রমযানের শিক্ষা ধরে রাখি

মুহাম্মদুল্লাহ মাসুম।।

মুসলমানের ঈদ মানে নিছক উৎসব নয়। মানে অন্য জাতিদের উৎসব যেরকম উৎসব, আমাদের ঈদ ঠিক সেরকম কোনো উৎসব নয়। যদিও আমাদের ঈদও একটা পর্ব, কারণ ঈদ শব্দের মধ্যেই পর্বের বিষয়টা রয়েছে। কিন্তু তাদের পর্বগুলো আর আমাদের ঈদের মাঝে রয়েছে আসমান জমিনের তফাত। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيدًا، وَهَذَا عِيدُنَا.

প্রত্যেক জাতিরই একটা পর্ব-উৎসব থাকে, আমাদের হল এটা। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৫২

তাছাড়া অন্য হাদীসেও বলেছেন-

إن الله أبدلكم خيرًا منهما يوم الأضحى ويوم الفطر -জাহেলি যত উৎসব এবং পর্ব রয়েছে সেগুলোর পরিবর্তে, বরং সেগুলো থেকে তোমাদেরকে পাক-সাফ করে আল্লাহ তোমাদেরকে পবিত্র ঈদ দান করেছেন। ওসবের পরিবর্তে এবং সেগুলোর চে উত্তম আল্লাহ তা‘আলা উম্মতে মুসলিমাকে দান করেছেন এই দুই ঈদ। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১৩৪

আমাদের ঈদ এরকম উৎসব নয় যে, সব ভুলে যাব। আমাদের ঈদ হল ক্ষমা পাওয়ার আনন্দ এবং ধারাবাহিক শোকর আদায়ের সূচনা। আল্লাহ তা‘আলা রমযানের নেয়ামত দান করার পর এ শোকরের কথা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে হয় সে শোকরের সূচনা। সমাপ্তি হবে আগামী রমযানে গিয়ে।

শোকর আদায় করা হয় প্রথমত তাকবীরে তাহরীমার মাধ্যমে। কারণ তাকবীরের মধ্যে ‘হামদ’ তথা আল্লাহ প্রশংসার বর্ণনা রয়েছে। যা পাঠ করা হয় ঈদের জামাতে যাওয়া-আসার পথে, খোতবার মধ্যে এবং আরো অনেকভাবে।

দুই. ঈদের নামায আদায়ের মাধ্যমে শোকর আদায় করা।

তিন. রোযার স্মৃতি স্মরণ রাখা এবং রমযানকে ধরে রাখার মাধ্যমে আল্লাহর শোকর আদায় করা। রমযানের বরকতে অনেকেই নিজের অনেক খারাপ অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছি। অনেক গোনাহ ছেড়ে দিয়েছি। ঠিকমত নামাযের অভ্যাস ছিল না, এখন নামাযের অভ্যাস করে ফেলেছি। আগে জামাত সময়মতো জামাতে শরীক হওয়ার সুযোগ হত না, রমযানের বরকতে সেটা শুরু করে দিয়েছি। আগে গীবতের অভ্যাস ছিল, রমযানের বরকতে গীবত ছেড়ে দিয়েছি। রমযান মাসে হালাল খাওয়ার চেষ্টা করেছি। এভাবে একেক জন তার একেক দুর্বলতা এবং গোনাহর কথা স্মরণ করে করে শোকর আদায় করা। আর নতুন করে হিম্মত এবং সাহস করা যে আমার এই সমস্যা এবং দুবর্লতাগুলোর রমযানে কিছুটা চিকিৎসা হয়েছে। বা চিকিৎসার চেষ্টা হয়েছে। কিছুটা হিম্মত এবং সাহস করেছি। ধীরে ধীরে বাকিটা সম্পন্ন করব। আগে একটা আমল হত না, সে আমল শুরু করেছি। আগে ওমুক গোনাহ করতাম, রমযানের উসিলায় ছেড়ে দিয়েছি। মোটকথা গোনাহ বর্জন এবং নেক কাজে অগ্রসর হওয়ার এই ফিকিরটাকে ঈদের দিন বিদায় না দিয়ে ধরে রাখাটা রমযানের গুরুত্বপূর্ণ শোকর।

হযরত আবু হুরায়রা রাদি. থেকে সহীহ ইবনে খুযায়মাতে রেওয়াত আছে, রমযান মাস মুমিনের জন্য গনিমত। এখান থেকে সে তার পুরো বছরের জন্য ঈমানি শক্তি সঞ্চয় করবে।

أَنَّ الْمُؤْمِنَ يُعِدُّ فِيهِ الْقُوَّةَ مِنَ النَّفَقَةِ لِلْعِبَادَةِ، وَيَعُدُّ فِيهِ الْمُنَافِقُ اتِّبَاعَ غَفَلَاتِ الْمُؤْمِنِينَ وَاتِّبَاعَ عَوْرَاتِهِمْ، فَغُنْمٌ يَغْنَمُهُ الْمُؤْمِنُ.

