ওলিউর রহমান ।।
দ্বীন আল ইসলাম আল্লাহর কাছে একমাত্র মনোনীত ধর্ম। এই দ্বীন পূর্ণতা পেয়েছে- اليوم اكملت لكم دينكم- কুরআনের এই আয়াত নাযিলের মধ্য দিয়ে। ইসলামের সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ আল কুরআন। যার ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অকাট্য ঘোষণা হলো- এই কিতাবে সংশয় প্রকাশের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।
কিন্তু দ্বীন আল ইসলামের পূর্ণতা বিধানের পর থেকে বিরুদ্ধবাদীদের ষড়যন্ত্রও থেমে নেই। ইসলামের উপর আঘাত কখনো এসেছে সামনাসামনি। কখনো এসেছে বুদ্ধিবৃত্তিক। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের চূড়ান্ত ‘ই’জায’ প্রকাশার্থে আল্লাহ তাআলা এর অনুরূপ একটি আয়াত রচনা বা অন্তত এর কোনো ত্রুটি চিহ্নিত করার ব্যাপারে চারবার চ্যালেঞ্জ করেছেন।
মহাপরাক্রমশালী রবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার দুঃসাধ্য এযাবৎকালের কোনো মানবের হয়ে উঠেনি। তবুও কতিপয় দুর্ভাগা হতভাগ্যের শিকার হয়ে কুরআনের ত্রুটি অনুসন্ধানে নিজের মূল্যবান জীবন ধ্বংস করেছে। ইবনে রাওয়ানদি তাদের একজন। বলা হয়ে থাকে, ইসলামের ইতিহাসের এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় মুলহিদ এই ইবনে রাওয়ানদি।
তার জন্মসন ঠিক জানা না থাকলেও ইমাম যাহাবি তাকে মুতাযিলি শায়খ ঈসা ইবনে হাইসামের শাগরিদ বলেছেন। যার মৃত্যু ২৪৫ হিজরীতে। ফলত বুঝা যায় ইবনে রাওয়ানদি তৃতীয় শতকের লোক। ইবনে রাওয়ানদি প্রথমে মুতাযিলা মতে দীক্ষা গ্রহণ করে। মুতাযিলাদের প্রসিদ্ধ আলেমদের থেকে জ্ঞান অর্জন করে। পরে কিছুদিন শিয়া মতবাদের উপর জীবন যাপন করে। কিন্তু পরবর্তীতে সে আল্লাহর একত্ববাদ এবং কিছুদিন পরে আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারেই সংশয় পোশন করতে শুরু করে।
মুতাযিলারা ইসলামের ইতিহাসে ভ্রান্ত দল হিসেবেই পরিচিত। আক্বীদা বিষয়ক তাদের অনেক বিচ্যুতির কথাই কিতাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু ভয়ঙ্কর চিন্তা চেতনার কারণে খোদ মুতাযিলারাই ইবনে রাওয়ানদিকে তাদের দল থেকে খারিজ ঘোষণা করে।
মুতাযিলাদের ইমাম খ্যাত আবুল হাসান খায়্যাত আল মুতাযিলি তার ‘কিতাবুল ইনতিসার ওয়ার রাদ্দি আলা ইবনি রাওয়ানদি’তে লেখেন- ‘চিন্তায় প্রবল বক্রতার কারণে মুতাযিলা মতবাদ ইবনে রাওয়ানদিকে তাদের দল বহির্ভূত লোক ঘোষণা দিয়েছে। সে তার কিতাব ‘যমরুদ’-এ এমন তীর্যক ভাষায় ইসলামকে কটাক্ষ করেছে যা উল্লেখ করার উপযুক্ত নয়। রাওয়ানদি বাগদাদের ইয়াহুদি এবং খ্রিস্টানদের সাথে যোগসাজশ রেখে চলত’।
ইবনে রাওয়ানদির যমরুদ গ্রন্থটি তার বক্র চিন্তার সন্নিবেশনের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে। অবশ্য বর্তমানে গ্রন্থটি বিলুপ্ত। কিন্তু তার যমরুদ গ্রন্থের সমালোচনা যুগে যুগে উলামায়ে কেরাম করে এসেছেন।
ইমাম ইবনুল জাওযি লেখেন, ইবনে রাওয়ানদি রাসূলের বিভিন্ন মুজেযা নিয়ে অসংলগ্ন মন্তব্য করে। এবং কুরআনে ভুল আছে বলে নিজের মত দেয়। {وَما تَسْقُطُ من وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُها}, {وَما جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْها إِلَّا لِنَعْلَمَ…}, {إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطانِ كانَ ضَعِيفاً} কুরআনের এইসব আয়াতকে ইবনে রাওয়ানদি তার যমরুদ কিতাবে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছে।
ইমাম ইবনে খাল্লিকান লেখেন, ইবনে রাওয়ানদির ১১৪ টিরও বেশি গ্রন্থ রয়েছে। তবে তার লেখাগুলো ‘অভিশপ্ত রচনা’ হিসেবেই যুগে যুগে স্বীকৃত হয়ে এসেছে।
মুতাযিলি আলেম আবু আলী জুব্বায়ী সূত্রে ইমাম ইবনে কাসীর লেখেন, ইবনে রাওয়ানদির যমরুদে মিথ্যা, অপবাদ, অপপ্রচার ছাড়া কিছু নেই। অতপর ইবনে কাসীর বলেন, সুতরাং ইবনে রাওয়ানদির বক্তব্যের খণ্ডন করতে যাওয়াও কেবলমাত্র সময় অপচয়।
ইমাম যাহাবি তার তারিখুল ইসলাম কিতাবে লেখেন, তিনজন মুলহিদের নাম ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। তাদের অন্যতম হল ইবনে রাওয়ানদি।
সিয়ারু আলামিন নুবালাতে ইমাম যাহাবি আরও বলেন, ইবনে রাওয়ানদির পিতা শুরুতে ইয়াহুদি ছিল। সেসময় সে ইয়াহুদি ধর্মগ্রন্থ তাওরাতকে নিজের ইচ্ছেমতো বিকৃত করতো। পরে সে ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু তার ছেলে ইবনে রাওয়ানদি ইসলাম ত্যাগ করে এবং কুরআনের ভুল খোঁজার দুঃসাহস দেখায়। সেসময়ের ইয়াহুদিরা মুসলিমদের বলত, এই লোকের ( ইবনে রাওয়ানদি) পিতা আমাদের ধর্মগ্রন্থ বিকৃত করেছে। সে তোমাদের কুরআন বিকৃত করতে পারে।
অভিশপ্ত এই ইবনে রাওয়ানদির ব্যাপারে আরও অনেক বক্তব্য রয়েছে। কেউ কেউ তার শেষ সময় তাওবা করার কথা লেখলেও আল্লামা ইবনে আসাকির এই মতকে পরিত্যাজ্য বলেছেন। তিনি বরং ইবনে রাওয়ানদিকে ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণিত ধর্মত্যাগী বলে মন্তব্য করেছেন।
















