শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে ইসলাম

উবায়দুল্লাহ তাসনিম।।

আজ পহেলা মে। আন্তার্জাতিক শ্রমিক দিবস (বা মে দিবস)। এদিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবি মানুষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলো রাস্তায় সুসংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভযাত্রার মাধ্যমে এ দিবসটি উদযাপন করে থাকে। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগোর রাস্তায় সংগঠিত ঘটনা ও পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনা থেকে এর উৎপত্তি।পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল সোশালিষ্ট কংগ্রেসে ১মে ‘শ্রমিক দিবস’ হিসেবে ঘোষিত হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশে নানান কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে।

শ্রম আর শ্রমিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখার দু’টি গুরত্বপূর্ণ উপাদান। শ্রম ও শ্রমিক না থাকলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে।

শ্রম ও শ্রমিক এ দু’টো বিষয় ততক্ষণ ভালোভাবে সচল থাকবে, যতক্ষণ তাদের ন্যায্য অধিকার বহাল থাকবে। যতক্ষণ তারা তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্য পাবে। এর বিপরীত হলে শ্রম আর শ্রমিক ব্যবস্থা গৌণ হয়ে পড়বে।

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমের গুরত্ব:

ইসলাম সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা হিসেবে তাই শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অপূর্ব অবদান রেখেছে। ইসলাম শ্রমিকের শ্রমের যথাযথ মূল্য দিয়েছে।

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে,

‘নিজ হাতে কাজ করার মাধ্যমে উপার্জিত খাদ্যের থেকে পবিত্র কোন খাদ্য নেই।'(বুখারি)

নবী-রাসূলগণ নিজ হাতে কাজ করেছেন। হাকেম রা ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, দাউদ আঃ ছিলেন লৌহবর্ম প্রস্তুতকারক, আদম আঃ ছিলেন চাষী, নূহ আঃ ছিলেন কাঠ মিস্ত্রি, ইদরিস আঃ ছিলেন দর্জি, মূসা আঃ ছিলেন রাখাল।(মুস্তাদরাকে হাকেম)

রাসূল সাঃ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে ছিলেন। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে খাদিজা রাঃ এর ব্যবসার পণ্য নিয়ে দূরে গিয়েছেন। আলী রাঃ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। উমর রাঃ শ্রমিক হয়ে ছাগল ছড়িয়েছেন। বিখ্যাত সাহাবী ইবনে মাসউদ রাঃ সহ অনেকেই শ্রমিক হিশেবে কাজ করেছেন।

ইসলাম শ্রমের গুরুত্ব এতটাই দিয়েছে যে, নিজ ভূখন্ডে কর্মসংস্থান না হলে প্রবাসে শ্রম প্রদান করতে বলা হয়েছে। কুরআনুল কারিমের ইরশাদ,  ‘যে কেউ আল্লাহর পথে দেশত্যাগ করে, সে এর বিনিময়ে অনেক স্থান ও সচ্ছলতা প্রাপ্ত হবে। (সূরা নিসা১০০)

হাদিসে এসেছে,  প্রবাসে যাও ধনী হতে পারবে।(তাবরানী, আওসাত)

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা:

বস্তুবাদের পৃথিবীতে শ্রেণী বৈষম্যের ব্যাপারটা খুব প্রকট। বিত্তশালী শ্রেণীর কাছে শ্রমিক প্রশ্নটা তুচ্ছ, নগন্য একটা বিষয়। সমাজে শ্রমিক শ্রেণীটি অবহেলিত। অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পেষিত। অথচ শ্রেণী বৈষম্যের ধারণা ইসলামে প্রত্যাখ্যাত। ইসলামে মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া-পরহেযগারী।

কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘নিশ্চই আল্লাহর নিকট সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, সে সর্বাধিক তাকওয়ার অধিকারী’ (সূরা হুজুরাত,১৩)

ইসলামে শ্রমিকের যেই মর্যাদা ও অধিকার রয়েছে,তা নজির বিহীন। ইসলাম শ্রমিককে ভাইয়ের মর্যাদা দিয়েছে । শ্রমিক আর মালিকের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক কায়েম করতে বলেছে । মালিক-শ্রমিক দু’ পক্ষে সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছে। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, ‘তোমাদের দাসরা(শ্রমিক) তোমাদের ভাই। যার অধীনে তার (শ্রমিক) ভাই রয়েছে, সে যেনো শ্রমিককে তাই খাওয়ায়, যা সে নিজে খায়, তাকে তাই পরায়, যা সে নিজে পরে। তাদের জন্য প্রচন্ড কষ্টকর হয় এমন কাজে তোমরা তাদের বাধ্য করো না। কখনো যদি ভারী কাজ করাতে হয়, তাহলে তোমরা সেই কাজে তাকে সাহায্য করো।'(বুখারি,৩০)

