বিশাল ঘাটতি বাজেট থেকে বাড়ছে ঋণ ও সুদের বোঝা

[২০২০-২০২১ সনের প্রস্তাবিত বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন দেশের অর্থনৈতিক ফিকহের প্রাজ্ঞ উস্তায, মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ। ধারাবাহিকভাবে সে আলোচনা ইসলাম টাইমস-এর পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। এটি প্রথম আলোচনা।]

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ।।

বাজেট নিয়ে আগে প্রায় নিয়মিত আলোচনা করতে চেষ্টা করে এসেছি। গত কয়েক বছর ধরে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা ও মন্তব্য করতে উৎসাহ জাগে না। কারণ সাম্প্রতিক বাজেটগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় গতানুগতিক। এ নিয়ে আলোচনা করতে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করার দরকার হয় না। নির্ধারিত কিছু বিষয়ই ঘুরে ফিরে আসে। এতে বাজেট পেশ হওয়ার আগেই সাধারণ সচেতন যে কেউ বলে দিতে পারে বাজেটের ধরন ও বৈশিষ্ট্যটি কেমন হচ্ছে। সেই বিশাল আকারের বাজেট। ঘাটতি অনেক বেশি। প্রাক্কলিত আয়ের চেয়ে খরচের খাত বেশি। প্রবৃদ্ধি দেখানো হয় বেশি আর মূল্যস্ফীতি কম। ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়। বরাবরের মতো কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। গতানুগতিক এইসব বৈশিষ্ট্য ও ধারাই বাজেটে ফুটে ওঠে। নতুন কোনো বৈশিষ্ট্য কিংবা নতুন কোনো উদ্যোগের বার্তা এখনকার বাজেটগুলোতে পাওয়া যায় না।

বাজেটে জনকল্যাণমূলক পরিবর্তনের কোনো আভাস থাকে না। যথারীতি কিছু খাতে দাম বাড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিছু ঋণ বাড়িয়ে তোলা হয়, বিশাল পরিমাণ অংক ঘাটতি রেখে দেওয়া হয়। বেশিরভাগ মানুষের উপকার হয়- এমন কোনো পরিবর্তন মূলক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় না। আমাদের মতো অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিল রেখে বছরের পর বছর এভাবেই চলতে থাকে। কোনো নতুনত্ব নেই, কোনো অভিনবত্ব নেই। এজন্য নতুন করে বাজেট নিয়ে আলোচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, উৎসাহও জাগে না। তবুও যেহেতু আমাদের বন্ধু-শুভার্থী অনেকেই চান বাজেট নিয়ে কয়েকটি কথা বলি, সেজন্যই এবারের বাজেট নিয়ে এই আলোচনার অবতারণা।

আরো পড়ুন: জনপ্রশাসন খাতের বর্ধিত ব্যয় এবং ঘুষ ও উপঢৌকন প্রসঙ্গ

২০২০-২০২১ সনের প্রস্তাবিত বাজেট বর্তমান অর্থমন্ত্রীর পেশ করা দ্বিতীয় বাজেট। এর আগে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাহেব বাজেট পেশ করতেন। তখন বর্তমান অর্থমন্ত্রী ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। মুহিত সাহেবের বাজেট পেশ করার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে এই দুজনের মাঝে কিছু খুনসুটির দৃশ্য আমাদের চোখে পড়তো। আগের অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনরত বর্তমান অর্থমন্ত্রী কখনো কখনো ভিন্ন মত পোষণ করতেন। সেসব খবর গণমাধ্যমে আসতো। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, বাজেট পেশের ক্ষেত্রে সাবেক অর্থমন্ত্রী যে পথে হেঁটেছেন, বর্তমান অর্থমন্ত্রীও সেই পথে হাঁটছেন বলে মনে হচ্ছে। আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্নমত প্রকাশ করলেও আগের অর্থমন্ত্রীর ছক থেকে তিনি বের হতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না।

প্রথমেই দেখুন, এবারের বাজেটের আকারটা কী! বাজেট মানে রাষ্ট্রের আগামী বছরের খরচের প্রাক্কলন। এটা এবার প্রস্তাব করা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশের জন্য বিশাল আকারের বাজেট। পত্র পত্রিকায় এসেছে, ১৯৭৪ সনে এদেশে বাজেটের আকার ছিল সম্ভবত ৯৯৫ কোটি টাকা; অর্থাৎ ১০০০ কোটি টাকার চেয়েও কম। ৪৫ বছরে সেখান থেকে বাড়তে বাড়তে আমাদের বাজেট এখন এসে দাঁড়িয়েছে এ জায়গায়। এটা খুব সমস্যাপূর্ণ কোনো ব্যাপার নয়। দেশে খরচের খাত অনেক বেড়েছে। বাস্তবেই যদি রাষ্ট্রের ব্যাপক আয় থাকে, তাহলে এই আকারের বাজেটে বড় কোন অসুবিধা আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু এখন যেটা ঘটছে, সেটা হল খরচের চিন্তা আগে করা হচ্ছে, আয়ের চিন্তা পরে। এ ব্যাপারটা বেশ আগে থেকেই করা হচ্ছে। এবার অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে একদম খোলাখুলি বলেই দিয়েছেন।

