মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।
একজন মুসলমানের জন্য ঈমানের পর আবশ্যকীয় আমল হলো নামায। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। কিন্তু আমাদের দেশে অসংখ্য মুসলমান নিয়মিত নামায পড়েন না। কেউ কেউ হঠাৎ নামায শুরু করেন। এরপর তা ধরে রাখার চেষ্টাও করেন। কিন্তু পেরে উঠেন না। কিছুদিন পর আবার শুরু করেন। এরপর আবার। এভাবেই চলে।
অনেক মুসলমান কোনোরকম সংকল্প ছাড়াই নামায পড়তে থাকেন। যখন সুযোগ হয় এবং যে ওয়াক্তে সুযোগ হয়, এভাবে। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য একটা শ্রেণি-বলা যায় একেবারেই নামায পড়েন না। বিশেষ কোনো উপলক্ষ্যে কিংবা হঠাৎ কোনো নামাযীর সঙ্গে থাকার কারণে কোনো ওয়াক্তে পড়েন। এরপর আবার আগের মতোই নামায ছাড়া হয়ে যান।
এই সবশ্রেণিই সাধারণত রমযান মাসে নামাযের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেন। সাথী সঙ্গী কিংবা পড়শীদের সাথে দলবেঁধে, কেউবা একাকীই মসজিদে যান এবং তারাবীতে অংশগ্রহণ করেন। পাঁচ ওয়াক্তেও যথাসাধ্য হাজির হওয়ার চেষ্টা করেন। রমযানের এই অভ্যাস রমযান পরবর্তী সময়েও কিছুদিন থাকে। কারো কারো এমনও হয় যে, রমযান থেকে নামায শুরু করেন, আর বাদ দেন না। এরপর ধীরে ধীরে একসময় পাক্কা নামাযী হয়ে যান।
সর্বোপরি রমযানকে উপলক্ষ্য করে পুরো মুসলিম সমাজ বিশেষভাবে উপকৃত হন। রমযানের অফুরন্ত খাইর ও বরকত লাভ করেন। রহমত ও মাগফিরাতের বিরাট দৌলত হাসিল করেন। রমযানকে কেন্দ্র করে তাকওয়ার পাঠ গ্রহণ করেন। দ্বীন ঈমান ও আত্মোন্নয়নের পথে অনেকটা অগ্রসর হন।
কিন্তু এবারের রমযান আমাদের সামনে ভিন্ন পরিবেশ তৈরি করেছে। মসজিদে হাজির হওয়ার বিষয়ে নতুন বিধি নিষেধ, বাড়তি সতর্কতা এবং রোগ সংক্রমণের ভয়াবহতা আমাদেরকে অন্যরকম একটি রমযানের মুখোমুখি করেছে। হাদীস শরীফে হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
عَجَبًالِأَمْرِالْمُؤْمِنِ،إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ،وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍإِلَّا لِلْمُؤْمِنِ،إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ،فَكَانَ خَيْرًا لَهُ،وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ،صَبَرَفَكَانَ خَيْرًا لَهُ
মুমিনের বিষয় বড়ই আশ্চর্যের। তার সকল অবস্থা-ই কল্যাণকর। আর এটা মুমিন ছাড়া অন্য কারো ক্ষেত্রে হয় না। ভালো কিছু জুটলে মুমিন শোকর আদায় করে। এটা তার জন্য কল্যাণের কারণ হয়। দুঃখ দুর্দশায় সে সবর করে। এটাও তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।-সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৯৯
অর্থাৎ মুমিনের সামনে যে অবস্থাই আসে, সে খাইর ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয় না। আল্লাহ তাআলা তার জন্য সকল অবস্থায়-ই কল্যাণ লাভের ব্যবস্থা রেখেছেন।
বর্তমানের এই করোনা পরিস্থিতিতেও প্রথমদিকে দেখা যেত সবাই ধৈর্যের সাথে, আল্লাহ তাআলার ফায়সালার প্রতি সমর্পিত চিত্তে, কাকুতি মিনতি করে এই রোগ থেকে পানাহ চাইত। রোগমুক্তির বিভিন্ন দুআ ও আমলে মনোযোগ দিত। প্রতি নামাযের পর এবং একান্ত সময়গুলোতে খুব দুআ মুনাজাত করত। ইসতিগফার করত। অতীতের কৃত গোনাহ মাফ চেয়ে তওবা করত। আযাব, মহামারী এবং সব ধরনের কঠিন রোগ-ব্যাধি থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করত। এরই মধ্যে রমযান মাস এলো। ঘরে ঘরে নামায ও তারাবীর পরিবেশ তৈরি হলো। দুআ মুনাজাত কান্নাকাটি চলতে থাকল। কিন্তু মসজিদমুখিতা মানুষের জন্য যে কত বড় নিয়ামত তা বুঝা গেল কিছুদিন পর। ঘরের নামাযে ধীরে ধীরে কিছুটা ক্লান্তি এলো। প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক ছোট বড় বিভিন্ন ব্যস্ততা যুক্ত হলো। নামাযে কিছুটা হেলা ও অবহেলার ছাপ পড়ল। এরপর একসময় মসজিদে যাওয়ার অনুমতি হলো। তখন অনেকেই আগের মতো নিয়মিত মসজিদে যাওয়া শুরু করল। কিন্তু অনেকেই নতুন করে যুক্ত হওয়া হেলা অবহেলা কাটিয়ে উঠতে পারল না। মসজিদে না যাওয়ার বৈধতা পেয়ে তারা আরও একটু পিছিয়ে পড়ল। সেই পিছিয়ে পড়া কারো কারো নামায ছেড়ে দেওয়া পর্যন্ত গড়াল। এসবই এখন চোখে দেখা বাস্তবতা!
ধীরে ধীরে রমযান চলে এসেছে একেবারে শেষ মুহূর্তে। কিন্তু মসজিদে নামাযীদের সেই গমনাগমন নেই। ঘরে ঘরে নামাযের সেই পরিবেশও অনেকটা ম্লান। নতুন করে নামায শুরু করা, দ্বীন ঈমান ও তাকওয়ার পথে অগ্রসর হওয়া সংখ্যায় খুব কম। ফলে রমযানের খাইর ও বরকত ….
হে আল্লাহ! নিতান্তই কমযোর ঈমানদার আমরা। আপনার এ পরীক্ষায় বুঝি আর টিকে থাকতে পারছি না। এ পরীক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে উন্নতি অর্জনের বদলে বুঝি পিছিয়ে পড়ার পরিবেশে যাচ্ছি হারিয়ে। হে আল্লাহ! আমাদের সকল কুসূর ও গোনাহ ক্ষমা করে দিন। আপনার রহমতের উসিলায় আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হোন। আপনার রহমত ও মাগফিরাত থেকে আমাদেরকে মাহরূম হতে দিয়েন না। রমযানের উসিলায় আমাদের থেকে এই মসিবত উঠিয়ে নিন। আমাদেরকে সুখ ও স্বচ্ছন্দময় ঈমানী যিন্দেগী দান করুন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আপনার আনুগত্যকে সহজ করে দিন। আপনার হুকুমমতো চলার তাওফীক দান করুন।
















