হেলায় হেলায় না কাটুক আমাদের রমযান

আশিক বিল্লাহ তানভীর ।।

রমযান যেহেতু খায়র ও বরকতের মাস। তাই এর সময়গুলো অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি মূল্যবান। রমযানের সময়গুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত এবং এতে বেশি থেকে বেশি নেক আমলে ব্রতী হওয়া উচিত। বিশেষ করে সময়কে যথাযথ কাজে লাগাতে খুব সচেষ্ট থাকি। অনর্থক সময় নষ্ট হচ্ছে কি নাÑ এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকা দরকার। কারণ নেকী অর্জন ও ফযীলতের মুহূর্তগুলো এভাবে হেলায় কেটে যাওয়া দুর্ভাগ্যের  বিষয়।

দুআ-দরূদ, যিকির-তিলাওয়াত, তওবা-ইস্তিগফার, নফল নামায ইত্যাদির মাধ্যমে দিন গুযরান করি। সামাজিক রাজনৈতিক বিভিন্ন গল্পগুজব পরিহার করি। ডিভাইস ব্যবহার সীমিত করি; বরং খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ রাখি।

বুযুর্গানে দ্বীন বলে থাকেন, রোযা রেখে ক্লান্ত হয়ে গেলে প্রয়োজনে বিশ্রাম করুন। কিন্তু অনর্থক গল্পে লিপ্ত হবেন না। কারণ কথায় কথা টানতে থাকে এবং আল্লাহ না করুন, বেশি কথা বললে তা ধীরে ধীরে মিথ্যা, গীবত-শেকায়েত ইত্যাদি বিভিন্ন দিকে ছুটতে থাকে। দুনিয়াবী কাজকর্ম সীমিত করে আনুন। ইবাদতের প্রতি বেশি মনোযোগ দিন।

রমযানে গুনাহের ধারা অব্যাহত রাখা খুবই খারাপ কথা। যেখানে ঘোষণা হতে থাকে নেকীর কাজে অগ্রসর হতে, অনিষ্ট থেকে নিবৃত্ত হতে, সেখানে গুনাহের ধারা অব্যাহত রাখা অনেক বড় মাহরূমির কারণ। বিশেষ করে অনাচার-পাপাচার ও অশ্লীলতা এবং এমন গুনাহ, যা আল্লাহর ক্রোধকে আরো বাড়িয়ে দেয়, এমন সব বিষয় পুরোপুরি বর্জন করা উচিত। কারণ ফিরে আসার এটাই মোক্ষম সময়। কিন্তু ফিরে না এসে এর অনুভ‚তিও জাগ্রত না হওয়া বহুত বড় বরবাদির বিষয়।

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত

أَنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ رَقَى الْمِنْبَرَ، فَلَمّا رَقَى الدّرَجَةَ الْأُولَى قَالَ: آمِينَ، ثُمّ رَقَى الثّانِيَةَ فَقَالَ: آمِينَ، ثُمّ رَقَى الثّالِثَةَ فَقَالَ: آمِينَ، فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، سَمِعْنَاكَ تَقُولُ: آمِينَ ثَلَاثَ مَرّاتٍ؟ قَالَ: لَمّا رَقِيتُ الدّرَجَةَ الْأُولَى جَاءَنِي جِبْرِيلُ  فَقَالَ: شَقِيَ عَبْدٌ أَدْرَكَ رَمَضَانَ، فَانْسَلَخَ مِنْهُ وَلَمْ يُغْفَرْ لَهُ، فَقُلْتُ: آمِينَ. ثُمّ قَالَ: شَقِيَ عَبْدٌ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ أَوْ أَحَدَهُمَا فَلَمْ يُدْخِلَاهُ الْجَنّةَ، فَقُلْتُ: آمِينَ. ثُمّ قَالَ: شَقِيَ عَبْدٌ ذُكِرْتَ عِنْدَهُ وَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْكَ، فَقُلْتُ: آمِينَ

একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে আরোহণ করলেন। প্রথম ধাপে উঠে বললেন, আমীন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে উঠেও বললেন, আমীন। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ্র রাসূল! আপনাকে (এভাবে) আমীন বলতে শুনলাম? তখন নবীজী বললেন, আমি যখন মিম্বারে আরোহণ করলাম তখন জিবরীল আগমন করলেন এবং বললেন, ঐ ব্যক্তি হতভাগা, যে রমযান মাস পেল, আর রমযান গত হয়ে গেল কিন্তু তার গোনাহ মাফ হল না। আমি বললাম, আমীন। তারপর বলল, ঐ ব্যক্তি হতভাগা, যে তার মা-বাবাকে অথবা কোনো একজনকে বার্ধক্যে পেল অথচ তারা (মা-বাবা) তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাল না (অর্থাৎ তাদের খেদমতের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।) আমি বললাম, আমীন। তৃতীয় বার বললেন, ঐ ব্যক্তি হতভাগা, যার সামনে আপনার নাম উচ্চারিত হল আর সে আপনার উপর দরূদ পাঠ করল না। বললাম, আমীন। আলআদাবুল মুফরাদ, বুখারী, হাদীস ৬৪৪; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭৪৫১

 

ঈদ শপিং

ঈদকে সামনে রেখে যে শপিং-সংস্কৃতি সমাজে চালু হয়েছে এবং তাতে ব্যাপকহারে নারীদের অংশগ্রহণ এবং যে পর্দাহীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা খুবই উদ্বেগের বিষয়। দেখা যায়, রমযানের শেষ দিকে এর চাপ আরো প্রবল হয়। আফসোসের কথা হল, যেখানে শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করতে বলা হয়েছে এবং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোমর বেঁধে ইবাদতে মশগুল হতেন, পরিবারের লোকদের সজাগ করতেন তখন আমি কেনাকাটায় ব্যস্ত! তাই ঈদের কেনাকাটা আগে থেকেই সেরে নিই, নারীদের যেন মার্কেটে যেতে না হয় এজন্য পুরুষরা সহায়তা করি এবং শেষ দশকে আমলে মশগুল হই, শবে কদর তালাশে উন্মুখ হই।

আমাদের ঈদ তো অন্যদের উৎসবের মতো নয়। ঈদ হল আল্লাহর নিকট সমর্পিত হওয়ার আনন্দ। আল্লাহ্র মাগফেরাত লাভের আনন্দ। এই ঈদ উদ্যাপন করা যেমন আল্লাহ্র হুকুম, তেমনি এর উদ্যাপনও হতে হবে আল্লাহর হুকুম মোতাবেক।

ঈদের দিন নতুন পোশাকই পরতে হবে এমন ধারণা সঙ্গত নয়। বরং ঈদের দিনের একটি মুস্তাহাব আমল হল, নিজের কাছে থাকা উত্তম পোশাকটি পরিধান করা। আর আল্লাহ ক্ষমা করুন, বিজাতীয় বসন-ভ‚ষণ ধারণ করা তো ঈদের রূহই নষ্ট করে দেয়। মুসলিম এমনটি করতে পারে না।

তাই ঈদশপিংয়ে সময় বরবাদ না করে নিজের দ্বীন-ঈমানের প্রতি মনোযোগী হওয়াই সচেতন মুমিনের পরিচয়।

 

রমযানের সম্মান রক্ষা করি

নিজে রোযা রাখতে না পারা এক ধরনের অপরাধ। কিন্তু রমযানের পবিত্রতা নষ্ট করা, রোযা ও রোযাদারের প্রতি সম্মান না দেখানো অনেক বড় ধৃষ্টতা। রাস্তায় প্রকাশ্যে রোযার বেহুরমতি করা, হোটেলগুলোতে পর্দা ঝুলিয়ে দিব্বি নাফরমানিতে লিপ্ত হওয়া, মিডিয়া ও চ্যানেলগুলোতে অশ্লীল প্রোগ্রাম চালু রাখা, সিনেমা হলগুলো যথানিয়মে সচল থাকা ইত্যাদি বিষয়গুলো জাতীয় ও সামাজিক নাফরমানীর অন্তর্ভুক্ত। এরকম জামাতবদ্ধ নাফরমানি আল্লাহ্র ক্রোধ বাড়িয়ে দেয় এবং অনেক বড় দুর্গতি ডেকে আনে। আল্লাহ্র ওয়াস্তে রমযানের সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষার স¦ার্থে এসব গর্হিত আচরণ থেকে নিবৃত্ত হই। ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে এবং পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করি। আল্লাহ তাওফীক দান করুন।

