স্মৃতির চিরকুট: শেখ দরবার আলম-এর কথা মনে পড়ছে, খুব…

এই ছবিতে মাঝের জন মরহুম শেখ দরবার আলম

শরীফ মুহাম্মদ।।

প্রখ্যাত নজরুল গবেষক, কলামিস্ট সাংবাদিক শেখ দরবার আলম গত ৩০ মে শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকায় ইন্তেকাল করেছেন। খবরটি প্রথম জানতে পেরেছি সাংবাদিক নেতা মুহাম্মদ আবদুল্লাহ ভাইয়ের পোস্ট থেকে। তাৎক্ষণিকভাবেই মনটা বড় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল।

এর পরের দিন আবদুল্লাহ ভাইয়ের পোস্ট থেকে তার তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরও নানারকম অব্যবস্থাপনা ও কষ্টের কথা জানা গেল। জরুরি চিকিৎসা নিয়ে বেওয়ারিশ একটি পরিস্থিতি চলছে গোটা দেশজুড়ে। শুধু করোনা ভাইরাস নয়, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন এমন যে কোনো চিকিৎসা প্রত্যাশী মানুষ এখন প্রায় দিশেহারা। মনের ভেতরে অশ্রুপাত ছাড়া যেন কিছুই করার নেই।

শেখ দরবার আলম। নব্বইয়ের দশকের গোড়া থেকে দৈনিক ইনকিলাবে ‘স্বদেশ-বিদেশ’ এবং ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ নামে দুটি ফিচার পাতা দেখতেন। এ দুটি পাতায় সাম্প্রতিক পৃথিবী এবং উপমহাদেশ কেন্দ্রিক ইতিহাস ও চিন্তার নানামাত্রিক উপস্থাপন থাকতো। নাম দেখে মনে হলেও বাস্তবে ‘শিল্প-সংস্কৃতি’ পাতাটি কোনো বিনোদন পাতা ছিল না। এ পাতাটিতে শিল্প-সংস্কৃতির গোড়ার কথা এবং এ জগতে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির নানারকম প্রবণতার মুখোশ খুলে দেওয়া হতো তখন। প্রয়াত টিভি অভিনেতা উবায়দুল হক সরকার এবং আরিফুল হকসহ অনেক বিখ্যাত লেখক নিয়মিত লিখতেন এ পাতায়। শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে তার এই পাতাটি ছিল পর্যালোচনামূলক একটি আয়োজন।

বহুদিন পর্যন্ত ইনকিলাব ভবনের চার তলায় ছিল ফিচার ও সম্পাদনা বিভাগের অবস্থান। এ তলায় বসতেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল গফুর, সাংবাদিক- কথা সাহিত্যিক ইউসুফ শরীফ, মাওলানা রুহুল আমিন খান, মুনশি আব্দুল মান্নান, মরহুম হাসনাইন ইমতিয়াজ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী প্রমুখ। এ তলাটিতেই আমার যাওয়া-আসা হতো বেশি। অবধারিতভাবে প্রায় দিনই টেবিলে বসে নীরবে কাজ করতে থাকা, চাপাকন্ঠ মানুষ শেখ দরবার আলম সাহেবের সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো। কোনো কোনো দিন লম্বা সময় তার টেবিলে বসে থাকতাম। তার গল্প ও অভিব্যক্তি শুনতাম এবং কখনো কখনো মতবিনিময়েও অংশগ্রহণ করতাম।

বয়স কত হবে তার? ষাট পেরিয়ে ছিলেন সম্ভবত। ‘অজানা নজরুল’ তার বিখ্যাত বই। এছাড়াও কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে সব সময় তিনি কাজ করতেন। জন্মগতভাবে সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ছিলেন। আশির দশকের শেষ দিক থেকে ঢাকায় তার বিচরণ ও অবস্থান। ৪৭’ পরবর্তী পরিস্থিতি, বাঙালি মুসলিম সমাজ, কলকাতার বাম রাজনীতির অন্তর্গত হিন্দু তোষণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ডামাডোল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নরম ভাষায় অনেক ধারালো লেখা তিনি লিখতেন। টেবিল ও বৈঠকি গল্পেও অনেক কথা বলতেন। ছোট্ট ছোট্ট শব্দে ব্যক্ত করা তার বহু অভিমানী পর্যবেক্ষণের আমি নিঃশব্দ শ্রোতা ছিলাম।

আল্লাহর পথের ঠিকানা। নব্বই দশকের শেষ দিকে আমার অনূদিত একটি উর্দু গ্রন্থ। আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.-এর বক্তৃতা সংকলন তা’মীরে ইনসানিয়াত-এর অনুবাদ। এ বইটি প্রকাশ হওয়ার পর তার হাতে দিয়েছিলাম পড়ার জন্য। কয়েকদিন পর দেখি, অন্তর মেশানো ভাষায় গল্পের মতো করে লেখা একটি রিভিউ ছাপিয়ে দিয়েছেন। এতটা তখন আমি আশা করি নি। তরুণ এক উঠতি লেখক আমি। তার ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যাই।

গত একটি দশক আমাদের যাচ্ছে, শিল্প-সাহিত্যে নব্বইয়ের ভালো মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগহীনতার সময়কাল। এর পেছনে নানা কারণ, নানা উপলক্ষ। শেখ দরবার আলম সাহেবের সঙ্গে প্রায় ১০ বছর আগে দৈনিক আমার দেশ-এর রিসেপশনে দেখা হয়েছিল। এক কোনায় চুপচাপ বসে আছেন। কারো সঙ্গে হয়তো দেখা করতে এসেছিলেন। কিছু কথাবার্তা ও সৌজন্য বিনিময়ের পর আমি আমার কাজে চলে গিয়েছিলাম।

সেই শেষ দেখা। এই দুনিয়ায় আর কোনোদিন তার সঙ্গে দেখা হবে না। শনিবার মরহুম শেখ দরবার আলম সাহেবকে নিয়ে সাংবাদিক আব্দুল্লাহ ভাইয়ের পোস্টটি দেখার পর অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। এরপর তার জন্য দোয়া করেছি।

ঐতিহ্য সচেতন, সজাগ মনস্ক এই বাঙালি মুসলিম লেখক- সাংবাদিকের জন্য সবার কাছে দোয়া চাই। মানুষ হিসেবে কোনো ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করুন এবং তাকে জান্নাত দান করুন।