আবুল ফযল।।
আমরা ইন্টারনেটে দেখছি, কোন কোন ভাই প্রচার করছেন, “যারা ঈদের নামাজের জন্য মসজিদে যেতে পারবেন না তারা ঘরেই ঈদের নামাজ পড়বেন। যদিও হানাফী মাযহাবের মত হল ঘরে ঈদের নামাজ না পড়া। কিন্তু ঘরে পড়ার স্বপক্ষে শক্তিশালী দলিল রয়েছে। আর তা হল সহীহ বুখারীর হাদিস। সহীহ বুখারীতে আছে আনাস রাযিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ঘরে ঈদের জামাত করেছেন। অতএব যেহেতু হানাফী মাযহাবের বিপরীতে শক্তিশালী দলিল রয়েছে, তাই ঘরে ঈদের নামাজ পড়া যাবে।“ তাদের এ বক্তব্য সম্পূর্ণ অজ্ঞতা নির্ভর ও বিভ্রান্তিকর। সামনে এ সম্পর্কে কয়েকটি কথা উল্লেখ করা হলো:
১. খুবই আফসোসের বিষয় হল, সহীহ বুখারীর হাদিস কাকে বলে এর ধারণাটুকুও তাদের অনেকের নেই। তারা মনে করেন সহীহ বুখারীর দুই মলাটের ভেতর যা আছে সবই বুখারী শরীফের হাদিস এবং সবগুলোর সনদের দিক থেকে সহীহ। তাদের এ ধারণা খুবই হাস্যকর।
ইমাম বুখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি হাদিস বর্ণনা করার আগে অধ্যায়ের শিরোনামে নিজের বক্তব্য এবং কখনো কখনো কোন সাহাবী ও তাবেয়ির বক্তব্যও তুলে ধরেন। যেগুলোর সনদ তিনি উল্লেখ করেন না। সহীহ বোখারীর হাদিস বললে অধ্যায়ের শিরোনামে উল্লেখিত সাহাবা তাবেঈদের এই বক্তব্যগুলোকে কখনো বুঝায় না। এবং সেগুলো বুখারীর হাদিসের যে মাণ সেই স্তরেরও নয়। কখনো তা যয়ীফ ও দুর্বলও হয়ে থাকে।
২. এক্ষেত্রেও বাস্তবতা হলো, আনাস রা. এর এ বর্ণনাটি ইমাম বুখারী রহ. অধ্যায়ের শিরোনামে সনদ উল্লেখ ছাড়া বর্ণনা করেছেন। বুখারীর হাদিস হিসেবে নয়। অতএব এটিকে বুখারীর হাদীস হিসেবে প্রচার করা অজ্ঞতা অথবা জেনেশুনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। তাদের কারো কারো লেখায় দেখা গেছে, বুখারি হাদিসের নম্বরও উল্লেখ করেছে। ৯৮৭ নং হাদিস। অথচ ৯৮৭ নং হাদিসে তাদের প্রচারিত বক্তব্যের কোন কিছু নেই। বরং এই হাদিসের শিরোনামে ইমাম বুখারী রহ. আনাস রা. এর উক্ত বক্তব্যটি সনদ ছাড়া উল্লেখ করেছেন। যেহেতু এটি বুখারির হাদিস নয় তাই এর কোন নম্বর নেই। কিন্তু এই বন্ধুরা অন্য হাদিসের নম্বর উল্লেখ করে এটিকে চালিয়ে দিয়েছেন। যা ইলমী খিয়ানত ছাড়া আর কি হতে পারে?!