 

রমযান হোক ফলপ্রসূ

রমযান মাস তাকওয়া অর্জনের মাস। তাই এ মাসে করণীয় হলÑ তাকওয়া হাছিলে এগিয়ে আসা। কিয়ামুল লাইলের প্রতি যতœবান হওয়া। কুরআন নাযিলের মাস হিসাবে তিলাওয়াতে কুরআন, তাদাব্বুরে কুরআন (কুরআনের আয়াত ও হেদায়াত নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা) এবং আমল বিল কুরআনের প্রতি মনোযোগী হওয়া। কুরআনের তালীমের হালকা কায়েম করা। যাদের তিলাওয়াত সহীহ নেই তিলাওয়াত সহীহ করা। বেশি বেশি নফল ইবাদত, দুআ-দরূদ, তওবা-ইস্তিগফার, যিকির-তিলাওয়াত ইত্যাদিতে সময় লাগানো। সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ব চর্চায় ব্রত হওয়া। অধিক পরিমাণে দান সদকা করা এবং সকল প্রকার খায়র ও কল্যাণে এগিয়ে আসা। সংযম বজায় রাখা। প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত করা। নিজের ও পরিবারের ঈমানী আমলী এবং আত্মিক উৎকর্ষের প্রতি মনোনিবেশ করা।  মাহে রমযান ও রোযাদারের প্রতি সম্মান বজায় রাখা। রমযানের পবিত্রতা রক্ষা করা। সকল প্রকার গুনাহ পাপাচার এবং অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকা।

রমযানের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তগুলোর ব্যাপারে যত্মবান হওয়া। যেমন- সাহরী, ইফতার, তারাবীহ, তাহাজ্জুদ, শবে কদর ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর ব্যাপারে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা। এ মুহূর্তগুলোর যে বিশেষ আমল রয়েছে তাতে আত্মনিয়োগ করা এবং তওবা-ইস্তিগফার, দুআ-দরূদ, যিকির-তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদতের মাধ্যমে সময়গুলোকে কাজে লাগানো। মসজিদগুলো ইবাদতের মাধ্যমে আবাদ রাখা।

এই এক মাসে তাকওয়ার মেহনতের মাধ্যমে গোটা বছরের ঈমানী, আমলী এবং রূহানী যিন্দেগীর পাথেয় সংগ্রহ করা।

রমযান কীভাবে যাপন করতে হয় এজন্য আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের রমযানী যিন্দেগী থেকেও অনেক খোরাক লাভ করা যায়। এ ক্ষেত্রে হযরত শাইখুল হাদীস মাওলানা যাকারিয়া রাহ. -এর ‘আকাবির কা রমযান’ (এর বাংলা তরজমাও পাওয়া যায়) পড়লেও ফায়দা হবে, ইনশাআল্লাহ। দেখা যাবে যে, আমাদের বুযুর্গানে দ্বীন রমযান মাসকে কত সাদরে বরণ করতেন! কত গুরুত্বের সাথে এর প্রতিটি মুহূর্তের কদর করতেন!

মোটকথা, রমযান আসে, রমযান যায়। এভাবে জীবনও একদিন শেষ হয়ে যাবে। বুদ্ধিমান তো সে, যে আগ থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে। রমযান আসার আগেই মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করে, আমলের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। রমযানকে সামনে রেখে সে প্রস্তুত করে রুটিন। কাজে লাগায় রমযানের বরকতময় প্রতিটি মুহূর্ত। সে অগ্রগামী হয় নেকি ও কল্যাণের পথে, তাকওয়া হাছিলের পথে এবং ব্রত হয় গুনাহ থেকে পাক-ছাফ হয়ে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করার মেহনতে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সেই তাওফীক দান করুন। রমযানের সমূহ কল্যাণ ও ফযীলত লাভ করে মাগফেরাত ও রহমতে উপযুক্ত হওয়ার তাওফীক নসীব করুন। আমীন।

পূর্ববর্তি সংবাদপাকিস্তানে শনিবার থেকে লকডাউন শেষ
পরবর্তি সংবাদকরোনা ভাইরাস : মক্কা-মদীনায় স্থাপন করা হল বিশেষ প্রবেশদ্বার