প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় এবং বৈষম্যের অমীমাংসিত অঙ্ক

[২০২০-২০২১ সনের প্রস্তাবিত বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন দেশের অর্থনৈতিক ফিকহের প্রাজ্ঞ উস্তায, মারকাযুদ্ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ। ধারাবাহিকভাবে সে আলোচনা ইসলাম টাইমস-এর পাঠকদের সামনে পেশ করা হচ্ছে। এটি তৃতীয় আলোচনা।]

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ।।

এবারের বিশাল আকারের বাজেট এবং এর অন্তর্গত অবস্থা নিয়ে কৌতূহল-উদ্দীপক ও মজাদার বিভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে। জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার পর একটি সংবাদপত্র শিরোনাম করেছে-‘করোনার মন্দায় কল্পনার বাজেট।’ আবার আরেকটি সংবাদপত্র শিরোনাম দাঁড় করিয়েছে-‘করোনা ক্ষান্ত করতে পারেনি অর্থমন্ত্রীর উচ্চাশা’। বাজেট পেশের পর দেশের গণমাধ্যমগুলোর এজাতীয় শিরোনাম প্রয়োগে বোঝা যায়, দেশের আর্থিক অবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে বাজেটের বিবরণ ও প্রাক্কলনের কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকের কাছেই বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রাকে আশ্চর্যজনকও মনে হয়েছে। হিসাবের জাদুকরি অঙ্কে এমন অনেক কিছুই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, বাস্তবে যার সম্ভাব্যতা বেশ দুরূহ।

এবারের বাজেটে প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ধরা হয়েছে, ৮.০২ শতাংশ। অথচ বিদেশিরা জিডিপি-প্রবৃদ্ধি নামের যেসব  জাদুকরি অংক ও তত্ত্ব এদেশের মানুষকে শিখিয়েছে, তারাই বলছে, আগামী বছর বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার হতে পারে ১ শতাংশ কিংবা ২ শতাংশ। গোটা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। প্রবৃদ্ধির হার উপরের দিকে যাওয়া এখন বেশ দুরুহ ব্যাপার। তারপরও এখানে হারটা দেখানো হয়েছে অনেক বেশি। অনেকেই মনে করেন, এটা করা হয়েছে গত বছরের থেকে প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখানোর জন্য। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বোঝানোর জন্য একটা ঊর্ধ্বমুখী হার দেখাতে হয়, সেটাই দেখানো হয়েছে।

অপরদিকে মূল্যস্ফীতি দেখানো হয়েছে মাত্র ৫.০৪ শতাংশ। অথচ সবাই জানেন, প্রতিবছর কীভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়, আগের বছরের তুলনায় পরের বছর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার দেখে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ছুটে যায়। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস, ওষুধপত্র এবং জরুরি জীবনোপকরণের মূল্য বৃদ্ধির হার মাত্র ৫% থাকে নাকি এটা ১০% এর চেয়েও বেশি বেড়ে যায় নাগরিক মাত্রই জানেন। কিন্তু হিসাবের ফাঁকফোকর ধরে একটা হার দেখানো হয়। বাস্তবের সঙ্গে না মিললেও এই অঙ্কটাই চর্চায় চলে আসে। এটা হচ্ছে হিসাবের জাদুকরি। সাধারণের বোধগম্যের বাইরের বিষয়। বাস্তব জীবনে মূল্যস্ফীতির চাপে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলেও বাজেটের অংকে সেটা থাকে মাত্র ৫ বা সাড়ে ৫ ভাগ।

