সাহাবীদের জীবনে বদান্যতার অনুপম দৃষ্টান্ত

মাওলানা রাশেদুর রহমান।।

“যার গোশত-রুটি খেতে মন চায় সে যেন যখন খুশি দুলাইম বিন হারিসার বাড়িতে চলে আসে”- বাক্যটি ছিল মদীনার প্রসিদ্ধ একটি বাক্য। দুলাইমের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে উবাদার ব্যাপারেও এ কথাটি প্রসিদ্ধ ছিল।ঐতিহ্য হিসেবে পারিবারিক সূত্রে পরবর্তী সময়ে দুলাইমের নাতি সাদ ও সাদের পুত্র কাইসও পেয়েছিলেন বদান্যতা ও দানশীলতার এ অনন্য গুণ। তাই তাঁদের ব্যাপারেও এ কথাটি মশহুর ছিল।

কাইস ও তাঁর পিতা সাদ ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় সাহাবী। রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। মদীনার খাযরাজ গোত্রের মানুষ ছিলেন তাঁরা। নবীজির দরবারে কখনো মেহমান আসলে সাহাবীগণ তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন। প্রত্যেকে নিজের সাথে নিজ বাড়িতে মেহমানদের দুই একজনকে সাথে নিয়ে যেতেন। কিন্তু সাদ বিন উবাদা ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি একাই আশিজনের খাবারের আয়োজন করতেন।

সে সময় হোটেল-সংস্কৃতি বলতে কিছু ছিল না। এলাকায় আগত প্রত্যেক মুসাফির হতেন এলাকার মেহমান। মুসাফিরদের খাতির-যত্ন করতে পারা গৌরবের বিষয় ছিল। নবীজির সাথে কোন সফরে বের হলে মেহমানদারি করা যেন কাইস বিন সাদের প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াত। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে হাসিমুখে তিনি মেহমানদারি করতে থাকতেন। নিজের কাছে যা থাকত তা ফুরিয়ে গেলে সাথী-সংগীদের থেকে ধার করে হলেও মেহমানদারি করতেন।

৮ম হিজরীর ঘটনা। নবীজির নির্দেশে আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রা. তিনশতজন সাহাবীকে নিয়ে ‘সীফুল বাহর’ এর উদ্দেশ্যে এক অভিযানে যান। এ অভিযানে কাইস বিন সাদও ছিলেন। মদীনা থেকে সাহাবীদের আনা খাবার শেষ হয়ে গেলে কাইস মেহমানদারি শুরু করলেন। নিজের যা ছিল সব শেষ হওয়ার পরও তিনি মেহমানদারি অব্যাহত রাখলেন ঋণ করে করে।

প্রথম দিন তিনটি উট জবাই করলেন। দ্বিতীয় দিন আরো তিনটি। তৃতীয় দিন আরো তিনটি। এ পর্যায়ে সৈন্যদলের আমীর আবু উবায়দা কাইসকে এভাবে মেহমানদারি করতে নিষেধ করে দিলেন। সওয়ারির উট কম হয়ে যাবে সম্ভবত এ আশঙ্কায়। কাইস নিবৃত্ত হলেন।

মুরব্বী সাহাবীদের পক্ষ থেকে একবার অভিযোগ উঠল, এ যুবক তো তাঁর বাবার সব সম্পদ দান করেই শেষ করে দিবে। বিষয়টি জানতে পেরে কাইস পিতার কাছে অভিযোগ করলেন, আমি নাকি আপনার সব সম্পদ শেষ করে ফেলব- এমন কথা বলা হচ্ছে। সাদ বললেন, তুমি দান করবে, মেহমানদারি করবে আর আমি এতে নারাজ হব এমনটি হতেই পারে না। বরং তোমার দান ও মেহমানদারির কারণে যারা আমার সম্পদ ফুরিয়ে যাবার কথা বলেছে তাদের এ কথায় আমি নেহায়েত কষ্ট পেয়েছি। সামনে থেকে যেন এ ধরনের কোন কথা না ওঠে তাই তোমার নামে চারটা বাগান লিখে দিচ্ছি। দান ও মেহমানদারির সুযোগ পেলেই তা করবে। আরো প্রয়োজন হলে মন খুলে তাও করবে। সম্পদ ফুরিয়ে যাবার কোন ভয় মনে রাখবে না।

এক ব্যবসায় কাইস নব্বই হাজার লাভ করেন। এরপর ঘোষণা দেন, কারো ঋণের প্রয়োজন থাকলে যেন আমার কাছ থেকে নিয়ে যায়। চল্লিশ হাজার ঋণ দেওয়ার পর বাকি পঞ্চাশ হাজার তিনি এমনিই দিয়ে দিলেন।

একদিনের ঘটনা। কাইস অসুস্থ। তিনি লক্ষ করলেন, সাক্ষাতপ্রার্থীর সংখ্যা অন্যবারের তুলনায় এবার অনেক কম। স্ত্রীকে কারণ জিজ্ঞেস করলেন। স্ত্রী বললেন, আপনি মানুষের কাছে ঋণের এত এত টাকা পান। তাই লজ্জায় তারা আপনার কাছে আসছে না। কাইস বললেন, ধিক সেই সম্পদের প্রতি যা ভাই-ব্রাদারের পরস্পরের সাক্ষাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এলাকায় ঘোষণার ব্যবস্থা করো, ‘কাইস যাদের কাছে সম্পদ পায় সব মাফ করে দিয়েছে। কিছুই দিতে হবে না।’ এ ঘোষণার পর সন্ধ্যার সময় দেখা গেল, সাক্ষাতপ্রার্থীদের ভীড়ে কাইসের বাসার দরজা ভেঙে গেছে। রাদিয়াল্লাহু আনহুম।

তথ্যসূত্রঃ সিয়ারু আলামিন নুবালা ও তারিখু ইবনে আসাকিরঃ কাইস রা. এর জীবনী

পূর্ববর্তি সংবাদবিশ্ব জুড়ে আড়াই লাখ ছাড়াল করোনায় মৃতের সংখ্যা
পরবর্তি সংবাদকরোনায় মৃত মুসলমানদের দাফনের বিরুদ্ধে করা মামলা খারিজ করল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট