সমকাম: আমাদের তরুণ-তরুণীদের ভয়াবহ মগজধোলাই

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর।।

গত কয়েকদিনে ফেসবুকে সমকাম নিয়ে গোটা দু-তিন লেখা লিখেছিলাম। তার মধ্যে একটি লেখা আমার এক বন্ধু ফেসবুকে নিজের ওয়ালে শেয়ার করেন। বন্ধুটি আলেম এবং বর্তমানে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তো, একদিন পর একটি নোটিফিকেশনের সুবাদে আমি বন্ধুর ওয়ালে গিয়ে আমার শেয়ারকৃত পোস্টটি দেখি এবং অবাক হই।

শুধু অবাক নয়, আমি রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে যাই ওই শেয়ারকৃত পোস্টের নিচে কমেন্টগুলো পড়ে। ওই পোস্টের নিচে যারা কমেন্ট করেছেন তাদের অধিকাংশই আমার বন্ধুর বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষিত সমাজের নানা বয়সী বন্ধু-বান্ধবী। তাদের অধিকাংশের বক্তব্য ছিল এমন—সমকাম এটা দুজন মানুষের পরস্পরের সম্মতিতে হলে সেখানে কারো নাক গলানো উচিত নয়। কেউ বলেছেন, বিষয়টা যার যার ব্যক্তিস্বাধীনতার ব্যাপার, কারো ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা অন্যায়। আবার অনেকে বলেছেন, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলাটা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এমন আরও নানাধর্মী সহমর্মিতামূলক কমেন্টে জেরবার ছিল ওই পোস্টটি। আমার লেখায় সমকামের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য ছিল বিধায় মন্তব্য-প্রতিমন্তব্যে আমার বন্ধুকেও যথেচ্ছ তুলোধুনা করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো, ওই পোস্টে যারা কমেন্ট করেছেন তাদের সকলেই কি অমুসলিম বা নাস্তিক? না, ওখানে যারা কমেন্ট করেছেন তাদের প্রায় সকলেই মুসলিম পরিবারের সন্তান, নাম দেখে অন্তত তাই মনে হলো। আবার অনেকে প্র্যাকটিসিং মুসলিমও, হতে পারে। তবে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ওই পোস্টে দেখলাম, আমার বন্ধুর বান্ধবী গোত্রের বেশ কয়েকজন মেয়েবন্ধুও সমকাম বিষয়টা সমর্থন করে মন্তব্য করেছেন। তাদের অনেকের ছবিতে দেখা গেল তারা হিজাব পরিহিতা। মানে ধর্মকর্মের সঙ্গে কিছুটা হলেও চিন-পরিচয় আছে। এটা দেখে আমি আরও মুষড়ে গেলাম।

দুই

ইসলামের এমন একটি কঠোর শাস্তিযোগ্য বিষয়ে মুসলিম তরুণ-তরুণী গোষ্ঠীর অজ্ঞতা এবং পাশ্চাত্যের কথিত মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি যে অন্ধ মোহ তৈরি হয়েছে, এগুলো কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। আধুনিকতার জিগির তুলে ধীরে ধীরে, বিগত ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে এই মানসিকতা টিভি, নাটক-সিনেমা, বই-পত্রিকা, অধুনা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের মগজধোলাই করা হয়েছে।

পাশ্চাত্যের অনেক অমুসলিম দেশে সমকামকে স্বাভাবিক যৌনতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। কোনো কোনো দেশে এ ধরনের অপকর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংহত করা হয়েছে। আবার সেলিব্রেটি নামের অনেক পাপাচারী ব্যক্তিবর্গ ঢালাওভাবে এই কুৎসিত যৌনাচারকে প্রমোট করে যাচ্ছে। ফলে, আজকের আধুনিকমনা অনেক তরুণ-তরুণী এ ধরনের পাশ্চাত্য ফ্যান্টাসিতে ভোগেন। পাশ্চাত্যের রুচি যেমন তাদের কাছে ভোগ্য তেমনি কুরুচিও দেদারছে গলাধঃকরণ করেন। এরা পাশ্চাত্যের শেকলপরা আধুনিক দাসগোষ্ঠী। পাশ্চাত্যের লোকজন যেটা সমর্থন করবে তাকেও সেটা সমর্থন করতে হবে। সিরিয়াল, সিনেমা, খেলাধুলা, প্রযুক্তিবিদ সেলিব্রেটিরা যেটা সমর্থন দেবে তারাও বিনাদ্বিধায় সেটা সমর্থন করবে। এটা একটা ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে আজকাল। বলতে দ্বিধা নেই, সমকাম বিষয়টাকে সমর্থন এবং প্রমোট করাটাও এখন নিজেকে আধুনিকমনা হিসেবে জাহির করার ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।

সিরিয়াল-সিনেমা এখন তো আমাদের সমাজে ডালভাত। সমকামকে প্রমোট করার সবচে বড় হাতিয়ার পাশ্চাত্যের এসব সিরিয়াল-সিনেমা। পাশ্চাত্য এবং পাশ্চাত্যের স্পর্শধন্য হলিউড-বলিউডের সিনেমাগুলোতে সমকাম বিষয়টাকে এখন একেবারে স্বাভাবিক একটি অনুষঙ্গ হিসেবে দেখানো হয়। এটি সমাজ বহির্ভুত কোনো অপরাধ নয়, বরং মানুষের স্বাভাবিক যৌনচাহিদা—এমন বার্তা থাকে অধিকাংশ সিরিয়াল-সিনেমাতে। এই বিষয়টি যখন একবার, দুবার করে শতবার আপনার সামনে প্রদর্শিত হতে থাকবে তখন আপনার মনেও বিশ্বাস পোক্ত হবে—এটি সত্যিই তেমন বড় কোনো অপরাধ নয়।

