“এ পৃথিবীর যা কিছু মহান চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী…”

আবদুল্লাহ মারুফ ।।

বাঙলাভাষার কিংবদন্তিতুল্য লেখক, সম্পাদক, বরেণ্য আলেমেদ্বীন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এই যে দুই হাত ভরে লিখেছেন, লিখতে পেরেছেন, এটা কিন্তু ঘরের এই মহীয়সী নারীটির জন্যই সম্ভব হয়েছে।

ঘর থেকে যদি তাচ্ছিল্যের বর্ণ-বর্ষণ হতোㅡ ‘কিসব করছেন এইগুলো? শুধু শুধু সময় নষ্ট’, তাহলে কিন্তু এই লেখালেখি, এইযে আজকে মাওলানা খানের পাহাড়সম অবদান; এগুলো আর হতো নাㅡ সকাল-সন্ধ্যার কিনারাই খুঁজে পেতেন না মাওলানা খানㅡ কেবল দৌড় দৌড় দৌড়।

কিন্তু এই মহীয়সী নারী শব্দের হাতুড়ি না পিটিয়ে, ফুলের মমতা দিয়ে বলেছেন, ‘আজকে লিখতে পেরেছেন তো কিছু, নাকি?’

প্রশ্রয়মূলক মধুর হরফগুলো আবৃত্তি করেছেন ঐ সময়, যখন মাওলানা খানের ঘরে চাউল ছিলো না। হাতে টাকা নেই, ঘরে ছেলের দুধের কৌটা নেই। ‘জীবনের খেলাঘরে’ বইটিতে সেই দুর্বিষহ সময়ের কিছুটা আঁচ করা যায়।

সেই তখনো, দরিদ্রতা অভাবঅনটন আর ক্ষুধার রাক্ষসে কামড় সহ্য করেও এই মহীয়সী নারী মাওলানা খানকে সঙ্গ দিয়েছেন। ঠাণ্ডা চাউনিতে মাওলানা খানের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘এই সময় থাকবে না।’
মাওলানা খান বুকে সাহস পেয়ে কলম ছুটিয়েছেন আরবিঘোড়ার মতোㅡ প্রবল বিক্রমে এই ঘোড়া ছুটিয়ে মাওলানা খান ক্রমশ নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। পাড়ি দিয়েছেন এই দুঃসহ সময়।

তারপর খান বাড়িতে সচ্ছলতা ফিরে এলো। আল্লাহপাক হাতভরে দিলেন। আর মাওলানা খানও দুইহাত খুলে খরচ করতে লাগলেন। তাঁর বাড়ি হয়ে গেলো একটি আশ্রয়স্থল।

গ্রাম থেকে, গঞ্জ থেকে, মহকুমা থেকে যেইসমস্ত লোকেরা কাজ করতে বাধ্য হয়ে ঢাকায় যেতো, যাদের থাকবার কোনো জায়গা নেই, তাদের নিরাপদআশ্রয় এবং সুখের ঠিকানা হয়ে গেলো এই খান বাড়ি।

খান বাড়ির পাকঘরে সর্বদা ডেকচি লাগানোই থাকতো। রাতদিন মেহমান, একদলের প্রস্থান তো অপর আরেকটি দলের নতুন করে আগমন। আর তাদের সবার আদর আপ্যায়ন ও যত্নাত্তির নেপথ্যে থাকতেন যিনি; তিনি হলেন এই মহীয়সী নারী।

শুধু গরিবকাঙাল বা বিপদগ্রস্তদেরই ডেরা ছিলো না খান বাড়ি। বরং এই বাড়িতে আগমন করেছিলেন বিশ্বের বড়-বড় মনীষীগণ। হযরত আলী নদাবী হযরত তাকি উসমানি ছাড়াও বিশ্বের অনেক মনীষী আলেমগণ এই মহীয়সী নারীর হাতের রান্না খেয়েছেন। তারিফ করেছেন।

সেবার হযরত আবুল হাসান আলী নদাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি গেণ্ডারিয়ায় তাঁদের বাসায় এলেন। এই জগদ্বিখ্যাত আলেমকে পেয়ে তিনি তো মহাখুশি! যেনো চাঁদ পেয়েছেন হাতের মুঠোয়। এটা রান্না করছেন, ওটা রান্না করছেন, এই পদ ওই পদㅡ মোটকথা, তিনি যা যা পারেন সবকিছু হুজুরের দস্তরখানে হাজির করতে লাগলেন।

ওই সফরে হযরত আলী নদাবী কয়েকদিন ছিলেন খান বাড়িতে। যখন তিনি চলে যাবেন, এই মহীয়সী নারী মাওলানা খানকে ধরলেন, ‘আমি একটু হুজুরকে সালাম করতে চাই!’
মাওলানা খান আর কি করবেন, আবেগের উপর কথা চলে না। তিনি গিয়ে হযরত আলি নদাবীকে বললেনㅡ ‘হুজুর, মোস্তফার আম্মা তো আপনাকে একটু সালাম করতে চায়!’ এই শুনে হযরত আবুল হাসান আলি নদাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি সপ্রতিভ হয়ে বললেনㅡ ‘না, না, মাওলানা, আমি বরং তাঁকে সালাম করবো।’
এই বলে তিনি খান সাহেবকে নিয়ে চললেন। পাশের ঘরে গিয়ে পর্দার ওপাশ থেকে সালাম জানান, আপ্যায়নে মুগ্ধ হয়ে এটা-ওটা বলেন; দুআ দেন।

এই মহীয়সী নারীর বরকতি হাতের খাবার আমিও খেতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ।
হেরার জ্যোতির ঐসব বৈঠকিসময় এখন শুধুই অতীত। অথচ মনে হয় যেনো সেদিনের কথা, ওই যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা!

কত মুগ্ধকর ছিল বুধসন্ধ্যা, বৃহস্পতিসন্ধ্যাㅡ মাওলানা খান রাহিমাহুমুল্লাহর সোহবত, তাঁর সহধর্মিণীর আন্তরিকতাㅡ আহ, হৃদয়টা মোচড়ে উঠে মনে পড়লেই।

আল্লাহপাক তাঁদের উভয়কে আদরে রাখুন! আল্লাহুম্মা আমিন।

পূর্ববর্তি সংবাদ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদমৌলভীবাজারে মনু নদীতে নৌকাডুবি, ৩ ঘন্টা পর ১ জনের লাশ উদ্ধার