বধ্যভূমিতে রমযান: বিধ্বস্ত এক সিরিয় পরিবারের ইফতার

তারিক মুজিব ।।

কভারের ছবিটি গেটি ইমেজের এক কর্মীর তোলা। স্থান সিরিয়ার ইদলিব। তারেক আবু যায়েদ তার পরিবার নিয়ে ইফতার করছেন। সবার অজ্ঞাতে পার্শ্ববর্তী আরেকটা ভগ্ন দালানের ধসে যাওয়া ছাদ থেকে ছবিটি তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

গেটি ইমেজের ছবি সূত্র ধরে আল জাজিরাহ তারেক আবু যায়েদের সন্ধান করে। ছবির বাড়িটিতেই তার খোঁজ মিলে। মা, এক বোন, স্ত্রী এবং চার সন্তান মিলে আবু যায়েদের আটজনের পরিবার। বংশ পরম্পরায় এখানে তাদের বসবাস। বিদ্রোহী এবং আসাদবাহিনীর সর্বশেষ মোকাবেলার বলি হয় তাদের চারতলা ভবনটি।

আলজাজিরাকে আবু যায়েদ জানান, সে রাতেরর অভিজ্ঞতা খুবই ভয়াবহ। একটি রাতের ব্যবধানে আমরা আশ্রয়হীন হয়ে গেলাম। ক্রমাগত বোমা বর্ষণের ফলে আমাদের চারতলা বাড়িটি ধসে গেল। যুদ্ধ শুরুর নয় বছরই আমাদের কেটেছে আতঙ্ক, অস্থিরতায়। অবশেষে এসে গেলো সেই অনাখাঙ্ক্ষিত দিনটি। যে দিনের কামনা কোনো সিরিয় নাগরিক কোনোদিন করেনি।

ছবিটি দেখিয়ে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে আবু যায়েদের মা সামাহ (৫০) বলেন, পুরোনো দিনের স্মৃতি স্মরণ করতে করতে আমরা ইফতরা করছিলাম। আমার জীবনের বেশিরভাগ রমযান এই বাড়িটিতেই কেটেছে। স্বামী, সন্তান নিয়ে দীর্ঘদিন স্বাচ্ছন্দের জীবন কাটালেও এখন স্বামী বেঁচে নেই। আমাদের সেই সুখও নেই আর।

‘চারতলা দালানটি দুইহাজার সালে নির্মাণ করেছিলেন আমার স্বামী। এগারো সাল পর্যন্ত বাড়ির সবগুলো ইউনিটেই ভাড়াটিয়ারা পালাবদল করে থাকতো। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর চিত্র বদলে যায়। সম্প্রতি যেদিন বোমা হামলায় বাড়িটি ধসে যায় সেদিন আমরা পরিবারের সদস্যরা জড়সড় হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে আশ্রয় নেই। এখন প্রতিবেশি অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও আমরা স্মৃতির কাছে পরাজিত হয়ে এখানেই থেকে গেছি’।

স্বাচ্ছন্দের জীবন কাটানো আমাদের আশ্রয় এখন এই ভগ্ন দালানের ধসে যাওয়া ছাদ। আক্ষেপমাখা অসহায় কণ্ঠে বলেন, সামাহ।

তারেক আবু যায়েদ বলেন, তিনমাস হলো। এভাবেই কাটছে আমাদের জীবন। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খসে পড়া ইট, পলেস্তরা।

“আসলে আমাদের জীবন থেকে শান্তি সেই কবেই দূর হয়ে গেছে। আমরা এখন মৃত্যুর জন্যই বেঁচে আছি। আমাদের সন্তানদের জন্মকালীন কান্না থেমে যায় বোমার আওয়াজ শুনে”।

আরো পড়ুন: দুর্যোগে জাতির সেবায় ইয়েমেনি নারীরা: প্রতিদিন কয়েক হাজার মাস্ক বানিয়ে করছেন বিতরণ

পঞ্চাশ বছরের প্রবীণ সামাহ সর্বশেষ আল জাজিরাকে বলেন, রমযান শুরু হওয়ার পর আমরা একবারের জন্যও রান্নাঘরে যাইনি। রান্না করার কোনো উপাদানই আসলে আমাদের এখন আর নেই। ছেলে কিছু ফল, খেজুর সংগ্রহ করে আনলে তা দিয়েই চলছে আমাদের সাহরি, ইফতার। আমাদের এখন ভাসমান জীবন। তবুও এই বাড়ি, এই পরিবেশ ছেড়ে কোথাও যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তারেক আবু যায়েদ বা সামাহের থেকে ভিন্ন নয় অন্য কোন সিরিয় নাগরিকের জীবনও। কেউ হয়ত সব হারিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ সংসার স্মৃতির কাছে পরাজিত হয়ে ধ্বংসস্তুপেই জীবন কাটাচ্ছেন।

ইদলিব, গোতা, রাক্কা, আলেপ্পো কিংবা আরিহা সবখানেই একই চিত্র।

পূর্ববর্তি সংবাদকেজিতে ২৫ টাকা করে পেঁয়াজ বিক্রি করবে টিসিবি
পরবর্তি সংবাদস্বাস্থ্যবিধি মেনে জোহর থেকে শুরু হলো মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়