৩. আনাস রা. এর বক্তব্যটি বাস্তবে সনদের দিক থেকে যয়ীফ ও দুর্বল। এটি সনদসহ বর্ণিত হয়েছে মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ও আস সুনানুল কুবরা বাইহাকীতে। আর উভয়টির সনদই যয়ীফ। প্রসিদ্ধ সালাফী আলেম শায়খ আলবানী রহ.ও বলেছেন, আনাস রা. থেকে বর্ণিত এ বক্তব্যের সবগুলোর সনদই যয়ীফ ও দলীলের অযোগ্য। শায়খ আলবানী রহ. এর বক্তব্যটি সামনে তুলে ধরা হল-
روى عن أنس ” أنه إذا لم يشهدها (أى صلاة العيد) جمع أهله ومواليه ثم قام عبد الله بن أبى عتبة مولاه فصلى بهم ركعتين يكبر فيهما
* ضعيف
ﺭﻭاﻩ اﻟﺒﻴﻬﻘﻰ (3/305) ﺗﻌﻠﻴﻘﺎ ﻓﻘﺎﻝ: ” ﻭﻳﺬﻛﺮ ﻋﻦ ﺃﻧﺲ ﺑﻦ ﻣﺎﻟﻚ ﺃﻧﻪ ﻛﺎﻥ ﺇﺫا ﻛﺎﻥ ﺑﻤﻨﺰﻟﻪ ﺑﺎﻟﺰاﻭﻳﺔ , ﻓﻠﻢ ﻳﺸﻬﺪ اﻟﻌﻴﺪ ﺑﺎﻟﺒﺼﺮﺓ , ﺟﻤﻊ ﻣﻮاﻟﻴﻪ ﻭﻭﻟﺪﻩ , ﺛﻢ ﻳﺄﻣﺮ ﻣﻮﻻﻩ ﻋﺒﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﺃﺑﻰ ﻋﺘﺒﺔ ﻓﻴﺼﻠﻰ ﺑﻬﻢ ﻛﺻﻼﺓ ﺃﻫﻞ اﻟﻤﺼﺮ ﺭﻛﻌﺘﻴﻦ , ﻭﻳﻜﺒﺮ ﺑﻬﻢ ﻛﺘﻜﺒﻴﺮﻫﻢ “.
ﻭﺭﻭاﻩ ﻣﻮﺻﻮﻻ ﻣﻦ ﻃﺮﻳﻖ ﻧﻌﻴﻢ ﺑﻦ ﺣﻤﺎﺩ ﺣﺪﺛﻨﺎ ﻫﺸﻴﻢ ﻋﻦ ﻋﺒﻴﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﺃﺑﻰ ﺑﻜﺮ ﺑﻦ ﺃﻧﺲ ﺑﻦ ﻣﺎﻟﻚ ﺧﺎﺩﻡ ﺭﺳﻮﻝ اﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ اﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ: ” ﻛﺎﻥ ﺃﻧﺲ ﺇﺫا ﻓﺎﺗﺘﻪ ﺻﻼﺓ اﻟﻌﻴﺪ ﻣﻊ اﻹﻣﺎﻡ ﺟﻤﻊ ﺃﻫﻠﻪ ﻓﺼﻠﻰ ﺑﻬﻢ ﻣﺜﻞ ﺻﻼﺓ اﻹﻣﺎﻡ ﻓﻰ اﻟﻌﻴﺪ “.
ﻗﻠﺖ: ﻭﻫﺬا ﺳﻨﺪ ﺿﻌﻴﻒ ﻓﺈﻥ ﻧﻌﻴﻢ ﺑﻦ ﺣﻤﺎﺩ ﺿﻌﻴﻒ ﻟﻜﺜﺮﺓ ﺧﻄﺌﻪ.
ﻭﺭﻭاﻩ اﺑﻦ ﺃﺑﻰ ﺷﻴﺒﺔ (2/9/1) ﻣﻦ ﻃﺮﻳﻖ ﻳﻮﻧﺲ ﻗﺎﻝ: ﺣﺪﺛﻨﻰ ﺑﻌﺾ ﺁﻝ ﺃﻧﺲ: ” ﺃﻥ ﺃﻧﺴﺎ ﻛﺎﻥ ﺭﺑﻤﺎ ﺟﻤﻊ ﺃﻫﻠﻪ ﻭﺣﺸﻤﻪ ﻳﻮﻡ اﻟﻌﻴﺪ ﻓﺼﻠﻰ ﺑﻬﻢ ﻋﺒﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﺃﺑﻰ ﻋﺘﺒﺔ ﺭﻛﻌﺘﻴﻦ “. ﻭﺭﺟﺎﻟﻪ ﺛﻘﺎﺕ ﻏﻴﺮ اﻟﺒﻌﺾ اﻟﻤﺬﻛﻮﺭ ﻓﻠﻢ ﺃﻋﺮﻓﻪ , ﻭﻳﺤﺘﻤﻞ ﺃﻥ ﻳﻜﻮﻥ ﻫﻮ ﻋﺒﻴﺪ اﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﺃﺑﻰ ﺑﻜﺮ ﺑﻦ ﻣﺎﻟﻚ ﺑﻦ ﺃﻧﺲ , ﻛﻤﺎ ﻓﻰ ﺭﻭاﻳﺔ ﻧﻌﻴﻢ ﺑﻦ ﺣﻤﺎﺩ ﻭﻟﻜﻨﻪ ﻻ ﻳﺤﺘﺞ ﺑﻪ ﻟﻤﺎ ﻋﺮﻓﺖ.