অর্থাৎ বাকি এগারো মাসের জন্য ঈমানি শক্তি সঞ্চয় করে মুমিন রমযান মাস থেকে। পক্ষান্তরে মুনাফিকের হালাত বিপরীত। তার রমযান হল নিজের যত খাহেশাত এবং খেয়াল-খুশি রয়েছে সেগুলো পুরো করার রাস্তা বের করা। মুসলমানদের ক্ষতি করার রাস্তা বের করা এবং সে ধান্ধায় লেগে থাকা। অর্থাৎ, রমযান যে বিশেষ নেয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে, এখান থেকে যে আমার ঈমানি খোরাক গ্রহণ করতে হবে, এ অনুভূতি মুনাফিকের নেই। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ, হাদীস ১৮৮৪)

হাঁ, মুমিনের রয়েছে এই অনুভূতি। এখান থেকে সে পুরো বছরের ঈমানি শক্তি সঞ্চয় করে। নিজেকে সে পরিশুদ্ধ করার চিন্তা এবং পরিকল্পনা করে। কারণ এটা তার রমযানের কদরদানির শামিল।

এর জন্য কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা থেকে যে সারকথা উমর রা এর নিজের ভাষায় এসেছে

حاسبوا أنفسكم قبل أن تحاسبوا، وزنوها قبل أن توزنوا

হাশরের ময়দানে হিসাবের আগে নিজের হিসাব নিজে নাও! ওই হিসাব তো সামনে আসবেই, এর আগে নিজের হিসাব নিজে নাও! وزنوها قبل أن توزنوا মিজানে তোমার আমল ওজন দেওয়া হবে। তোমাকে ওজন দেওয়া হবে। এর আগে তুমি নিজেই নিজেকে এখনই ওজন দিয়ে নাও! সে মুহাসাবাটা হলে তখনই মনে থাকে যে, আমি রমযানের হালাতটা ঠিক রাখছি।

হিসাব নেওয়ার পদ্ধতিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন। হিসাব সহজ হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করার সাথে সাথে দুনিয়ার যিন্দেগিতে নিজের কর্মের হিসাবগুলো কড়াভাবে নেওয়া। যা যা করছি কেবল সেদিকে না তাকিয়ে যা করণীয়, কিন্তু করা হচ্ছে না সেগুলো করার চিন্তা-ভাবনা এবং চেষ্টা করা। যেগুলো করছি, সেগুলো যথাযথ হচ্ছে কিনা, তাও চিন্তা করা। যদি না হয়ে থাকে তাহলে ليبلوكم أيكم أحسنُ عملا এর ভিত্তিতে আমলকে সুন্দর থেকে সুন্দর করার চেষ্টা ও সাধনা চালিয়ে যাওয়া।

কিছু গোনাহ আমার দ্বারা হচ্ছে না, এতে তুষ্ট না হয়ে বরং তার জন্য শোকর আদায় করা। অনুরূপভাবে যেসব গোনাহ বা হারাম কাজ হয়ে যাচ্ছে সেগুলো বর্জন করার চিন্তা-ভাবনা এবং মেহনত করা।

‘ওমুকের চে আমি ভালো আছি’ না ভেবে যত কিছু আমার জন্য করণীয় তা করা, যত কিছু বর্জনীয় তা বর্জন করা। পক্ষান্তরে জাগতিক এবং বৈষয়িক বিষয়ে নিজের চে’ ছোট বা ক্ষুদ্র তার দিকে তাকিয়ে আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় করা।

হাদীসে শিখানো হয়েছে, যদি এমন হয় যে, বৈষয়িক দিক থেকে তোমার হালাত অন্য আরো অনেকের চে’ ভালো তাহলে আল্লাহর শোকর আদায় কর। দুুনিয়ার জন্য হারামের পিছনে পড়ো না। আল্লাহ তোমাকে অনেকের চে’ ভালো রেখেছেন।

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই কাজ সবাইয়ে করতে পারে। কারণ দুনিয়াতে সে তার চেয়ে দুর্বল অবস্থাতে কাউকে না কাউকে পাবেই। দ্বীন, ঈমান, আমল এগুলো ঠিক করতে হবে নিজের চে’ উপরের যারা তাদের দিকে তাকিয়ে। আহারে, ওমুক পাঁচো ওয়াক্তে মসজিদে যায়, আমি তো দু ওয়াক্তে যাই, তিন ওয়াক্তে যাই! আমারও তো তার মতো যাওয়া উচিত! এমন নয় যে, সে মসজিদে মোটেও যায় না, কিন্তু আমি তো দুই ওয়াক্তে যাই!

