ঢাকার বাইরে করোনার লাশ দাফনে কাজ করছে দুটি প্রশংসিত সংস্থা

ওলিউর রহমান ।।

দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ইতোমধ্যে হাজার ছড়িয়েছে মৃত্যুর সংখ্যা। শুরুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু হার কম থাকলেও সময় যাওয়ার সাথে সাথে তা যেন লাফিয়ে বাড়ছে।

মানুষের জীবদ্দশায় তার ব্যাপারে আত্মীয় এবং প্রতিবেশির যেমন কতিপয় দায়-দায়িত্ব থাকে মৃত্যুর পরেও তাদের কিছু হক থাকে। মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া, তার জানাযায় শরিক হওয়া অপরাপর মুসলিমের জন্য অবশ্য কর্তব্য। হাদিসে এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের যে ছয়টি হকের কথা বলা হয়েছে তার একটি হলো ‘ইত্তিবায়ুল জানায়িয’ তথা জানাযায় শরিক হওয়া।

তবে মহামারী করোনা পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। এখন মানুষের জানাযায় উপস্থিতি সীমিত হয়ে গেছে। সাধারণ মৃত্যুর দাফন-কাফনেও মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রগণের পরিমাণ কম। করোনায় মৃতদের দাফনের ব্যাপারে তো কথাই নেই। অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা এরই মধ্যে আমাদের দেখতে হয়েছে।

সংক্রমণের আশঙ্কায় করোনায় মৃত্যু হওয়া অনেকের পরম আত্মীয়কেও জানাযা, দাফনে শরিক হতে অসস্মতি জানাতে দেখা গেছে। অনেককে অবশ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

করোনায় মৃত্যু হওয়া নাগরিকদের শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে সৎকার যখন রাষ্ট্র এবং জনগণের উদ্বেগের বিষয় ছিল তখন দ্বীনি দায়িত্ব পালন এবং মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসে কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

রাজধানীর বাইরেও আলেমদের একাধিক স্বেচ্ছাসবী সংগঠন লাশ দাফন, করোনা রোগীদের পরিবহন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার কার্যক্রম আঞ্জাম দিচ্ছে। চট্টগ্রামের আল মানাহিল ফাউন্ডেশন এবং কিশোরগঞ্জের আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ. ফাউন্ডেশন তার অন্যতম।

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের বৃহত্তর স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠন আল মানাহিল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এখন পর্যন্ত ২২০ জনেরও বেশি লোককে দাফন করা হয়েছে যার মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি নিশ্চিত করোনা ইফেক্টেড ছিল। সংগঠনটির পরিচালক মাওলানা ফরিদ উদ্দীন জানিয়েছেন এ তথ্য।

এদিকে কিশোরগঞ্জের আনোয়ার শাহ রহ. ফাউন্ডেশন এখন পর্যন্ত দাফন করেছেন করোনায় প্রাণ হারানো ২৬ জনের লাশ। এছাড়া করোনার উপসর্গ বা করোনা সন্দেহে মৃত শতাধিক লাশ দাফন করা হয়েছে এ সংগঠনটির পক্ষ থেকে।

সংগঠনটির সদস্য সচিব এবং কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়ার মুহাদ্দিস হাফেজ মাওলানা শোয়াইব আবদুর রউফ জানান, চলমান পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে তারা কাজ করছেন। ২৩ জনের সদস্য তাদের কার্যক্রমে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। যার দু’জন মহিলা। এখন পর্যন্ত সদর উপজেলা কেন্দ্রীক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শিগগিরই কিশোরগঞ্জের সকল উপজেলায় কার্যক্রম বিস্তৃতি করার কথা জানান মাওলানা শোয়াইব আহমদ।

করোনা শনাক্ত হলে যেসব বাড়ি লকডাউন করে দেওয়া হয় সেসব বাড়িতে আনোয়ার শাহ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে খাবার এবং অন্যান্য সহযোগিতা পৌঁছে দেওয়ার কথাও জানানো হয় সংগঠনটির দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে।

আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ রহ. ফাউন্ডেশন মূলত শিক্ষা গবেষণা এবং সামাজিক সেবমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

অপরদিকে চট্টগ্রামের আল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনটির প্রতিষ্ঠা ১৯৯৭ সালে। নানুপুরের পীর সাহেব নামে পরিচিত আল্লামা শেখ জমিরুদ্দীন রহ.-এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি জনসেবামূলক অনেক কাজ করে আসছে। করোনাকালী দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবী এ সংগঠনটির কার্যক্রম চট্টগ্রামে বেশ সাড়া ফেলেছে।

সংগঠনটির পরিচালক মাওলানা ফরিদুদ্দীন জানান, লকডাউনের শুরুর দিকে সংগঠনের পক্ষ থেকে ব্যাপক পরিসরে খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এবং রমযানে ইফতার সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এরপর চট্টগ্রামে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে লাশ দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সিভিল সার্জন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে আমরা একাজ পরিচালনা করছি।

জানা গেছে, করোনা রোগীদের যাতায়াতের জন্য আল মানাহিল সংগঠনের পক্ষ থেকে এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে সাধ্যানুযায়ী ফ্রি অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।

মাওলানা ফরিদুদ্দীন জানিয়েছেন, আল মানাহিলের পক্ষ থেকে একটি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেট হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতালটি চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।

পূর্ববর্তি সংবাদঘোর দুর্দিনে দেশের পর্যটনখাত
পরবর্তি সংবাদমাস্কসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ টিআইবি’র