(দেখুন, ইরওয়াউল গালীল, শায়খ আলবানী ৩/১২০-১২১)
এক্ষেত্রে বরং এর বিপরীতে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর বর্ণনাটি সহীহ ও বেশি শক্তিশালী। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,
ﻣﻦ ﻓﺎﺗﻪ اﻟﻌﻴﺪ ﻣﻊ اﻹﻣﺎﻡ ﻓﻠﻴﺼﻞ ﺃﺭﺑﻌﺎ
অর্থাৎ যার ইমামের সাথে ঈদের জামাত ছুটে গেছে সে চাইলে চার রাকাত (নফল) পড়ে নিবে।
ইমাম ইবনে হাজার রহ. এর সনদ সহীহ বলেছেন। তিনি বলেন,
ﻗﺎﻝ ﺑﻦ ﻣﺴﻌﻮﺩ ﻣﻦ ﻓﺎﺗﻪ اﻟﻌﻴﺪ ﻣﻊ اﻹﻣﺎﻡ ﻓﻠﻴﺼﻞ ﺃﺭﺑﻌﺎ ﺃﺧﺮﺟﻪ ﺳﻌﻴﺪ ﺑﻦ ﻣﻨﺼﻮﺭ ﺑﺈﺳﻨﺎﺩ ﺻﺤﻴﺢ
দেখুন, ফাতহুল বারী ২/৪৭৫
হানাফী মাযহাবেও মাসআলাটি এভাবেই বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আশশাইবানী রহ. বলেন,
ﻗﻠﺖ: ﺃﺭﺃﻳﺖ اﻟﺮﺟﻞ ﻳﻔﻮﺗﻪ اﻟﻌﻴﺪ ﻫﻞ ﻋﻠﻴﻪ ﺃﻥ ﻳﺼﻠﻲ ﺷﻴﺌﺎ؟ ﻗﺎﻝ: ﺇﻥ ﺷﺎء ﻓﻌﻞ، ﻭﺇﻥ ﺷﺎء ﻟﻢ ﻳﻔﻌﻞ. ﻗﻠﺖ: ﻓﻜﻢ ﻳﺼﻠﻲ ﺇﻥ ﺃﺭاﺩ ﺃﻥ ﻳﺼﻠﻲ؟ ﻗﺎﻝ : ﺇﻥ ﺷﺎء ﺃﺭﺑﻊ ﺭﻛﻌﺎﺕ، وإﻥ ﺷﺎء ﺭﻛﻌﺘﻴﻦ.
(কিতাবুল আছল ১/৩২০)
৩. আনাস রা. এর আমল দ্বারা এক্ষেত্রে দলিল প্রদান করাটিও সঠিক নয়। কেননা আনাস রা. এর বর্ণনাটিতে আছে, ইমামের সাথে ঈদগাহের জামাত ছুটে গেলে তিনি এমনটি করতেন।
ﻛﺎﻥ ﺃﻧﺲ ﺇﺫا ﻓﺎﺗﺘﻪ ﺻﻼﺓ اﻟﻌﻴﺪ ﻣﻊ اﻹﻣﺎﻡ ﺟﻤﻊ ﺃﻫﻠﻪ ﻓﺼﻠﻰ ﺑﻬﻢ ﻣﺜﻞ ﺻﻼﺓ اﻹﻣﺎﻡ ﻓﻲ اﻟﻌﻴﺪ
অতএব মসজিদের যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্বেও মসজিদের জামাতে অংশগ্রহণ না করে বাসা বাড়িতে ঈদের জামাত করার ক্ষেত্রে এটি দলিলই হতে পারে না।
৪. বাসা বাড়িতে ঈদের জামাত করার স্বপক্ষে আনাস রা. এর একটি বক্তব্য ছাড়া আর কোন দলিল নেই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যেমন কোন হাদিস নেই, অন্যান্য সাহাবী থেকেও এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ নেই। বরং ঈদের জামাত ইসলামের একটি শিআর। যা সর্বাধিক বড় জামাতের সাথে ঈদগাহে বা খোলা মাঠে আদায় করা নিয়ম। বিনা প্রয়োজনে মসজিদে আদায় করাও অনুত্তম।
অতএব আমাদের দেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে মসজিদে জামাত হচ্ছে এবং এখানে হানাফী মাযহাবই প্রচলিত তাই সেখানে বাসায় বাসায় ঈদের নামাজ পড়া ঠিক হবে না। যদিও অন্য মাযহাবে ঘরে ঈদের নামাজ পড়ার অনুমতি আছে। যা সে মাযহাবের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য ও সঠিক।
