এখানে প্রাসঙ্গিক কারণেই একটি অন্য কথা বলি। যে কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে আয় ও খরচের চিন্তাটা কী হওয়া উচিত। আদর্শ চিন্তা বা পরিকল্পনা আমরা কোনটাকে বলব। আগে আয়ের চিন্তা করা এবং সেই আয় অনুযায়ী খরচের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

আরো পড়ুন: প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং বৈষম্যের অমীমাংসিত অঙ্ক

কিন্তু এখনকার বাজেট গুলোতে ব্যয়ের চিন্তাটাকে করা হচ্ছে আগে, পরে আর নানান উপায় নিয়ে পরিকল্পনা পেশ করা হচ্ছে। এজন্য টাকা সংগ্রহের প্রয়োজনে নানান দিকে হাতরাতেও হচ্ছে। আমরা আগে দেখেছি, বিদেশি অনুদান সংগ্রহের জন্য বৈঠক হতো, সেখানে নানারকম শর্ত আরোপ, দর-কষাকষি হতো এবং নাকানি-চুবানি খেতে হতো। এখনো আমরা এ দৃশ্যগুলো দেখছি। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, অন্যান্য দাতাসংস্থা ঋণ বা অনুদান দেওয়ার সময় নানারকম শর্ত দিয়ে রাখছে। রাষ্ট্রকে তাদের সেসব শর্ত মেনেই অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে করে আর্থিক বিভিন্ন জটিল চক্রে পড়ে যাচ্ছে দেশ।

আয়ের চেয়ে ব্যয়ের প্রাক্কলন যে কীভাবে কতটা বেশি হচ্ছে, দেখা যাক। এবার বাজেট উপস্থাপন পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী মহোদয় বলেই ফেললেন, আয়ের চিন্তা করিনি, আগে ব্যয়ের চিন্তা করেছি।’ এবার প্রাক্কলিত ব্যয় হচ্ছে, ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা নাগরিকদের দেওয়া কর ইত্যাদি থেকে আয় হবে বলে ধরা হয়েছে। বাকি ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা থেকে যাচ্ছে ঘাটতি বাজেট হিসেবে। অর্থাৎ প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা কিভাবে আয় হবে, এর নিয়মতান্ত্রিক কোন উপায় নেই। এটাই ঘাটতি বাজেট।

এই প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট আসবে সরকারি-বেসরকারি এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে। সে ঋণের সঙ্গে যুক্ত থাকবে সুদ। ঘাটতি বাজেটের কিছু টাকা আসবে অনুদান হিসেবে। ঘাটতি বাজেটের চরিত্র এটাই। এইসব খাত থেকেই টাকাটা সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

বাজেটে প্রাক্কলন ব্যয় বাড়ছে। এবারের বাজেটেও অনেক বেড়েছে। বাড়ছে ঘাটতি বাজেটও। এই ঘাটতি বাড়ার ক্ষতি কী? এ কারণে কোথায় কোথায় অসুবিধা তৈরি হতে পারে? এর প্রধান উত্তর হলো, এই ঋণের সঙ্গে সুদ জড়িয়ে আছে। ঘাটতি বাজেট বাড়ার মানে হলো, রাষ্ট্রের ঋণের পরিমাণ বাড়া এবং তার সঙ্গে সুদ বৃদ্ধি হওয়া। এ কারণে মাথাপিছু ঋণ বাড়ছে। এবং এ কারণেই রাষ্ট্রকে প্রতিবছর বিশাল অংকের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

আরো পড়ুন: ঘাটতি বাজেটের খেসারত কোথায় কীভাবে দিতে হচ্ছে!

(চলমান, ইনশাআল্লাহ)

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনা ও নেপাল সঙ্কটের মাঝে চীনের সঙ্গে সংঘাত, চাপে মোদি
পরবর্তি সংবাদইউনাইটেড হাসপাতালের শীর্ষ ৪ কর্মকর্তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা