সাঈদ হুসাইন ।।
চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস একের পর এক আঘাত হেনেছে সারা বিশ্বে। পৃথিবীর কোন দেশই এই প্রাণঘাতি মহামারির থাবা থেকে বাঁচতে পারেনি। ছোট-বড়, উন্নত-অনুন্নত প্রায় সব দেশই এই অদৃশ্য শত্রুর নিরব আক্রমনে দিশেহারা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বের সব মোড়ল রাষ্ট্র। অতি সতর্কতা আর কড়াকড়ি আরোপ সত্ত্বেও করোনা হানা দিয়েছে সব রাঘব-বোয়ালদের আস্তানায়। প্রযুক্তি, মেডিসিন এবং বিজ্ঞানের উৎকর্ষের গর্বে স্ফীত নগর ও রাষ্ট্রগুলো ছোট্ট একটি জীবাণুর কাছে চরম অসহায় হয়ে পড়েছে।
অনিবার্যভাবেই এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। করোনার তাণ্ডবে বিশ্ব অর্থনীতি আজ লণ্ডভণ্ড। অধিকাংশ দেশের অর্থ পরিস্থিতিতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। গোটা বিশ্বজুড়ে চলছে অর্থনৈতিক মন্দা। দেশে দেশে মানুষ চরম দারিদ্র্যের জীবন যাপন করছে। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কোটি কোটি লোকজন দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। চাকুরি হারিয়ে বেকারত্বের শিকার লক্ষ লক্ষ অসহায় যুবক।
দেশ-বিদেশের হাজার হাজার শিল্প-কারখানা ও মিল-ফ্যাক্টারির উৎপাদন কার্যক্রম একরকম বন্ধ। এই অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে কত বছর সময় লাগবে তা হিসাব করতে বিশেষজ্ঞরা হিমশিম খাচ্ছেন। এরই মধ্যে ব্যবসাপাতি গুটিয়ে নিয়েছে বহু শিল্পপতি ও ধনকুবের মালিকরা। কর্মী ছাটাই আর বেতন-ভাতা বন্ধ করে সরে পড়েছেন অনেকে।
গোটা বিশ্বের এ অর্থনৈতিক সংকটে বিশ্ববাসীর সামনে মানবসেবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তানের অধিবাসী নজিবুল্লাহ সিদ্দিকী। দশকের পর দশক ধরে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ হিসেবে পরিচিত আফগানিস্তানের বাসিন্দা মো. নজিবুল্লাহ একজন সাধারণ কারখানার মালিক।
নজিবুল্লাহ আফগানীর একটি গ্যাস ফ্যাক্টারি ছিল। সাত বছর যাবত তা বন্ধ থাকে। কিন্তু করোনার এই সঙ্কটকালে মানুষের পাশে দাঁড়াতে এতদিনের বন্ধ কারখানাটি তিনি পুনরায় চালু করেছেন। নিজের কারখানায় তৈরি করা সিলিন্ডারে বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করছেন রোগীদের কাছে। হাসপাতালেও সরবরাহ করছেন নামমাত্র মূল্যে।
আফগানিস্তানের বাজারে প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য দুই হাজার আফগানী। করোনার প্রকোপ বাড়লে চিকিৎসাকেন্দ্রে গ্যাস সঙ্কট দেখা দেয়। রোগীদের চাহিদা মেটাতে পারছে না দেশের হাসপাতালগুলো। ফলে সামর্থহীন ও মধ্যবিত্তদের জীবন আরো হুমকির মুখে পড়েছে। তাই নজিবুল্লাহ করোনা রোগীদের মাঝে ফ্রী অক্সিজেন সিলিন্ডার বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ছোট-বড় মিলে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার গ্যাস সিলিন্ডার সাপ্লাই দিচ্ছে তার ফ্যাক্টিরি। যারা তার শিল্প কারখানাতে সিলিন্ডার নিয়ে আসেন তিনি তাদেরকে গ্যাস সরবরাহ করছেন। আর বাদ-বাকি সব সিলিন্ডার তিনি রোগীদের জন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। সাধারণ মানুষের জন্য দুই হাজার আফগানির সিলিন্ডার তিনি মাত্র তিনশ আফগানিতে বিক্রি করছেন।
এই চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মাঝেও কেন ফ্রি অক্সিজেন সেবার এই মহৎ উদ্যোগ নিয়েছেন তা জানতে চাইলে নজিবুল্লাহ বলেন, “চোখের সামনে স্ত্রীকে মরে যেতে দেখে কাদঁছিলো এক ব্যক্তি। অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুবরণ করে ঐ নারী। আমি এটা দেখে সহ্য করতে পারিনি। তাই পুনরায় আমার বন্ধ থাকা কারখানাটি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরপর নামমাত্র মূল্যে ফ্রী গ্যাস সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এ লক্ষ্যেই দিন-রাত কাজ করছি। ”
যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে চরম বিপর্যস্ত একটি দেশের একজন সাধারণ ব্যবসায়ী মানব-সেবার যে বিরল নজির স্থাপন করলেন তা থেকে বিশ্বের ধনকুবেরদের শেখার আছে অনেক কিছু। নজিবুল্লাহ যেখানে দুর্দিনে সবকিছু ফ্রি করে দিয়ে মানবসেবায় এগিয়ে এসেছেন সেখানে আমাদের দেশের বড় বড় বিত্তশালী ও শিল্পপতিরা যেন গা ঢাকা দিয়েছে। করোনার এই ভয়াবহ সঙ্কটকালে নজিবুল্লাহ নিজের সামর্থ নিয়ে জাতির পাশে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন তাতে আমাদের দেশেরধনী মানুষদের শেখার আছে অনেক কিছু।
আমাদের একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা তো পণ্যের দাম দ্বিগুণ করে জনগণের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা!
নজিবুল্লাহ আফগানীর কাছ থেকে আজ আমাদের সবার শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। প্রত্যেকে নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত। যে সমস্ত ধনী লোকজন এ কঠিন সময়ে আশপাশের গবিরদের থেকে চোখ-কান বন্ধ করে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে চলে গেছেন তাদের নজিবুল্লাহর অনুসরণে মানবসেবায় নেমে আসা উচিত।
এই মহা-সঙ্কটকালে মানবতার সেবায় এগিয়ে এসে মানুষের ভালোবাসা জয় করেছেন নজিবুল্লাহ সিদ্দিকী। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের মানবসেবার এ ঘটনা আমাদের অন্তরে আলোড়ন সৃষ্টি করুক- এই প্রত্যাশা।
















