলে আমাকে প্রহার করতেন এবং বলতেন, আমি এ কিতাব তুমি ও তোমার মত লোকদের অধ্যাপনা করার জন্য লিখিনি।

একটা বিস্ময়বোধ ছাত্রদেরকে আচ্ছন্ন করল। তারা স্তম্ভিত ও বিমূঢ় হল। সুউচ্চ মাকামের অধিকারী এত বড় শায়েখ (আরবী ভাষায় অসম্ভব পা-িত্যের অধিকারী) এরূপ মন্তব্য করছেন! এভাবে হলফ করছেন!  তাহলে ইবনে হিশামের কী মাকাম?! আর এ কিতাবেরই বা কী রূপ মর্যাদা?! ছাত্রদের বুকজুড়ে [নতুন করে] তাঁদের ইমামদের প্রতি মহত্ব ও শ্রদ্ধার একটা আসন তৈরি হল। তাদের মেধায় ও চেতনায় উম্মাহর আলেমগণের সঠিক অবস্থান ও মর্যাদা প্রোথিত হল।

। তিন।

শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. একবার আমার ওয়ালেদ মাজেদের সাইয়্যাফিয়্যা কক্ষে আসলেন। আল্লামা আযীযী রাহ. লিখিত ইমাম সুয়ূতী রাহ.-এর আলজামিউস সগীর কিতাবের শরহের একটি নস তিনি মুরাজাআত করছিলেন। শায়েখ নসটি অনেকবারই পুনরাবৃত্তি করলেন। তিনি নসটি বিভিন্ন আঙ্গিকে বুঝবার চেষ্টা করলেন। এর যমীরও বিভিন্নদিকে ফিরিয়ে দেখলেন। কিন্তু তাঁর কাছে কোনো অর্থ স্পষ্ট হচ্ছিল না। এবং কোনো স্থির মর্মার্থও তিনি বের করতে পারছিলেন না। এই মুরুব্বী শায়েখ তাঁর শাগরিদের সামনে ইবারতের অস্পষ্টতার কারণে—কিতাবের উপর কিংবা কিতাবের লেখকের উপর কোনো ‘নক্দ’ করলেন না। বরং ওয়ালেদ মাজেদকে বললেন-

هكذا يقول الشيخ، ونحن لا نحسن الفهم عنه.

শায়েখ এটা বলেছেন; কিন্তু আমরা তা ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারছি না।

আর শায়েখ তো শায়েখই। আমার ওয়ালেদ মাজেদের দৃষ্টিতে তিনি তো শায়খুল মাশাইখ। অথচ তিনি এরূপ মন্তব্য করছেন!! তিনি আলেমদের বক্তব্য বুঝতে পারছেন না?! ছোট্ট এই মর্মভেদী বাক্যটি ওয়ালেদ মাজেদের কাছে বিস্ময়কর মনে হল। তিনি থমকে গেলেন। শায়েখ ও মুরব্বী আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ. বিশেষ উদ্দেশ্যে বুঝেশুনে সচেতনভাবেই এমনটি করেছেন। কেননা তিনি তাঁর এক শাগরিদকে যতক্ষণ সে তালেব ও ‘ধারন-গ্রহণ’ স্তরে থাকে তরবিয়াত করছিলেন। তবে ইলমে মজবুত ও পরিপক্ক হলে সেক্ষেত্রে ঠিক আছে (নকদের অবকাশ আছে)। তিনি ওয়ালেদ মাজেদকে (সে পর্যায়ে উন্নীত হলে) আদব ও শ্রদ্ধামিশ্রিত ‘নক্দ’ শিখিয়েছেন, আবার ‘নক্দ’ মিশ্রিত আদব শিখিয়েছেন। (অর্থাৎ এমন না হয় যে, কেবল আদবের কারণে নকদী বিষয় হওয়া সত্ত্বেও ‘নক্দ’ করল না।)

শায়েখ মুহাম্মাদ মুহিউদ্দীন আওয়ামা বলেন, ওয়ালেদ মাজেদ আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, আমাদের উস্তায ও শায়েখদেরকে যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ সম্মান করা এবং তাঁদের প্রতি পূর্ণ মাত্রায় আদব বজায় রেখে চলা আবশ্যক। মুহতারাম ওয়ালেদ আমাদেরকে সবসময় আলেমদের এ উক্তি শিক্ষা দিয়ে থাকেন-

ما فاز من فاز إلا بالأدب، وما سقط من سقط إلا بسوء الأدب.

