শিক্ষকদের প্রতি মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরীর অমূল্য নসীহত

মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী ।।

১. পরীক্ষায় তালিবে ইলমদেরকে প্রাপ্য নম্বর থেকে বেশি দেয়া প্রকাশ্য জুলুম এবং তাদেরকে ধ্বংস করার নামান্তর। এ ধরনের কাজقتلت أخيك এই হাদিসের ধমকের আওতায় পড়ে; প্রাপ্য নম্বর থেকে দুই এক নম্বর কম দেয়া ভালো যেন প্রতিযোগিতায় তার ভারসাম্য বজায় থাকে।

২. উস্তাদ যে কিতাবই পড়ান না কেন প্রথমে তা নিজে আত্মস্থ করে নিবেন, তা না হলে উস্তাদের পরীক্ষা গ্রহণের অধিকার নেই।

৩. অস্পষ্ট ও জটিল জায়গাগুলো মুরুব্বী এবং যোগ্য উস্তাদদের কাছ থেকে কৃত্রিমতা এবং লজ্জা না করে বুঝে নিবেন । ভালোভাবে না বুঝে কোনো অবস্থাতেই ছাএদেরকে পড়াবেন না।

৪. সকল আসাতেযায়ে কেরাম ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তালিবে ইলমদের ইসলাহ এবং সংশোধনের প্রতি সচেষ্ট হওয়া উচিৎ।

৫. তালিবে ইলমদের ইসলাহ ও সংশোধনের জন্য মুতাকাদ্দিমীন তথা পূর্ববর্তী আকাবিরদের তরিকা অবলম্বন করা উচিৎ, নতুন কোন পদ্ধতিতে ইসলাহ হতে কম দেখা যায়।

৬. তালিবে ইলমদের যেহেন থেকে অর্থ উপার্জনের ফিকির দূর করতে হবে।

৭. উস্তাদের প্রভাব ছাত্রের উপর পড়ে। তাই উস্তাদকে সর্বদা সতর্ক থাকা উচিৎ। আর তাই উস্তাদের কাছে দুটি মোবাইল থাকলে ছাত্রের কাছে একটি মোবাইল থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

৮. কখনো অভাব-অনটন দেখা দিলে সবর করবে।

৯. কুরবানী ওয়ালা যেহেন তথা যে কোন প্রকার ত্যাগ স্বীকার করার মানসিকতা রাখবে।

১০. উস্তাদগণ যদি নিজেদের স্তর নামিয়ে ফেলেন তাহলে তালিবে ইলমরাও তাদের স্তর নামিয়ে ফেলবে।

১১. উস্তাদ তিন প্রকার:

ক. যারা মুতালাআ ছাড়া দরসগাহে আসেন এবং হাশিয়া দেখে দেখে সবকপড়ান।

খ. সারারাত মুতাআলা করে সকালে তালিবে ইলমদের সামনে সব বমি করে দেন।

ভালোভাবে মুতালাআ করার পর নির্বাচিত বিষয়গুলোই তালিবে ইলমদের সামনে পেশ করেন। এমন উস্তাদেই সর্বশ্রেষ্ঠ উস্তাদ।

১২. মাদরাসায় পড়ে থাকা তালিবে ইলমদেরকে পড়ায় মনেযোগী করা উস্তাদের কর্তব্য।

১৩. উস্তাদগণ সাধারণত নাহু, সরফ এবং আদবে দুর্বল থাকেন, সরফে তো একেবারেই দুর্বল থাকেন, একারণে শুরুহাত হল করতে পারেন না।

১৪. উর্দূ শুরুহাত দেখে শত বছর পড়ালেও ইলম আসবে না।

১৫. নিচের জামাতের কিতাবগুলো ভালোভাবে মুতালাআ এবং ইয়াদ করে পড়ালে ধীরে ধীরে উন্নতি হতে থাকবে।

১৬. উস্তাদগণের উচিৎ পড়ার নিয়তে মুতালাআ করা, কেননা পড়ানোর নিয়তে শত বছর মুতালাআ করলেও ইলম আসবে না।

১৭. যে কোন ফনেরউচ্চস্তরের এবং প্রাথমিক সকল কিতাব পড়ে তারপর পড়ানো হলে তাকে পড়া বলে এবং এর মাধ্যমে ইলম আসবে।

আরো পড়ুন: চলে গেলেন দারুল উলুম দেওবন্দের শায়খুল হাদীস সাঈদ আহমদ পালনপুরী

১৮. তিনটি জিনিস আগে ছিলো এখন নেই।

এক. সামনের সবক মুতালাআ করা।

দুই. যে কোন তালিবে ইলমকে দিয়ে ইবারত পড়ানো।

তিন. তাকরার করানো।

১৯. উলামায়ে কেরামের উচিৎ উলুমে আকলিয়ায় মেহনত করা, কেননা এতে দুর্বলতার কারণেইসতে’দাদ অপরিপক্ক থেকে যায়।

