মন ভাল রাখার মত কয়েকটি কাজ যা আপনিও করতে পারেন

ইসলাম টাইমস ডেস্ক : লকডাউন ও করোনা ভাইরাসের ফলে মানসিক সংকট তৈরি হচ্ছে।  ভবিষ্যৎ কী হবে, সে নিয়েও দুশ্চিন্তা। একটি মানুষ দিনের পর দিন অন্তরীণ থাকাটা মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়, শারীরিক-মানসিক কোনো দিক দিয়েই নয়। এর মধ্যে আছে অর্থনৈতিক সংকট, আছে নিজের বা আপনজনের অসুস্থতা। এসব দুশ্চিন্তা, বেদনা, মানুষের মনকে অসুস্থ করে তুলতেই পারে। এখানে মন ভাল রাখার মত কয়েকটি টিপস তুলে ধরা হল।

আপনার ধর্মীয় দায়িত্বগুলো আদায় করুন

মসজিদে কিংবা ঘরে নামাজ মিস দিবেন না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ুন। এবং সেই সাথে কুরআন তেলাওয়াত ও কিছু যিকির আযকার করুন। অন্তরের প্রশান্তির জন্য আল্লাহর যিকিরের বিকল্প নেই। রমযানের রোযাগুলো যথাযথভাবে পালন করুন। গোনাহ ও অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকুন। প্রতিদিন কিছু না কিছু দান সাদাকা করুন।

অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকুন
বাইরে বের হতে না পারলেও বন্ধু ও নিকটজনদের সঙ্গে যুক্ত থাকুন। প্রতিবেশীর সঙ্গে ফোনের মাধ্যমে, ই–মেইলের মাধ্যমে যুক্ত থাকুন। যাঁদের সঙ্গে কথা বলে আপনার মন ভালো হয়, ভার লাঘব হয়, তাঁদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলুন।

আবার যাঁদের মানসিক সাহায্য দরকার, প্রতিদিন তাঁদের ফোন দিয়ে আশা জাগিয়ে তুলুন, উৎফুল্ল রাখুন। এটা নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

অত্যধিক স্মার্টফোন, ফেসবুক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন
প্রথম পরামর্শটি পরিমিত ও সুস্থ যোগাযোগ। কিন্তু এসব বেশি হয়ে গেলে সেটা হিতে বিপরীত হয়ে যায়। আজকের যুগে একজন মানুষ ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে শুরু করে আবার ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত, জাগ্রত সময়ের এমন কোনো মুহূর্ত নেই যে ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা করছে না। লকডাউনের কারণে এ একেবারে বিরতিহীনভাবে চলতে পারে। এটা করা যাবে না। তাতে অবসাদ, ক্লেশ শুধু বেড়েই চলবে। দিনের একটা সময় সম্পূর্ণ স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ামুক্ত রাখতে হবে। ফোন দূরে রাখুন, কম্পিউটারে গেলেও কোনো সোশ্যাল মিডিয়া নয়। এটা জরুরি।

রুটিন মেনে চলুন
এখন তো কোনো রুটিন নেই। সকালে কাজে বা স্কুল-কলেজে যেতে হলে রুটিন থাকে। প্রাত্যহিক কার্যকলাপে তা সময় বেঁধে দেয়। রুটিন না থাকলে হয়তো ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না, খাওয়ার সময় ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। বিশৃঙ্খলা মনের জন্য, শরীরের জন্য ভালো নয়। নিজেই নিজের রুটিন করুন। লিখে রাখুন, ফ্রিজে ঝুলিয়ে দিন। অন্য কারও সঙ্গে জোট বেঁধে সবাই সেই রুটিন মেনে চলতে একে অন্যকে উদ্বুদ্ধ করুন।

এই লাগামহীন যথেচ্ছ জেগে থাকা, যথেচ্ছ কথা বলা, যথেচ্ছ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাফেরা, এসব শরীর-মন দুটোরই ক্ষতির কারণ হবে। আগেও ক্ষতি করত, লকডাউনের পর আরও বেশি করবে।

বাসায় শিশু–কিশোরদের জন্য রুটিন বিষয়টা আরও জরুরি। তাদের করোনা–পূর্ব আর দশটা সাধারণ কর্মমুখর দিনের মতো রুটিনেই রাখুন। নিজেও সেভাবে আহার-নিদ্রা, রান্না-বাড়া, ক্লিনিং,  বই পড়া, বিষয়গুলো পরিকল্পনা মাফিক, সময় বরাদ্দ করে করুন। শিশুরা বড়দের দেখে শেখে।

এই অবসরে কাজের কিছু করুন। বই পড়ুন। নতুন কিছু শিখুন, সার্টিফিকেট নিন। অনলাইন কোর্স আছে, সেখান থেকে কিছু শিখুন। তাতে মানসিক চাপ কমবে, মন ভালো থাকবে। সঙ্গে সঙ্গে আত্মোন্নয়নও হচ্ছে।

সুষম খাদ্য ও ব্যায়াম
এ দুটোর কোনো বিকল্প নেই। এ সময় লাগাম ছেড়ে দিলে যা হবে, আহার বেশি নিদ্রা কম। হওয়া উচিত উল্টো, আহার কম নিদ্রা বেশি। পূর্ণবয়স্ক মানুষের ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। ঘুম কম হলে শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও কমে যাবে। যেটা এই করোনাকালে কিছুতেই করা যাবে না।

