শিহাব সাকিব ।।
দিন যত যাচ্ছে সময় নষ্টের আয়োজন, উপকরণ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবন যতটা সহজ হচ্ছে তারচে বেশিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নৈতিক চারিত্রিক উৎকর্ষ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। আধুনিক জগতের সাথে এনালগের সেই মাধুর্য, সেই অকৃত্রিমতার তুলনা বাদ দিলেও, আমরা হারিয়ে চলেছি অনেক কিছুই। মানব জাতির জন্যে যার প্রায়শ্চিত্ত করা প্রায় মুশকিল।
আধুনিক আবিষ্কার অবশ্যই প্রশংসনীয়। আপনি এই লেখাটা খুব সহজেই পড়তে পারছেন, এটা ডিজটাল যোগাযোগমাধ্যমের অবদান। সব কিছুর ন্যায় স্যোশাল মিডিয়ারও রয়েছে চাকুর মত দ্বিমুখী চরিত্র। চাইলে আপনি তাকে ব্যাবহার করে উপকৃত হতে পারেন। আবার আপনার একটু অসতর্কতা, একটু অসংযম ডেকে আনতে পারে মহা বিপর্যয়, বিরাট বিচ্যুতি।
সময় অমূল্য সম্পদ
হাদীস শরিফে আছে, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সুস্থতা ও অবসর, এই দুটি নেয়ামতে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, প্রতারিত।-সহিহ বুখারি৬৪১২।
ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন “আমি সুফিদের থেকে যে অমূল্য দুটি শিক্ষা পেয়েছি তন্মধ্যে একটি হল সময় তরবারি মত তুমি না কাটলে তোমাকে কেটে ফেলবে।”
হীরা জহরত মনি মুক্তা স্বর্ণ রৌপ্য, মূল্যবান যত ধাতব পদার্থ আছে, সবকিছুর সাথেই তুলনা করা হয়েছে সময়কে। কিন্তু না, সময় এসবের থেকেও বেশি মূল্যবান। উপমা হিসেবে হাসান আল বান্না অসাধারণ বলেছেন-“সময়ই জীবন!”
সময়ের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নাই। থাকতে পারে না। এ এক অমোঘ সত্য। তবে এই সময়কেই মানুষ সবচে বেশি অবহেলায় নষ্ট করে।অপ্রয়োজনে, স্থুল কারণে, কাজের অজুহাতে, আবার কখনও কাজের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অযথা সময় খরচ করে।
কোন মুমিনের মুখে “টাইম পাস করছি” বা “সময় কাটছে না” এসব শব্দ মানায় না। সময় এমন জিনিস নয় যে শুধু শুধু তা পাস করতে হবে। সময় বহতা নদীর স্রোতের মত, সময় বরফের মত, কাজে লাগালে উপকৃত হবেন, অবহেলা করলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
মুমিনের সময় ব্যয় হবে উপকারি ও কল্যাণের কাজে।অনর্থক ও উদ্দেশ্যহীন কাজে কখনই ব্যয় হতে পারে না। অন্যায়ভাবে, অসৎ পথে, গুনাহের কাজে সময় নষ্ট করার তো প্রশ্নই ওঠে না! মুমিন এটা কখনও করতে পারে না, এটা মুমিনের জন্যে শোভা পায় না। কারণ সে জানে তার রবের সামনে সবকিছুর কৈফিয়ত তাকে দিতে হবে।
সময়কে যত কাজে লাাগাবেন আপনার জীবনে তত উন্নতি সাধন করতে পারবেন। পৃথিবীতেযারাই বড় হয়েছেন সময়কে কাজে লাগিয়েই হয়েছেন। অবহেলা অলসতা করে কেউ কোন দিন সাফল্যের মুখ দেখতে পারে না। কস্মিনকালেও না।
সবাই যদি ভবিষ্যৎ সচেতন থাকে, ইহকাল পরকালের প্রাপ্তির কথা চিন্তা করে,তাহলে এত এত মোটিভিশনাল বই, লেকচার, কোন কিছুরই প্রয়োজন হবে না। তাছাড়া এসব কিছুর মাধ্যমে মোটিভেটেড হলেও তার স্থিতি সাধারণত খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়। সেল্ফ মোটিভেশন বা আত্ননিয়ন্ত্রণের উপরে কোন কিছু নাই। ব্যস,নিজের ভবিষ্যৎ, ক্যারিয়ার ও পরকালের চিন্তাই আপনাকে সময়ের ব্যাপারে যত্নবান করে তুলবে, সাফল্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
