“এক সারিতে দাঁড় করিয়ে পাখির মত গুলি চালায় সবার ওপর”: লিবিয়ায় বাংলাদেশী হত্যাযজ্ঞের লোমহর্ষক বর্ণনা

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: মানবপাচারকারীদের হাত থেকে দফায় দফায় অপহরণকারীদের হাতে পড়ে সঙ্গীদের নির্মম মৃত্যুর সাক্ষী মাদারীপুরের সাইদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেছেন পাখির মত গুলি করে তার সঙ্গীদের হত্যা করা হয়েছে।

সাইদুল জানান, লিবিয়া পৌঁছানোর পর বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের হাত বদল করে পাচারকারীরা। এরপর তাঁদের জিম্মি করে স্থানীয় অপহরণকারীরা। ওই অপহরণকারীরা টাকার জন্য লোকজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। এমনি এক ঘটনায় বাংলাদেশ ও সুদানের লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে অপহরণকারীদের হোতাদের। এরই জেরে বাংলাদেশ ও সুদানের ৩০ নাগরিক প্রাণ হারান অপহরণকারীদের গুলিতে।

লিবিয়ার মিজদা শহরে সেখানকার অপহরণকারীরা গত বৃহস্পতিবার এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ২৬ বাংলাদেশি ও ৪ সুদানিকে হত্যা করে। আহত করে অন্য ১১ বাংলাদেশিকে। ঘটনাস্থলে থাকা ৩৮ বাংলাদেশির মধ্যে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান সাইদুল। যদিও এক সারিতে দাঁড় করিয়ে অপহরণকারীরা পৈশাচিক উল্লাসে গুলি চালায় সবার ওপর। বেঁচে যাওয়ার পর গত দুই দিন লিবিয়ার স্থানীয় এক নাগরিকের জিম্মায় ছিলেন সাইদুল।

সাইদুল আরও জানালেন, পাশের গ্রামের আরেক তরুণসহ তাদের দুজনকে দালালেরা ডিসেম্বরের মাঝামাঝি কলকাতায় পাঠায়। চার দিন কলকাতায় রাখার পর তাদের নেওয়া হয় মুম্বাইয়ে। মুম্বাই বিমানবন্দরে সাত থেকে আট ঘণ্টার যাত্রাবিরতি শেষে তাদের কুয়েতে নেওয়া হয়। কুয়েতের বিমানবন্দরে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রাবিরতির পর তাদের পরের গন্তব্য ছিল মিসরে। মিসরে ১৮ ঘণ্টা অবস্থানের পর তারা দুজন পা রাখেন লিবিয়ার বেনগাজি শহরে। ত্রিপোলি থেকে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের ওই শহর দিয়েই মানবপাচারকারীরা বিভিন্ন দেশের লোকজনকে লিবিয়ায় আনে। এরপর ভূমধ্যসাগর হয়ে তাদের পাঠানোর চেষ্টা চলে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

সাইদুলের বর্ণনা অনুযায়ী ডিসেম্বরেই তার লিবিয়া পৌঁছানোর কথা। যদিও মাদারীপুরের ওই তরুণ বলছেন, ‘করোনা শুরুর অনেক আগে লিবিয়া এসেছি।’

সাইদুল জানান, বেনগাজিতে পৌঁছানোর পর মানবপাচারকারীদের টাকাপয়সা পরিশোধের পর অন্য আরেক শিবিরে পাঠানো হয়। অর্থাৎ মানবপাচারকারীদের প্রথম দলটি টাকাপয়সা বুঝে পাওয়ার পর আরেক দল মানবপাচারকারীর হাতে তাদের তুলে দেয়। দলটি বাংলাদেশের লোকজনকে নিয়ে যাবে ত্রিপোলিতে।
সাইদুল বলেন, ‘একদল অপহরণকারী আমাদের জিম্মি করে পরে অন্য একদল মাফিয়ার হাতে বিক্রি করে দেয়। ওই মাফিয়ারা আমাদের বেধড়ক পেটাতে থাকে। ১২ হাজার ডলার চায়, যার মানে হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। আমাদের সঙ্গে থাকা লোকজনের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। দরিদ্র বললেও কম বলা হবে। কাজেই এত টাকা দেওয়ার সাধ্য কোথায়!’
নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাইদুল জানান, হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে তাদের ছাদের সঙ্গে উল্টো ঝুলিয়ে রেখে বেধড়ক পেটায় অপহরণকারীরা। যারা টাকাপয়সা দিতে পারছেন না, তাদের মোটা প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে অনবরত পেটানো হয়।

দালালকে কত টাকা দিয়ে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন জানতে চাইলে সাইদুল বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার সময় সাড়ে তিন লাখ আর বেনগাজি পৌঁছানোর পর ত্রিপোলি যেতে আরও এক লাখ টাকা দিই। আমি কিন্তু ইতালি যেতে চাইনি। আমার ইচ্ছা ছিল, কয়েক মাস লিবিয়ায় থাকব। সুযোগ-সুবিধা বুঝে তারপর যাত্রা করব ইতালি। সেটা তো আর হলো না!’
সাইদুলের কাছ থেকে জানা গেল, তার মামাতো ভাই সজীব দাড়িয়া তাকে লিবিয়া যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। আর লিবিয়াতে কাকে টাকা দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বেনগাজি পৌঁছানোর পর টেলিফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে লিবিয়ার মানবপাচারকারীরা বাংলাদেশের দালালদের মাধ্যমে টাকার লেনদেন করে।

বৃহস্পতিবারের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘২৭ রোজার পর অপহরণকারীরা শিবিরে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। টাকার জন্য অনবরত পেটাতে থাকে। এত টাকা তো সবার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এমনও ঘটনা ঘটেছে, টাকা না পেলে তারা পিটিয়ে লোকজনকে মেরে ফেলে। আমাদের ওপর নির্যাতনটা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছিল। অনেকের শরীরের বিভিন্ন অংশ পিটিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। অপহরণকারীদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে সবাই মিলে ঠিক করলাম, এভাবে তো আর অত্যাচার সহ্য করা যায় না, সুযোগ পেলে অপহরণকারীদের ওপর হামলা চালাতে হবে। এই সিদ্ধান্তের পর সুদানের লোকজনই অপহরণকারীদের হোতাকে বুধবার পিটিয়ে মেরে ফেলে। এটা জানার পর মাফিয়ারা শিবির থেকে বাংলাদেশের ৩৮ জন ও সুদানের ৪ জনকে বের করে এনে পাখির মতো গুলি করে। আর আমি যে এখনো অক্ষত বেঁচে আছি, এটাই বিশ্বাস করতে পারছি না।’

 

পূর্ববর্তি সংবাদবাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ
পরবর্তি সংবাদমাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি না মানলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা