মানবতা মহীয়ান

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব।।

আমরা সমাজ জীবনে অভ্যস্ত। একা থাকা, একা কাজ করা, একা সময় কাটানো আমাদের জন্য কঠিন না হলেও সহজ নয়। আমরা পরিবারের সঙ্গে থাকতে অভ্যস্ত। আত্মীয়, ঘনিষ্ঠ, বন্ধুবান্ধব এবং সহযোগী সহকর্মীদের সাথে প্রতিদিন কিছু সময় কথা না বললে, তাদের কথা না শুনলে, তাদের সঙ্গে সময় যাপন না করলে আমাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। আমরা নিস্তেজ হতে শুরু করি। এটা মন্দ কিছু নয় এবং নির্দিষ্ট সীমারেখা পর্যন্ত অন্যায়ও নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে বিষয়গুলো নিষিদ্ধের মতো হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। তীব্র প্রয়োজন ছাড়া একজনকে অপরজন থেকে দূরে থাকতে বলা হচ্ছে এবং দূরে থাকাও হচ্ছে। রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মনে করা হচ্ছে এটা খুব সহায়ক। এতেও মন্দ কিছু নেই। বরং হাদীস শরীফে তো আছে,

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا النَّجَاةُ؟ قَالَ:امْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ، وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ

সাহাবী হযরত উকবা ইবনে আমির রাযি. জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! (জাহান্নাম থেকে) মুক্তির উপায় কী?

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তোমার জিহ্বার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কর। তোমার ঘর যেন তোমাকে বেষ্টন করে রাখে। আর কৃত গোনাহের জন্য কান্নাকাটি কর।-সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং ২৪০৬

এই হাদীস এবং এ জাতীয় আরও অনেক হাদীসের বক্তব্য অনুসারে বুঝা যায়, কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। মিথ্যা, অযথা, অনর্থ, অমূলক কথাবার্তা থেকে মানুষ যত বেশি বেঁচে থাকবে দুনিয়াবী অকল্যাণ থেকেও সে তত বেশি বেঁচে থাকবে। আখিরাতের ক্ষতি খাসারা থেকে ইনশাআল্লাহ বাঁচবেই। তেমনিভাবে প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া এবং বাড়ির বাইরে অযথা অবস্থান করাও বহুমুখী ক্ষতির কারণ হয়। তাছাড়া মন্দ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, অধিক পরিমাণে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং নীরবে অশ্রু বর্ষণ করা বাস্তবেই মানুষকে পরিশুদ্ধ করে। আত্মোন্নয়ের পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে।

কিন্তু আমরা ব্যক্তি পরিবার ও সমাজ জীবনে এসব বিষয় রক্ষা করে খুব একটা চলতে পারি না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা না চাইলেও এসব গুণে বেশ অভ্যস্ত হয়ে উঠছি। এটাকে ভালোই বলতে হবে। কিন্তু আমাদের জীবন জীবিকা ও নানা রকমের প্রয়োজনে স্বল্প পরিসরে হলেও মানুষের সঙ্গে বসতে হচ্ছে। চলতে হচ্ছে। কথা বলতে হচ্ছে। বিভিন্ন লেনদেন ও আচার আচরণের মধ্যই দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে আমরা সতর্কতাও রক্ষা করছি। ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রেখে চলার চেষ্টা করছি। তাতে ইনশাআল্লাহ আমাদের ফায়দা হচ্ছে। তবে এসব ক্ষেত্রে আমাদের আরও কিছু করার আছে। পারস্পরিক জীবনের কিছু রীতি নীতি এ অবস্থায়ও আমাদের পালন করতে হবে। তা না হলে দ্বীনী ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সত্যি সত্যিই অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবো। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমীন।

গতকালের ঘটনা। দেখলাম, একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কাজের ফাঁকে হাঁচি দিল। সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের কয়েকজন ভদ্রলোক বড় বড় চোখে তার দিকে তাকাল। একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী তো চিৎকারই করে উঠল। চিৎকার করে যা বলল, নিঃসন্দেহে তা মর্মাহত হবার মতো বাক্য। অপমানজন কথা। আমিও তাদের পাশে ছিলাম। কিন্তু কিছু বলার পরিস্থিতি ছিল না। তাই হাঁচিদাতা ব্যক্তিটি নীরব লজ্জায় মাথা নিচু করে আবার কাজে মন দিল। আমি ভাবলাম, এই করোনা পরিস্থিতির আগে কি আমাদের কোনোদিন হাঁচি আসেনি? একজন সুস্থ, স্বাভাবিক, পরিচ্ছন্ন ও সতর্ক সচেতন মানুষ স্বাভাবিকভাবে হাঁচি দিতে পারে। এবং তিনি মাত্র একবারই হাঁচি দিয়েছেন। তাতেই যদি আশপাশের লোকজন এমন করে তার দিকে তাকায়, ঘনিষ্ঠ সহকর্মী যদি এভাবে বাক্যবাণে তাকে আহত করে, তাহলে আমাদের মানবতা ভদ্রতার প্রয়োগক্ষেত্র কোথায়? একজন মুসলমানের সম্মান ও মর্যাদা তো ইসলামের দৃষ্টিতে অনেক দামি। এমন সাধারণ একটা কারণে তাকে সবার সামনে অসম্মান করার কী ন্যায্যতা থাকতে পারে? আত্মমর্যাদাশীল একজন মুমিনকে এভাবে লজ্জিত করা কি গোনাহের বিষয় নয়? এইটুকু কারণে কি এমন আচরণ করার অনুমতি ইসলাম দিবে কাউকে?

এই ঘটনার দুইদিন আগের কথা। মসজিদে মাগরিবের নামায পড়ছিলাম। নামাযের পর হঠাৎ চেচামেচি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোটখাটো জটলা। উচ্চ আওয়াজ। তাকিয়ে দেখি, একজন ভদ্র মুসল্লি আরেকজন মুসল্লির দিকে মারমুখো। বিষয় : নামাযের কাতারে একজন নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ানোর পর আরেকজন এসে তার কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। ধানমণ্ডি এলাকার মসজিদ। অভিজাত পরিবেশের সজ্জন ব্যক্তি তিনি। কিন্তু একজন প্রতিবেশী মুসল্লির নিকটে দাঁড়ানোকে তিনি ক্ষমা করতে নারাজ। সেজন্য মসজিদজুড়ে তীব্র হইচই।

এসব ক্ষেত্রে অনেক সময়ই না কিছু করার থাকে, না কিছু বলার। আমি ঘটনাটি দেখে নীরবে আল্লাহকে বললাম, হে মালিক! আমরা বড় কমযোর। আপনার এই পরীক্ষায় আমরা অকৃতকার্য। আমাদেরকে ক্ষমা করুন। কঠিন এই মহামারী আপনি উঠিয়ে নিন। ঈমান ও ইসলামের শিক্ষা আমাদের সকলের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফীক দান করুন। আবার আগের মতো ভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাযের কাতারে দ-ায়মান হওয়ার তাওফীক আমাদেরকে নসীব করুন।

কথা হলো, কত অল্পতেই আমরা একে অপরের পর হয়ে গেছি! কিয়ামতের দিন যে সন্তান তার মা বাবা থেকে, সঙ্গী সাথী ও ভাই বেরাদার থেকে, স্ত্রী পুত্র ও সন্তানাদি থেকে দূরে সরে যাবে বরং পালিয়ে বেড়াবে তা আজ কত বাস্তব মনে হয়। অবিশ্বাসী ও সংশয়বাদীদের জন্য এতে কত ভাবনার উপকরণ!

সেদিন সকল রাজাধিরাজ হবে অসহায়। আজ করোনার সামনে আমাদের রাজা বাদশাহদের অক্ষমতা ও শক্তিহীনতার স্বীকারোক্তি তা কত বাস্তব করে তুলে ধরে।

পূর্ববর্তি সংবাদজনসম্মুখে মাস্ক না পরে সমালোচনায় ইমরান খান
পরবর্তি সংবাদনিউজিল্যান্ডকে করোনামুক্ত ঘোষণা, তুলে নেওয়া হল বিধিনিষেধ