সময় নষ্টের শত আয়োজন
আজকাল সময় নষ্টের কত রকম আয়োজন, কত শত পন্থা, কখনও এন্টারটেইনমেন্টের নামে, কখনও সংস্কৃতির নামে, অযথা সময় ব্যয়ের মাধ্যম আববিষ্কৃত হয়েছে। ইন্টারনেট, স্যোশাল মিডিয়া, বিশেষকরে ফেইসবুক ইউটিউব ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটিক মহামারি আকার ধারণ করেছে। এসবের মাধ্যমে সীমিত উপকার যে হচ্ছে তা অনস্বীকার্য বটে। তবে অযথা সময় নষ্ট হচ্ছে প্রচুর। সাথে সামাজিক ও ধর্মীয় বিধি নিষেধের কবর রচনা করা হচ্ছে।কী এমন অপরাধ আছে যা এখানে হচ্ছে না! কোন ভদ্র সভ্য লোকের পক্ষে এসব ব্যবহার করা এখন এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখনই যদি লাগাম টেনে ধরা না হয় তাহলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে, বিপদ দিন দিন বাড়তে থাকবে, এই মহাবিপদ থেকেসমাজের কেউই রেহাই পাবে না, প্রতিটি মানুষকে গ্রাস করবে এই বিপদ।
কীভাবে সময় বাচাঁবেন?
- সবসময় একথা মাথায় রাখবেন সময় আল্লাহর দান। তিনি সময় নষ্ট করতে নিষেধ করেছেন। আমি তার বান্দা। কীভাবে তার নাফরমানি করি? একদিন আমাকে দাঁড়াতে হবে আমার রবের সামনে, জবাব দিতে হবে প্রতিটি কর্মের, প্রতিটি মুহূর্তের!
- পুরো দিন রুটিন মাফিক চলুন। শুধু শিক্ষার্থী না, আপনি যে পেশার লোকই হন, ফজর থেকে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সব কিছু রুটিন মত করুন। খুব যত্নের সাথে রুটিন মেনে চলুন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্ম ক্ষেত্রে কিন্তু আমরা ঠিকই নিয়ম মেনে চলি। তাহলে বাসায় নয় কেন? সবচে ভালো হয় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে নিয়ে যদি একাজ করা যায়।
- সম্ভব হলে আপনার পুরো দিনের রুটিনে ইন্টারেনেট ফেইসবুকিংয়ের জন্যে কোন সময় বরাদ্ধ রাখবেন না। এটাই সবচে উত্তম। এসব একদম বন্ধ করে দিন। খুঁড়া অজুহাত ঝেড়ে ফেলে দিন। একান্ত প্রয়োজনে যদি ব্যবহার করতেই হয় তবে একদম নিয়ন্ত্রিত ও সীমিত আকারে ব্যবহার করুন।
- ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্যে সময় নির্দিষ্ট করে ফেলুন। ধরুন সারাদিনে ১৫ বা ২০ মিনিট। তাও শুধু জরুরি প্রয়োজনে, কারো সাথে যোগাযোগ করা বা খবর জানার জন্যে। ফেইসবুকিং করতে চাইল সেই নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর করুন। গুরুত্বপূর্ণ কিছু পোস্ট করার থাকলে করুন। দরকারি কমেন্টের উত্তর দিন। ব্যস, ফেইসবুক থেকে বেরিয়ে পড়ুন। নিউজফিড স্ক্রলিং না করাই ভাল। কারণ এতে উপকারি পোস্টের চেয়ে অপ্রয়োজনীয়, কম প্রয়োজনীয়, গুরুত্বহীন, ফানি, গুজব, ভুয়া সংবাদ, ট্রলের পোস্ট সামনে আসবে বেশি! কী দরকার এসবে আপনার মূল্যবান সময় ব্যয় করার? শুধু শুধু ফেইসবুককে লাভবান করার? এটা তো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। কোন বুদ্ধিমান এমন কাজে করতে পারে না।
মনে রাখবেন ফেইসবুক ইউটিউব ও অন্যান্য স্যোশাল মিডিয়া আপনি ব্যবহার করবেন নিজের উপকারের জন্যে। কখনও যেন এমন না হয়ে যায় যে, এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আপনাকে ব্যবহার করে হাজার হাজার ডলার লুফে নিচ্ছে! বিনিময়ে আপনার খাতায় জমা হচ্ছে জিরো! শুধু জিরো!