এই হল নিজের হিসাব নেওয়ার পদ্ধতি।

হিসাব করার পদ্ধতি এই নয় যে, কেবল শোয়ার সময় ‘তিন তাসবীহ’ ছয় তাসবীহ’ এর হিসাব করা। বরং ওযিফা মানে হল, একজন মুমিনের ঈমানি যিন্দেগির রুটিন! তার যিন্দেগির শুরু থেকে মওত পর্যন্ত পুরো সময়টা কিভাবে পরিচালিত হবে। ধরুন সে বাচ্চা, বুঝ হওয়ার পর থেকে, ডান-বাম বোঝে। সুখ-দুঃখ, কষ্ট- আনন্দ বোঝে, নানা-নানি, দাদা-দাদি সবাইকে চেনে। বুঝ হওয়ার পর থেকে মওত পর্যন্ত মানুষের বিভিন্ন হালাত আসে। যিন্দেগির বিভিন্ন মোড় এবং বিভিন্ন অবস্থা আসে। প্রত্যেক অবস্থাতেই তার জন্য একটা রুটিন প্রযোজ্য। পুরো কুরআন-সুন্নাহর মধ্যে আপনার পুরো যিন্দেগির রুটিন দেওয়া আছে। পুরো যিন্দেগির সময়সূচি এবং কর্মসূচি দেওয়া আছে। এ কর্মসূচি এবং সময়সূচিকে বলে ওযিফা। আমি প্রতিদিন শোয়ার আগে যখন হিসাব করব যে, আমার আজকের ওযিফা পুরো হল কিনা? সেখানে আমি যদি শুধু হিসাব করি যে, আমি আজকে বারো তসবি পড়লাম কিনা, আজকে ছয় তসবি পড়লাম কিনা তাহলে এটা মুহাসাবা নয়। কারণ শুধু এটা দেখলে হবে না। দেখতে হবে পুরো কর্মসূচি। আজকে মিথ্যে কথা বলিনি তো? আজকে কারো গীবত করিনি তো? কাউকে মাফে কম দেইনি তো? আজকে ডিওটিতে কোনো ফাঁকি দেইনি তো? আজকে কোনো নামায আমার বাকি থাকেনি তো? আজকে কারো হক নষ্ট করিনি তো?

এই হল ওযিফা। হাঁ, সেটাও ওযিফা যে, আজকে ছয় তসবি পড়া হয়েছে কিনা? আজকে তেলাওয়াত হয়েছে কিনা? সেটাও ওযিফা। সেটারও হিসাব নিতে হবে। কিন্তু অন্যগুলো না করে কেবল এর হিসাব করা, এটা হল নিজেকে নিজে ফাঁকি দেওয়া।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওটাও শিখিয়ে দিয়েছেন যে কিভাবে হিসাব নিতে হবে। ছোট্ট ছোট্ট হাদীসের মধ্যে বিভিন্ন আমলের কথা বলেছেন যেন হিসাবের প্রক্রিয়া সহজ হয়। সূত্র ধরিয়ে দিয়েছেন। কারণ হিসাব নেওয়ার সূত্রটা সহজ হলে তখন মানুষ হিম্মত এবং সাহস পায়। যেমন একটা সূত্র

” أربع إذا كن فيك فلا عليك ما فاتك من الدنيا: حفظ أمانة، وصدق حديث، وحسن خليقة، وعفة في طعمة ”

চারটি জিনিস যদি তোমার মধ্যে এসে যায় তাহলে দুনিয়ার কোনো জিনিস হাতছাড়া হয়ে গেলেও তোমার কোনো আফসোস নেই। ১. আমানতের রক্ষণাবেক্ষণ ২. সত্যবাদিতা ৩. সুন্দর চরিত্র ৪. হালাল রুজি।

এভাবে আমার উপর আল্লাহর হক কী কী বাকি আছে তার কাযা-কাফফরা করা, বান্দার হক যেগুলো আদায় করিনি সেগুলোর কাযা-কাফফারা করা। আর এসব রমযানের নেয়ামতের শোকরের অংশ। রমযানে আল্লাহ তাআ‘লা বড় বড় শয়তানগুলোকে বেঁধে রেখেছেন। এজন্যই তো আমার মধ্যে নেক কাজের জযবা এসেছে বেশি। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার সাহস পেয়েছি, হিম্মত পেয়েছি। আল্লাহ রমযানের জন্য ভিন্ন একটা আয়োজন করেছেন। এটা সে আয়োজনের ফায়দা। এই ফায়দা যে ভোগ করলাম এক মাস যাবত, তার শোকর আদায় কর। আর শোকর হল, এক মাসে কিছু অভ্যাস হয়েছে, এখন যদি আমি সেটাকে অব্যাহত রাখি, তাহলে শোকর আদায় হল।

(মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক দামাত বারাকতুহুমের বিভিন্ন বয়ান অবলম্বনে রচিত)

পূর্ববর্তি সংবাদমাওলানা সাদ অনুসারীদের কাকরাইল ছাড়ার নির্দেশ দিল পুলিশ
পরবর্তি সংবাদআম্পান না যেতেই কালবৈশাখীর হানা, জয়পুরহাটে নিহত ৪