মোট খাওয়ার পরিমাণের মোট ক্যালরির হিসাব রাখুন। নিজের ওজন নিন। অনেক সময় বিপদের মধ্যে বেশি করে খাওয়াটাকেই একটা বিকল্প রাস্তা মনে হতে পারে। তাতে আরও বেশি ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে বলছেন, এর জন্য সুষম খাদ্য খেতে হবে। ফলমূল বেশি খেতে হবে। সুষম খাদ্যের তথ্যের অনেক সূত্র আছে। এখানে আপনার ইচ্ছাই প্রধান সহায়ক, আর অনিচ্ছাই প্রধান অন্তরায়।

ব্যায়াম করাটা একান্ত জরুরি। এই লকডাউনে আগের চেয়েও বেশি জরুরি। ব্যায়াম করলে মস্তিষ্কে ডোপামিন এবং এন্ডোরফিন নিঃসরিত হয়। এ দুটো মানুষকে উৎফুল্ল রাখতে, আনন্দে রাখতে সাহায্য করে। শরীর ও মনের জন্য অতি উত্তম। ব্যায়াম, সে যা কিছু হতে পারে, বুকডন, ওঠবস, যোগব্যায়াম। জায়গা থাকলে হাঁটা বা দৌড়ানো, ভার উত্তোলন। বাসায় বসে কি করা যায় না? হাত পা নাড়াতে হবে, পেশিকে সামান্য হলেও ব্যবহার করতে হবে, না হলে খিল ধরে যাবে। আর মনের মধ্যে জমবে হতাশা ও অবসাদ। এর কোনো বিকল্প নেই। আপনি যদি প্রাক করোনা যুগে কোনো ব্যায়াম না-ও করে থাকেন, ক্যালরি হিসেবে করে না-ও খেয়ে থাকেন, এখন করুন, এখনই দরকার বেশি। তারপর এই ভালো অভ্যাসটা বজায় রাখুন।

সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত হোন
সৃজনশীল কাজে মানুষ বাহবা দেবে, সে জন্য নয়। নতুন কালজয়ী কিছু করাই  শুধু সৃজনশীল নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হস্তশিল্প, নতুন রান্না, সেলাই, উলের কাজ, নিজের মনে আঁকাআঁকি, সবই সৃজনশীল কাজ।

‘জার্নাল অব পজিটিভ সাইকোলজি’ শিশুদের নিয়ে একটি পরীক্ষা চালায়, তাতে দেখা গেছে শিশুরা যখন আঁকাআঁকি, সেলাই, উলের কাজ, অথবা স্ক্র্যাপবুকিং করছে, তখন তারা অনেক উৎফুল্ল থাকে। তারা কাজটি আবার করতে চায়। তাদের মধ্যে উৎসাহ–উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। এই পরীক্ষা শেষে টামলিন কনার বলেন, ‘এই ফলাফল থেকে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য প্রতিদিন কিছু সৃজনশীল কাজ করা কত জরুরি।’

তবে সৃজনশীলতায় কিছুই বাদ যাবে না। আপনি গজল শিখতে পারেন, বাড়ির দেয়াল রং করতে পারেন, বাগান করতে পারেন। লিখতে পারেন, আবৃত্তি করতে পারেন, ভিডিও বানাতে পারেন, যা কিছুতে আপনার আগ্রহ, যা কিছুতে আপনার সামান্যতম প্রতিভা আছে।

অন্যের সেবা-যত্ন করা
অনেক মনীষী বলেছেন, পরার্থে জীবনের মতো সফল জীবন আর হয় না। স্বার্থপরতায় গ্লানি জন্মায়, জীবনের উদ্দেশ্য থাকে না। ছোট-বড় যেকোনো পরিসরে সেবা করা, সাহায্য করা মানুষকে উদ্দীপ্ত করে। মন ভালো রাখে। অনাবিল আনন্দ দেয়। নিজের বাসায় যাঁরা আছেন, যাঁদের সময় দেওয়া দরকার, সাহায্য দরকার, তাঁদের সেবা করুন। দূর থেকে দরিদ্র মানুষের, অসুস্থ মানুষের জন্য করুন। পারলে বড় পরিসরে করুন। না পারলে একটি পরিবারকে হলেও সাহায্য করুন। এতে মন ভালো হবে, একটা ‘Purpose’ তৈরি হবে। এই মুহূর্তে পৃথিবীতে মায়া-মমতা, দয়া-দাক্ষিণ্য, সেবা-যত্ন, ভীষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। সেদিকে চোখ ফেরালে নিজের সমস্যা অনেক ক্ষুদ্র, অনেক ম্রিয়মাণ হয়ে যাবে।

 

পূর্ববর্তি সংবাদসোমালিয়ায় মসজিদে তারাবীহ পড়া অবস্থায় সাবেক খেলোয়াড়কে গুলি করে হত্যা
পরবর্তি সংবাদ২৫০ বছরের রেকর্ড ভাঙলেন বরিস জনসন, সুস্থ হয়েই স্ত্রীকে দিলেন ডিভোর্স