অন্য হাদিসে আছে, তোমরা যা খাবে, তাদেরকে তাই খাওয়াবে, যা পরবে, তাদেরকে তাই পরাবে, তোমরা আল্লাহর সৃষ্টিকে(দাস-শ্রমিক) (অন্যায়ভাবে) কষ্ট দিবে না।( মুসলিম,১৬৬১)

ইসলাম শ্রমিকের শ্রম হ্রাস করার পক্ষে। মালিককে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, শ্রমিকের কাজ যথাসম্ভব কমিয়ে দিতে। রাসূলুল্লাহ সাঃ ইরশাদ করেছেন,’তুমি শ্রমিকের যে পরিমাণ কাজ কমিয়ে দিবে, সে পরিমাণ সওয়াব তোমার আমলনামায় জমা হবে।’ (ইবনে হিব্বান, ২৩১৪,আবু ইয়ালা,১৪৭২)

ইসলামে শ্রমিকের অধিকার:

ইসলাম শ্রমিকের কাজের যথাযোগ্য মূলায়ন করেছে। শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবীজি সাঃ ইরশাদ করেছেন,’ তোমরা শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রক দিয়ে দাও।'( ইবনে মাজাহ, ২৪৪৩)

শ্রমিকের অধিকার না আদায়ের ব্যাপারে কঠোর ধমকি এসেছে হাদিসে। আল্লাহ কিয়ামত দিবসে শ্রমিকের পক্ষ নিবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, কিয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হবো।…৩. যে ব্যক্তি শ্রমিককে কাজে লাগিয়ে কাজ উদ্ধার করার পর তার পারিশ্রমিক দেয় না। (বুখারি,২১১৪, ইবনে মাজাহ, ২৪৪২, মুসনাদে আবু ইয়ালা, ৬৪৩৬)

মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক:

আজকাল মালিক শ্রমিকের সম্পর্ক স্বার্থপরতায় কলুষিত। পারস্পরিক হৃদ্যতা নেই। মালিক শ্রেণী জুলুম করে। অসৎ ব্যবহার করে। অথচ আগেও উল্লেখ করেছি, ইসলাম মালিক শ্রমিকের ভাই ভাই সম্পর্কে বিশ্বাসী। রাসূলুল্লাহ সাঃ খাদেম- শ্রমিকের সংগে সৎ ব্যবহার করেছেন। শ্রমিককে কখনো প্রহার করেননি।

হাদিসের ভাষ্য, রাসূলুল্লাহ সাঃ কখনো নিজ হাতে কোন নারী, কোন খাদেমকে প্রহার করেননি। (মুসলিম, ২৩২৮ সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৮৬, ইবনে মাজাহ, ১৯৮৪)

বছরের পর বছর খেদমতের সময়কালে খাদেম অসন্তুষ্ট হয়, এমন কোন আচরণ করেননি রাসূল সা। আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত, আমি দশ বছর রাসূল সাঃ এর খেদমত করেছি। তিনি কোনদিন আমার ব্যাপারে ‘উফ’ শব্দটা উচ্চারণ করেননি। (অবাঞ্চিত)কোন কাজ করে বসলে বলেননি, এটা কেন করেছ? (যে কাজ করা উচিত ছিল এমন) কোন কাজ না করলে বলেননি, এটা কেনো করলে না?(বুখারি, ২৭৬৮, মুসলিম, ২৩০৯তিরমিযি, ২০১৫, সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৭৩ মুসনাদে আহমদ, ১১৫৭৭)

অন্যদেরকেও অধীনস্থ লোকজনের সাথে সুন্দর ব্যবহার, কষ্ট না দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। মানবতা, আন্তরিকতার কথা বলেছেন, তোমরা অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। তাদেরকে কোন রকমের কষ্ট দিবে না। তোমরা কি জানো না? তাদেরও তোমাদের ন্যায় একটি হৃদয় আছে। ব্যথাদানে তারা দুঃখিত হয়, এবং কষ্টবোধ করে। আরাম ও শান্তি প্রদান করলে সন্তুষ্ট হয়৷ তোমাদের কি হয়েছে যে তোমরা তাদের প্রতি আন্তরিকতা প্রকাশ করো না?

লেখক : শিক্ষার্থী

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনার মধ্যেও সরকার গরিব মানুষের ক্ষুধা নিয়ে তামাশা করছে: রিজভী
পরবর্তি সংবাদঅষ্টম তারাবি: সত্য ও সততা মুক্তি দেয়