ঘাটতি বাজেটের খেসারত কোথায় কীভাবে দিতে হচ্ছে!

[২০২০-২০২১ সনের প্রস্তাবিত বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন দেশের অর্থনৈতিক ফিকহের প্রাজ্ঞ উস্তায, মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ। ধারাবাহিকভাবে সে আলোচনা ইসলাম টাইমস-এর পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। এটি  দ্বিতীয় আলোচনা।]

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ।।

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে বরাদ্দের প্রধান বা এক নম্বর খাত হলো জনপ্রশাসন খাত। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দের অংক। এ বরাদ্দের হার ১৮’০৭ শতাংশ। এর পরের খাতটিই হলো, সুদ পরিশোধের খাত। এটি এবারের বাজেটে দ্বিতীয় প্রধান খাত। আগে কোনো কোনো বছর এটি ছিল এক নম্বর খাত। এবছর এ খাতে বরাদ্দের হার ১৮’০১ শতাংশ। টাকার অংকে ৬৩ হাজার ৮০১ কোটি টাকা।

আমরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিক। সুদ পরিশোধের জন্য আমাদের রাষ্ট্র এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করছে, এটা কি আমরা কল্পনা করতে পারি? অথচ বাস্তবে এটাই ঘটছে। নির্বাচন এলে আমাদের দেশের সরকারি দল- বিরোধী দল সবাই প্রতিশ্রুতির ভাষায় বলতে থাকে, ‘বিজয়ী হলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন করা হবে না।’ পক্ষান্তরে দেশে সুদের মতো কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী কত কত নীতি ও বিধি প্রচলিত আছে, তা নিয়ে এসব দলের কেউ চিন্তা করে দেখেছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্তা ব্যক্তিত্ব, বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং দেশে কাজ করা বিভিন্ন পর্যায়ের থিংকট্যাংক সুদের এই বিশালতা এবং এর ভয়াবহতা নিয়ে প্রয়োজনীয় বিকল্পের ভাবনা ভাবছেন বলে শোনা যায় না। অথচ আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন: يمحق الله الربو (আল্লাহ তা’আলা সুদকে ধ্বংস করে দেবেন।) প্রকৃত কথা হলো, সুদ দেওয়া- নেওয়ার চিন্তা না ছাড়লে ব্যক্তির জীবনে, প্রতিষ্ঠানে কিংবা রাষ্ট্রে কল্যাণ আসতে পারে না। বাস্তবেও আমরা সে দৃশ্যই দেখছি।

এত বিশাল আকারের বাজেট আমাদের দেশে পাশ হচ্ছে, কিন্তু আমরা কি কোনো কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হতে পেরেছি? গড়ে টাকা বেড়ে যাওয়া, কিছু লোকের ধনী কিংবা অতি ধনী হয়ে যাওয়ার সঙ্গে কি কল্যাণরাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক আছে? বিশাল খরচ, ঘাটতি বাজেট এবং সুদের পাহাড় মাথায় নিয়ে কোনো কল্যাণরাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না। ভাবনার বিষয় হচ্ছে, এ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা আবদ্ধ হয়ে আছি কেন? সুদের জালে কেন ফেঁসে থাকছে আমাদের দেশ? এর প্রধান কারণ হলো, ঘাটতি বাজেট। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের যা আয়, তার চেয়ে ব্যয়ের প্রাক্কলন এবং ব্যয়ের পরিমাণ বেশি বলেই ঘাটতি বাজেটের প্রয়োজন হয়। আর বাজেটের এই ঘাটতি পূরণের জন্য সুদের ভিত্তিতে ঋণ নিতে হয়। একারণেই রাষ্ট্র সুদের ভয়ঙ্কর চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।

ঘাটতি বাজেটের জন্য সুদভিত্তিক ঋণ সংগ্রহের অন্য একটি খেসারতও আছে। অনেকেই সেই খেসারতের প্রসঙ্গ তুলে ধরছেন। বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার যে ঋণ নিয়ে থাকে, সেটা দেশি ব্যাংক হলে সরকারের জন্য সুবিধা হয়। বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে অনেক রকম ঝামেলা পোহাতে হয়। দেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে চাহিবামাত্রই এখান থেকে ঋণ পেয়ে যায় সরকার। এবার ঘাটতি বাজেটের জন্য দেশি ব্যাংকগুলো থেকে প্রাক্কলিত ঋণ গ্রহণের অংকটা হলো, ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। দেশি ব্যাংকগুলো থেকে এই বিশাল পরিমাণ অর্থের ঋণ সংগ্রহের ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর বড় রকম একটি চাপ পড়বে। এই চাপের জেরটাও গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