ফেইসবুকিং: সময় বাঁচাতে যা করবেন
- ফ্রেন্ডলিস্ট সীমিত করে ফেলুন। পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছাড়া অন্যদেরকে ফ্রেন্ডলিস্টে রাখবেন না। ফলোয়িং কমিয়ে ফেলুন।দরকারি ও প্রয়োজনীয় একাউন্ট ও পেইজ ছাড়া অন্যগুলো আনলাইক, আনফলো করে দিন।
- অযথা স্ক্রলিং করবেন না। নিউজফিডে স্ক্রলিংয়ের সময় বেঁধে নিন। দরকারি লেখা বা খবর দ্রুত পড়ে ফেলুন। অতিরিক্ত বিশ্লেষণ, অদরকারি লেখা পড়ার কোন মানে নেই।
- কী পোস্ট করবেন? সেটা অবশ্যই আপনার শিক্ষা, পেশা বা আপনার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়েই হওয়া চাই। আপনার যে বিষয়ে জানাশোনা নেই বা যে বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা নেই সে বিষয়ে কোন কিছু পোস্ট না করাই ভাল। ধরুন, আপনি পড়েছেন ইঞ্জিরিয়ারিংয়ে লিখতে বসে গেলেন করোনা শনাক্তকরণ কীট বা ভ্যাকসিন নিয়ে! এটা অনধিকার চর্চা। এটা অপরাধ। এতে উপকার তো দূরে থাক, বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে। তেমনি আপনি ধর্মীয় বিষয়ে অভিজ্ঞ না, একাডেমিক বা নিয়মতান্ত্রিক পড়াশোনা আপনার নাই, কিন্তু লেগে গেলেন ধর্মের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম বিষয়ে অসার ও লাগামহীন অসংযত আলোচনায়, বেফাঁস মন্তব্যে! এটাও অনধিকার চর্চা! এটাও অন্যায়।
আর খেয়াল রাখতে হবে পোস্টটি যেন ফ্রেন্ড ফলোয়ারদের উপযোগী ও তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়। এমন যেন না হয়, আপনার বন্ধুতালিকায় জেনারেল শিক্ষিত অনেকে আছেন, আর আপনি মাদরসার একদম ঘরোয়া বিষয় নিয়ে কিছু লিখে ফেললেন! অথবা আপনার লিস্টে পরিবাবের বাইরের কেউ আছে অথচ আপনি পারিবারিক বিষয়ে পোস্ট করে বসলেন। এসব কমন সেন্সের কথা। তবুও বলছি, কারণ এসবের মুখোমুখি আমাদেরকে আজকাল হতে হচ্ছে! খুবই দুঃখের বিষয়!