আরো পড়ুন: বিশাল ঘাটতি বাজেট থেকে বাড়ছে ঋণ ও সুদের বোঝা

একই রকম ঘটনা ঘটে থাকে মাথাপিছু আয় দেখানোর ক্ষেত্রেও। এটাও অঙ্কের খেলা। দেখানো হয় অনেক বেশি, কোটি কোটি নাগরিকের জীবনের সঙ্গে যার কোন মিল পাওয়া যায় না। যেমন: চলতি বছরের মাথাপিছু আয় ২১৭৩ ডলার। সামনের বছর ধরা হয়েছে ২৩২৬ ডলার। এক ডলার সমান ৮৬ টাকা। তার মানে বছরে প্রতি জন নাগরিকের মাথাপিছু আয় ২ লাখ টাকা। বিরাট একটি অঙ্ক। অথচ বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। মাথাপিছু আয় তো দূরের কথা, লক্ষ করলে দেখা যাবে, দেশের বেশিরভাগ পরিবারের মাথাপিছু আয় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত যায় না। অথচ মাথাপিছু আয়ের এই মায়াজাল বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বিত্তবানদের পাড়া ছাড়া অন্য যেকোনো বসতি বা মহল্লায় গেলেই মাথাপিছু আয়ের এই অংকের ফাঁকটা চোখে পড়বে। এবং এটা বোঝার জন্য হিসাববিজ্ঞান জানা কোনো লোকের দরকার পড়বে না, নিয়মিত সংসার চালাতে হয়, এমন যেকোনো মানুষ নিজে থেকেই বিষয়টা অনুভব করতে পারবে। মাথাপিছু আয় যদি দুই লাখ টাকা হয়, ৫ জনের একটি পরিবারের আয় হওয়ার কথা ১০ লাখ টাকা, ১০ জনের পরিবারের ২০ লাখ টাকা। অথচ দেশে কোটি খানেক এমন মানুষ পাওয়া যাবে, যাদের পরিবারের লোক সংখ্যা ৫ থেকে ১০ জন, এবং যাদের বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকারও কম। তাহলে মাথাপিছু আয়ের এই হিসাব দিয়ে কী হবে!

বরং বলা যেতে পারে, মাথাপিছু আয়ের এই অঙ্ক থেকে এই সমাজে বিরাজমান বৈষম্যের চেহারাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। এটা যেহেতু অনুমাননির্ভর, তাই এই হিসাবটাকে পুরোপুরি সঠিক যদি আমরা না-ও ধরি, বাস্তব অঙ্কটাকে এর কাছাকাছি মনে করি, তবুও বুঝতে পারা যায়,মাথাপিছু আয়ের এই টাকাগুলো আসলে কত শতাংশ লোকের হাতে জমে আছে। শতকরা ১ ভাগ অথবা ২ ভাগ লোকের হাতে আটকে আছে দেশের বেশিরভাগ টাকা। অনেকে মনে করেন, প্রায় সব টাকাই তাদের হাতে। তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।

এ পরিস্থিতিতে সাধারণ জনগণকে মাথাপিছু আয়ের একটি বিশাল অংক দিয়ে কী লাভ! মাথাপিছু আয় নামের এই জাদুকরি অংকটা কি তাদের জন্য পরিহাস নয়? অথচ বাজেট আলোচনা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রগুলোতে এই মাথাপিছু আয়ের কথা বলেই দাবি করা হয় আমাদের দেশ এখন মধ্যম আয়ের স্তরে আছে, কিছুদিনের মধ্যেই উন্নত আয়ের দেশে পরিণত হবে। যদিও নাগরিকদের বিশাল ও প্রধান অংশটির জীবনের সঙ্গে এইসব হিসাব মিলে না। প্রশ্ন হচ্ছে, মাথাপিছু আয়ের হিসাবটা তবে আসলে কী? এটা কার কার হচ্ছে? এ আয়টা হচ্ছে মূলত ১ অথবা ২ ভাগ বিত্তবান নাগরিকের। তাদের সম্পদের স্তুপটাকেই গড়ে সব গরিব নাগরিকের সঙ্গে মিলিয়ে হিসাবটা দাঁড় করানো হচ্ছে। সমাজের বিরাজমান দারিদ্র্য ও বৈষম্য দেখলে এটা যে কোনো সচেতন মানুষই বুঝতে পারবেন। হিসাব-নিকাশ করতে পারার মতো আলাদা যোগ্যতার দরকার হবে না।

আসলে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে ধন সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়া এবং বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের সঙ্গে বৈষম্যের অবস্থা দাঁড়িয়ে যাওয়া, আর এরপরও মাথাপিছু আয়ের নামে প্রবঞ্চনা ও সান্ত্বনার একটা অংক দাঁড় করিয়ে মানুষকে প্রবোধ দেওয়া-এগুলো হচ্ছে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার একেকটি উল্টো দিক, একেকটি ক্ষতিকর ক্ষেত্র। অথচ এসব ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান কত সুন্দর। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন- كى لا يكون دولة بين الاغنياء منكم ( যেন তোমাদের মধ্য থেকে শুধু বিত্তবানদের মাঝেই সম্পদ আবর্তিত না হতে থাকে।)

ইসলাম জাদুকরি হিসাবের প্রবোধ দিয়ে ক্ষান্ত হয় না, বরং সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণের বাস্তব পদ্ধতি প্রচলন করে, নির্দেশনা দেয়। ইসলামী অর্থব্যবস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, ধনী-গরিবের তফাত থাকতে পারে, কিন্তু বিশাল বৈষম্য থাকতে পারে না। অল্প কিছু বিত্তবান মানুষের বিশাল অর্থের স্তুপকে গড় হিসাব করে মাথাপিছু আয় দেখিয়ে ফাঁপা উন্নয়নের চিত্র দাঁড় করানো যেতে পারে, কিন্তু সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণ না করলে প্রকৃত অর্থে মাথাপিছু কিংবা ব্যক্তিপিছু স্বচ্ছলতা আসার পথ তৈরি হয় না। বরং বৈষম্য বাড়তে থাকে। ইসলাম এর বিপরীত কথাটাই মানুষকে শেখায়।

আরো পড়ুন: ঘাটতি বাজেটের খেসারত কোথায় কীভাবে দিতে হচ্ছে!

মাথাপিছু আয় এবং বৈষম্যের এ চিত্রের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হওয়ায় এখানে এ বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার মনে করছি যে, বাজেটের প্রধান আয় নাগরিকদের প্রদেয় যে কর থেকে আসে, সেই কর দেশের ধনী-গরিব সব শ্রেণীর মানুষই পরিশোধ করে থাকে। অনেকের ধারণা, কর দেয় শুধু বড়লোকেরা। এ ধারণা সঠিক নয়। বরং দেশের সব নাগরিক, এমনকি একজন ভিখারি পর্যন্তও কর পরিশোধ করে থাকে। এক মোবাইল ফোনের কথাই ধরুন। এ খাতে সাড়ে ৩৩ শতাংশ কর ধার্য হয়েছে। এখন মোবাইল ফোন সবাই ব্যবহার করে। সবাইকেই এ কর পরিশোধ করতে হচ্ছে। একজন ভিখারি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দুই টাকা ঋণ করে ২ টা ট্যাবলেট কিনলে সেখানেও তাকে কর (মূল্য সংযোজন) পরিশোধ করতে হয়। অথচ রাষ্ট্রের সুযোগ সুবিধার দিক থেকে এই দরিদ্র মানুষদের বঞ্চনার পরিমাণটা বেশি।

নাগরিকদের কাছ থেকে টেক্স বা কর কয়েকভাবে আদায় করা হয়। সরাসরি আরোপিত কর, রিটার্ন জমা দিয়ে কর আদায়, কর্পোরেট কর, আমদানি পণ্য সারচার্জ, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি ইত্যাদি। সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হয় ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন করের। ছোট-বড় বেশিরভাগ পণ্য ও সেবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অপরদিকে কর্পোরেট কর কিংবা শিল্প ও শিল্পপতিদের ওপর আরোপিত করের বোঝাও বেশিরভাগ সময় সাধারণ জনগণের ওপরই পড়ে। কারণ উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে করের অর্থ যোগ করে তারা পণ্য বাজারে ছাড়ে‌। সেই পণ্যের ভোক্তা হয়ে থাকে আবার ধনী-গরীব সাধারণ জনগণ।

আরো পড়ুন: জনপ্রশাসন খাতের বর্ধিত ব্যয় এবং ঘুষ ও উপঢৌকন প্রসঙ্গ

তবে এবারের বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণীর আয়কর আদায়ের মাত্রাটা একটু বাড়ানো হয়েছে। গতবছর বার্ষিক আড়াই লাখ টাকা আয় করলেই কর দিতে হতো, এবছর সে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে ৩ লাখ টাকা। করমুক্ত আয়সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়ানোর কারণে সাধুবাদ জানাই, কিন্তু বাস্তবতার দাবি হলো, করমুক্ত আয়সীমা বার্ষিক অন্তত ৬ লাখ টাকা হওয়া উচিত। তাহলে কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে। একটি পরিবারের ভরণপোষণ, বাসা ভাড়া, বাচ্চাদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ইত্যাদি খাতে ওই পরিবারের কর্তার মাসে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েই যায়। করমুক্ত আয়সীমা আঙ্গিকে হলে সেটা অধিকতর বাস্তবসম্মত ও স্বস্তিদায়ক হতো।

(চলমান, ইনশাআল্লাহ)

পূর্ববর্তি সংবাদবিদায় হজ্বের খুতবা: চৌদ্দশ বছর পর এখনও কেমন বাস্তব
পরবর্তি সংবাদনাৎসি বাহিনীর প্রতীকের সঙ্গে মিল থাকায় ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজ্ঞাপন অপসারণ করলো ফেসবুক