আরো পড়ুন: জনপ্রশাসন খাতের বর্ধিত ব্যয় এবং ঘুষ ও উপঢৌকন প্রসঙ্গ

ব্যাংকগুলো থেকে সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে গেলে প্রথম চাপটি গিয়ে পড়ে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর। ব্যাংকগুলো থেকে সাধারণ মানুষের টাকা চলে যায় সরকারের কোষাগারে। ব্যাংকে সাধারণত টাকা জমা রাখে সাধারণ পর্যায়ের মানুষেরা, যাদের কোনো বড় ব্যবসা বা কারবার নেই। কেউ ৫০০, কেউ ১০০০, কেউ এক লাখ, কেউ দুই লাখ টাকা ব্যাংকে জমা করে রাখে। কারো পেনশনের টাকা, কারো ক্ষুদ্র সঞ্চয় কিংবা জমি বিক্রির টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখে। বড় ব্যবসায়ী কিংবা বিত্তবান লোকেরা ব্যাংকে টাকা ফেলে রাখে না। তারা বরং ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে নিয়ে যায়। ব্যাংকের এই টাকা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ হয়। কখনো শিল্পে, কখনো কৃষিতে, কখনো অবকাঠামো নির্মাণে এবং কখনো ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসার বিস্তৃতিতে। ব্যাংকের এইসব টাকা সরকারের তহবিলে চলে গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাধাপ্রাপ্ত হয়, উৎপাদন ও আর্থিক বিকাশ ব্যাহত হয়। ব্যাংকের টাকায় টান পড়ে যায়, তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়। এর ফল ভোগ করতে হয় আবার সাধারণ মানুষকেই। ঘাটতি বাজেট পূরণে ব্যাংক ঋণ সংগ্রহের এটি অন্যতম খেসারত।

আরো পড়ুন: বিশাল ঘাটতি বাজেট থেকে বাড়ছে ঋণ ও সুদের বোঝা

ঘাটতি বাজেট পূরণের আরেকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয় বিদেশি অনুদান সংগ্রহের মধ্য দিয়ে। এবারের বাজেটে অনুদানের প্রাক্কলন হলো, ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা। এই অনুদান সংগ্রহ করতে গিয়ে বিদেশিদের কত রকম শর্ত এবং চাপিয়ে দেওয়া অপমান যে মেনে নিতে হয় তা বলে শেষ করা যাবে না। এসব অনুদান স্বেচ্ছায় দেওয়া কোনো স্বতঃস্ফূর্ত দান নয়; করোনা সংকটসহ বিভিন্ন দুর্যোগে যেমন অসহায় মানুষকে সহায়তা দানকারী মানুষেরা নিরবে, শর্তহীনভাবে ঘরে-ঘরে দানের অঙ্ক পৌঁছে দিয়ে আসে, বিদেশি অনুদানের ধরণটা এমন নয়। বরং এসব অনুদানের সঙ্গে থাকে নানা রকম শর্ত, চাপ এবং সম্মান ও মর্যাদা খোয়ানোর মতো বহু অনুষঙ্গ।

অনুদানের পাশাপাশি ঘাটতি বাজেট পূরণে বিদেশি ঋণের ওপরও নির্ভরতা কাজ করে। এবারের বাজেটে বিদেশি ঋণের প্রাক্কলন হলো, ৭৬ হাজার চার কোটি টাকা। এসব ঋণের সঙ্গেও শর্তের পাহাড় জড়িয়ে থাকে। অনেকেরই মনে থাকবে, কয়েক বছর আগে পার্শ্ববর্তী একটি দেশ আমাদের দেশকে কিছু ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। পরবর্তীতে বহু রকম শর্তের কথা সামনে চলে এসেছে। দেখা গেছে, তাদের দেওয়া ঋণের অর্থে এদেশে অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী তাদের দেশ থেকেই কেনার শর্ত দেওয়া আছে। শর্ত দেওয়া আছে, কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রকৌশলী ও কর্মী তাদের দেশ থেকেই নিতে হবে। অর্থাৎ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে শর্তের বেড়াজালে পড়ে তাদের দেওয়া ঋণের বড় একটি লাভ তাদেরকেই দিয়ে আসতে হবে। বিদেশি ঋণগুলোর অবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরকমই। এজন্যই নিজস্ব আয়ের চেয়ে ব্যয়ের চিন্তা বেশি করাটা বাস্তবানুগ কোনো চিন্তা নয়।

আরো পড়ুন: প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং বৈষম্যের অমীমাংসিত অঙ্ক

আয়ের চেয়ে খরচের খাত বেশি ধরলে বাজেটে যে ঘাটতি হয়, দেখা যাচ্ছে, সে কারণে সুদের বিশাল চাপের মধ্যে পড়তে হয়। বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে শর্তের নানান বেড়াজালে আবদ্ধ হতে হয়। দেশী ব্যাংকগুলোর আর্থিক গতি ও স্বাচ্ছন্দ ব্যাহত করতে হয়। কিন্তু তারপরও বাজেট ঘোষণা ও পাশের সময় আমরা গতানুগতিক এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো বার্তা খুঁজে পাই না। এমন কোনো ভাবনার উদ্ভাস দেখি না যে, আমাদের যতটুকু আয়ের প্রাক্কলন রয়েছে, সে অনুপাতেই ব্যয়ের হিসাব ধরা হবে। এ বছর কর ইত্যাদি স্বাভাবিক ও নিজস্ব উৎস থেকে আয়ের প্রাক্কলন হলো, ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যয়ের প্রাক্কলন এই অঙ্কের সঙ্গে মিল রেখে ধার্য করলে সেটাই হতো বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত। কিন্তু ঘাটতি বাজেটের হাতছানি উপেক্ষা করে এ-জাতীয় সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে এখন আর দেখা যায় না।

(চলমান, ইনশাআল্লাহ)

পূর্ববর্তি সংবাদমাদারীপুরে লকডাউন না মানায় অর্ধশত মোটরসাইকেল জব্দ ও জরিমানা
পরবর্তি সংবাদসুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে মিলল জলদস্যুদের অস্ত্র তৈরির কারখানা