ভাইরাল সব বিষয়েই আপনার নাগ গলানো উচিৎ নয়। বিশ্লেষণের পর বিশ্লেষণ, নানামুখী আলোচনা সমালোচনা, অনর্থক পর্যালোচনা, এসবে কী লাভ বলুন, আপনার। হ্যা, একান্তই আপনাকে কোন কিছু যদি স্পষ্ট করতে হয়, ভুল শুধরাতে হয়, তাতে তো সমস্যা নেই, বরং তা করা চাই।
বহুল প্রচারিত খবর বা তথ্য পোস্ট করা থেকে বিরত থাকুন। স্যোশাল মিডিয়াতে আসেনি, অথচ গুরুত্বপূর্ণ এমন সব বিষয় নিয়ে লিখতে সমস্যা নেই।বিশেষত ইসলাম ও মুসলমানের অধিকার যে সব বিষয়ে জড়িয়ে আছে।
- কমেন্ট করবেন। তবে তা একদম সীমিত ও দরকারি ক্ষেত্রে। যে কোন লেখায় নোয়াখালি বিভাগ চাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেশ চাই, সমালোচিত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জাতীয় গৎবাঁধা ফালতু ও বিদ্বেষমূলক কমেন্ট একদম চলবে না।
কিছুতেই অযথা তর্কে জড়াবেন না। এসবে কোন লাভ নেই। তবে চাইলে ইতিবাচক মন্তব্য করতে পারেন, এতে কখনও ফায়দা হয়।
ধর্মীয়, জাগতিক, রজনৈতিক সব ক্ষেত্রেই মতের মিল অমিল থাকবে, থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে ভিন্ন মত ও দলের লোকের সম্মান ও ইজ্জত রক্ষা করেই আপনাকে কথা বলতে হবে, মন্তব্য করতে হবে। মতানৈক্যের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা অন্যায়। আপনার প্রতিপক্ষ সীমা অতিক্রম করলেও, আপনি তা করতে পারেন না। কোন মুমিন করতে পারে না। একজন গালি দিলে, কটু কথা বললে আপনার জন্যে গালি দেয়া, কটু কথা বলার বৈধতা তৈরি হয় না।
- আপনার পোস্টের নিচের কমেন্ট বক্সে নজর বোলাতে পারেন। প্রয়োজনীয় কমেন্টের উত্তর দিন। নতুবা এড়িয়ে যান।
- বিনা প্রয়োজনে কাউকে মেসেজ করবেন না। হাই হ্যালো জাতীয় অর্থহীন মেসেজ একদম দিবেন না। যা বলার এক মেসেজে বলে ফেলুন। বারবার একটু একটু মেসেজ দিবেন আর ঐ প্রান্তে টুংটাং শব্দে হবে, এটা খুবই বিশ্রী ব্যাপার। ভয়েস বা ভিডিও মেসেজ পাঠাতে পারেন। টেক্সট মেসেজ থেকে ভয়েস মেসেজ আপনার সময় বাঁচিয়ে দিবে অনেক। অবশ্য ভয়েস টাইপিং এপও ব্যবহার করতে পারেন। এতে অনেক দ্রুত লেখা যায়।অপরিচিত কাউকে মেসেঞ্জারে অডিও বা ভিডিও কল দেয়ার আগে অবশ্যই অনুমতি নিয়ে নিবেন।
- প্রতিদিন কমপক্ষে একবার মেসেজবক্স খুলে দেখুন। আপনার যখন একাউন্ট আছে মেসেজ আসবেই। দরকারি মেসেজের উত্তর দেয়া আপনার কর্তব্যের ভেতর পড়ে। ফিল্টারড মেসেজগুলোও দেখুন, সময় হলে। সেখানেও কোন গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ থাকতে পারে।
- ফেইসবুক টাইম রিমাইন্ডার অপশন চালু করুন। সারাদিন আপনি আনুমানিক কত সময় ফেইসবুকিং করবেন, সেটা ঠিক করুন। এরপর ফেইসবুকের“সেটিং এন্ড প্রাইভেসিতে” যান। “ইউর টাইম অন ফেইসবুকে” চাপুন। “সেট ডেইলি টাইম রিমাইন্ডার” এ ক্লিক করুন। আপনার ইচ্ছা মত সময় সেট করে নিন।
এক্ষেত্রে অবশ্যই একটু একটু করে কমিয়ে আনতে হবে। প্রথম দিনই একদম কমিয়ে আনার দরকার নেই। আস্তে আস্তে কমান। নতুবা দেখা যাবে আপনি এটা রক্ষা করতে পারছেন না।
- সবচে বড় কথা হল আপনার নিজের একান্ত ইচ্ছা। আপনি না চাইলে দুনিয়ার কেউই আপনার সময় বাঁচাতে পারবে না। অতএব সিদ্ধান্ত আপনার হাতে, সময়কে কাজে লাগাবেন, নাকি খেল তামাশায় নষ্ট করবেন?
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সময় হেফাজত করার, সময়কে সর্বোচ্চ ভাল কাজে ব্যয় করার ও তার মর্জি মত আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
৭.৫.২০২০
