২০. গণিতেও পারদর্শী হওয়া উচিৎ, তা না হলে সিরাজী ভালোভাবে পড়ানো সম্ভব নয়।

২১. সুরায়ে আলাকের দ্বিতীয় إقرأ উলামায়ে কেরামের জন্য।

২২. যা ছাত্র জীবনে পড়া হয়নি তা এখন ভালোভাবে পড়ে নিবে।

২৩. অন্যের লেখা মুতালাআ করবে।

২৪. দ্বিতীয় إقرأএর‘ইশারাতুন নস’ দারা বোঝা যায় যে, আপনাকেও লেখক হতে হবে যেন এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে, কারণ অন্যের লেখা থেকে আপনি যা কিছু অর্জন করেছেন তা আপনারও লেখা উচিৎ। যেন আগামীতেঅন্যরা তা দ্বারা উপকৃত হতে পারে।

২৫. উস্তাগণ দরসে যাকে ইচ্ছা তাকে দিয়ে ইবারত পড়াবেন এবং দুর্বল তালিবে ইলম যে জামাতের উপযুক্ত তাকে সে জামাতে নামিয়ে দিবেন।

২৬. কখনো কখনো এমন হয় যে উস্তাদ নিজেই কোন বিষয় বুঝতে পারছেন না এমতাবস্থায় فوق كل ذي علم عليمএর নীতি অনুসরণ করে বড়দের থেকে বুঝে নিবে।

আরো পড়ুন: মুফতি সাইদ আহমাদ পালনপুরি রাহ.-এর আলোকিত জীবনচরিত

২৭. উস্তাদগণের পড়ায় তিনটি বিষয় লক্ষণীয়:

এক. পুরো ফন দেখে তারপর পড়ানো।

দুই. কোনো ফনের সবকিছু পুরোপুরি বুঝে না আসলে তা রেখে সামনে অগ্রসর হয়ে যাবে।

তিন. তাজমীই আর্থাৎ পঠিত বিষয়গুলোকে লিখে রাখা, নোট করা, সারসংক্ষেপ লেখা, যদিও প্রতি বছর কিতাব

শেষ না হয়। এ কাজগুলো করার মাধ্যমেই সুলেখক এবং সফল মুসান্নিফ হওয়া সম্ভব। পঠিত বিষয়গুলোকে

সংকলন না করার উদাহরণ হলো ঔ বানরের মতো যে ভুট্টা খেতে ভুট্টা ছিড়ে ছিড়ে বগল দাবা করে সামনে

অগ্রসর হতে থাকে এবং ক্ষেত থেকে বের হওয়ার পর একটিও তার কাছে অবশিষ্ট থাকেনা, অতএব পঠিত

বিষয়গুলোকে সংকলন করা চাই। এতে করে লেখালেখির অভ্যাস গড়ে উঠবে।

২৮. যারা ছাত্রাবস্থায় তাকরার করায়নি তারা কীভাবে পড়াবে? এর সহজ পদ্ধতি এবং কায়দায়ে কুল্লিয়া হলো

বিস্তারিত বিষয়কে সংক্ষিপ্ত করা আর সংক্ষিপ্ত বিষয়কে বিস্তৃত করা। এতে সফলতা আসবে।

২৯. নিজের এবং তালিবে ইলমদের ফায়দার প্রতি লক্ষ রাখা উচিৎ।

৩০. আপনার ইসতে’দাদ যদি মুতাওয়াসসিত(মধ্যম)পর্যায়ের হয় তাহলে হাদিস, তাফসির, উসুলে হাদিস পড়াতে কোনো বাধা নেই।

৩১. নতুন কিতাবের মুতালাআ এক সপ্তাহ অগ্রিম করে রাখা উচিত। দৈনিকের মুতালাআ দৈনিক না করা চাই।

৩২. পড়ানোকে মাকসুদ বানাবেন না, নিজ পড়াকে মাকসুদ বানান। পড়ার সময় নিজেও ইয়াদ করুন। যদি বলেন যে তালিবে ইলমরা ইয়াদ করবে।আমাদের ইয়াদ করার প্রয়েজন কী? তাহলে আমি বলবো আপনিও তো একজন তালিবে ইলম।

আরো পড়ুন: মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরীর ইন্তিকাল: ইলমী অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা

৩৩. মানুষ যা জানে তা সীমিত আর যা জানে না তা সীমাহীন।

৩৪. যার মধ্যে ইলমের পিপাসা আছে, সে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির দিকে অগ্রসর হয়।

৩৫. ধন দৌলতের প্রতি লালায়িত ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হয়।

৩৬. হযরত সুফিয়ান সাওরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদিন সবকের অনুপস্থিতি চল্লিশ দিনের বরকত নষ্ট করে দেয়।

 

অনুবাদ: আবু আইমান, শিক্ষক, মাদরাসা আলী ইবনে আবী তালিব র.

পূর্ববর্তি সংবাদঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ : মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরে ৭ নম্বর সংকেত
পরবর্তি সংবাদসৌদিতে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ সুস্থের রেকর্ড