যাঁরা সফল হয়েছে তাঁরা আদবের কারণেই সফলকাম হয়েছে। আর যারা স্খলিত  হয়েছে বেয়াদবীর কারণেই হয়েছে।

আব্বাজানের শায়েখদের সাথে আদবের যেসব [স্বর্গীয়] দৃশ্য আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি, কিংবা তাঁর কাছ থেকে শুনেছি সেসব ঘটনা অনেক দিক সম্বলিত এবং বিভিন্ন মনোভাব প্রকাশকারী। কিছু ঘটনা এমন রয়েছে, যার নযীর অন্যদের মাঝেও পাওয়া যায়। আর কিছু ঘটনা এমন, যে ক্ষেত্রে তিনি একক ও তুলনারহিত। কিন্তু এখন আমি আদব ও শ্রদ্ধার দু’টি ঘটনা উল্লেখ করব, যা আমি একমাত্র তাঁকেই করতে দেখেছি। একটি ঘটনা হল, তাঁর প্রথম শায়েখ—শায়েখ আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীনের সাথে। আরেকটি ঘটনা হল তাঁর দ্বিতীয় শায়েখ—শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর সাথে।

 

শায়েখ আব্দুল্লাহ্ সিরাজুদ্দীন রাহ.-এর সাথে আদব

১৪০৪ হিজরীতে ফযীলাতুশ শায়েখ আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীন (১৩৪৩ হি.-১৪২২ হি.) [রাষ্ট্রীয় গোলযোগের কারণে]  মদীনা মুনাওয়ারায় [প্রায় চার বছর] অবস্থান করার পর যখন তাঁর স্বদেশ হালাবে ফিরে আসেন, তখন আমার মুহতারাম আব্বাজান শায়েখের সঙ্গে উভয়ের মাঝে নিগুঢ় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আদবে ও লজ্জায়, সম্মান ও মর্যাদায় ফোনে যোগাযোগ ও কথোপকথন করতে দুঃসাহস করতে পারেননি।  যদিও আমার মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদ তাঁর এক খাস শাগরিদের মাধ্যমে শাইখ মুহাম্মাদ আলী আল-ইদলিবী, মাদরাসাতুশ শা‘বানিয়ার অন্যতম কর্তাব্যক্তি শাইখের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন। ছোট বড় সব বিষয়ে পরামর্শ করতেন। ফজীলাতুশ শায়েখ আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীনও তাঁর মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন।

আমার মুহতারাম আব্বাজান ফজীলাতুশ শায়েখ আব্দুল্লাহ সিরাজুদ্দীনের সাথে  বেশ কয়েক বছরের মাঝে মাত্র একবার  [ফোনে] কথা বলেছেন। তাও দরখাস্ত ও অনুমতি তলব করার পর। এরূপ দুঃসাহসিকতার জন্য ওজরখাহি করে। এটি শায়েখের হলবে ফিরে আসার ১৫ বছর পরের ঘটনা। এই কথোপকথনের সময় একমাত্র আমিই মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদের পাশে ছিলাম। সেই কথোপকথনের একটি অংশ যা আমার স্মৃতির মণিকোঠায় সংরক্ষিত আছে এরূপ : ফোনে কথা বলার শুরুতে মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদ তাঁর শায়েখের কাছে নিবেদন করেন, যেন শায়েখের দিল-মন তার প্রতি রাজী-খুশী থাকে। ওয়ালেদ মাজেদ এ বাক্যটি ছাড়া আর কোনো বাক্য বলেননি। আর শায়েখ রাহ. আব্বাজানের জন্য কথোপকথনের শেষ পর্যন্ত অব্যাহতভাবে দীর্ঘ দুআ করেন।

শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর সাথে সংশ্লিষ্ট ঘটনা

আমার আব্বাজান তাঁর প্রিয় শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর সাথে একবারের জন্যও বসা অবস্থায় ফোনে কথা বলেছেন- এরূপ কোনো দৃশ্য আমার স্মৃতির সঞ্চয়ে নেই। অথচ উভয়ের মাঝে ছিল অধিক ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এবং শায়েখের সাথে ওয়ালেদ মাজেদের সার্বক্ষণিক ইলমী বিষয়ের আলোচনা ও আদান-প্রদান। বিষয়টি আমাদের কাছে এমন হয়ে গিয়েছিল যে, যখন তিনি ফোনে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে যেতেন তখন আমরা বুঝতে পারতাম যে, তিনি নিশ্চয় শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.।

একবারের কথা মনে পড়ছে। তথাকথিত জামিয়ায় পড়ালেখা করা জনৈক ভাই মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদকে শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহ.-এর পুত্র শায়েখ সালমানের সামনে আদবপূর্ণ ভঙ্গিতে উপবেসনের উপর আপত্তি করেন। অথচ সালমান বিন আব্দুল ফাত্তাহ হলেন মুহতারাম ওয়ালেদ মাজেদের ছেলের বয়সের। আমি আপত্তিকারী ভাইকে জবাব দিলাম, ‘এটাই হল মাশায়েখদের তরবিয়াত ও তথাকথিত জামিআর তরবিয়াতের মধ্যকার পার্থক্য।’

তাঁদের এসকল মহান আদব থেকে আল্লাহ আমাদেরকে আলো গ্রহণের তাওফীক দিন-আমীন। হ

[সংকলন ও ভাষান্তর : মুহাম্মাদ মুহসিনুদ্দীন খান]

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনায় আরও এক পুলিশের মৃত্যু
পরবর্তি সংবাদকরোনার এই দুর্যোগে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই: ওবায়দুল কাদের