ধর্মীয় একটি পাপাচারকে এই যে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং আমাদের মতো মুসলিম দেশের তরুণ-তরুণীদের মনের মধ্যে সেটাকে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবেই গ্রহণ করার যে আগ্রহ, এটি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত। ধর্মের চেয়ে যখন পাশ্চাত্য বিশ্বাস, রীতি-নীতি, জীবনাচার, মতাদর্শ তাদের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হবে তখন আপনি ধর্মের শত কথা বলেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। বন্ধুর ওই পোস্টের কমেন্ট পড়ে আমার কাছে এমনই মনে হলো।

তিন

তাহলে তাদের কাছে ধর্মের জায়গা রইল কোথায়? আসলে আধুনিক এই তরুণ-তরুণীদেরও দোষ দিয়ে তেমন কোনো উপকার নেই। তারা দিনের বেশিরভাগ সময় কাটাচ্ছে পাশ্চাত্যের আলো-বাতাসে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মোহে। সেখানে ধর্মের সঙ্গে তাদের দেখাশোনা শুক্রবারের জুমার নামাজ, রমজানের রোজা আর বড়জোর মিলাদ-মাহফিল। এর বাইরে ধর্মের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বড় একটা হয়ে উঠে না। আবার অনেকে হয়তো নামাজ-কালাম ঠিকমতোই আদায় করে কিন্তু পাশ্চাত্যের মোহ তাদের মগজ এমনভাবে ধোলাই করেছে যে সেখানে ধর্মের চেয়ে পশ্চিমা বিশ্বাসের অবস্থান অধিক জোরালো। সুতরাং ধর্ম যা বলবে তার আগে তারা বিশ্বাস করবে যে পাশ্চাত্য সেখানে কী বলেছে!

আরো পড়ুন: কলম্বাস থেকে রবার্ট ক্লাইভ: ইতিহাস কখন যে কাকে পথে নামায়

এই তরুণ-তরুণীদের জন্য কিছু আবশ্যিক জ্ঞাতব্য বিষয় জানানো আমাদের কর্তব্য। বিশেষত ধর্ম এবং পাশ্চাত্য বিশ্বাস যখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে তখন তাদের হাত ধরে ধর্মের সঠিক পথে পরিচালনার দায়িত্ব আমাদেরই। ছিঃ ছিঃ বলে তাদের তাড়িয়ে দেয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি নাস্তিক-অধার্মিক বলে তাদের গালমন্দ করারও সময় নেই। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। কেউ ইসলাম থেকে দূরে সরে গেলে তাকে ইসলামের দলিল-প্রমাণ দিয়ে আরও দূরে সরিয়ে দেয়া কখনো ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। বরং যে যত দূরে সরে যাচ্ছে তাকে তত বেশি কাছে টেনে নেয়ার কোশেশের নামই ইসলাম।

চার

মনে রাখতে হবে, ইসলামের ভিতরে থেকে সমকামিতাকে সাপোর্ট করা এবং বিশ্বাস করা যে—এ ধরনের যৌনাচার দুজন ব্যক্তির পারস্পরিক বোঝাপড়ার ব্যাপার, আপনি/আমি কেন প্রতিবাদ করব? আপনি/আমি তাদের বাধা দেয়ার কে?—ইসলামের মধ্যে এই ধরনের দ্বৈত বিশ্বাস রাখা যাবে না। ইসলাম যেটা হালাল বলেছে সেটাকে শতভাগ হালাল মনে করতে হবে, যেটাকে হারাম বলেছে সেটাকে কোনোভাবেই বৈধ মনে করার সুযোগ নেই।

ব্যাপারটা এইভাবে দেখুন, ইসলামের কোনো ফরজ বিধান ‘আদায়’ করতে না পারলে তার শুধু ফরজ তরকের গুণাহ হবে, কিন্তু কোনো ফরজ বিধান কেউ ‘অস্বীকার’ করলে তার ঈমান থাকবে না। কেউ একটা হারাম কাজ করল, সে গোনাহগার হবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু কেউ যদি ওই হারাম কাজটিকে হালাল মনে করে, বরং কখনো কখনো ‘মহান’ কাজ বলে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করে, তাহলে সেটা ঈমানের প্রশ্ন।

যেমন, কেউ নামাজ না পড়লে সে ঈমানহারা হবে না, কিন্তু সে যদি নামাজকে অস্বীকার করে তাইলে ঈমানহারা হয়ে যেতে পারে। যদি বলে যে, একজন মুসলিম হিসেবে রোজা রাখার দরকার নাই, রোজা একটা ফালতু ব্যাপার, অহেতুক না খেয়ে থাকার মধ্যে কী ফায়দা?—তাহলে একটি ফরজ বিধানকে অস্বীকার করার কারণে তার ঈমান চলে যেতে পারে।

কারণ, প্রতিটি ফরজ বিধান সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত। আল্লাহর বিধানকে অমান্য করা মানে আল্লাহকেই সরাসরি অমান্য করা। আল্লাহকে অমান্য করলে ঈমানের ভিত্তি ধ্বংস হয়ে গেল, তার মুসলমানিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেল।

একজন মুসলিম আল্লাহতে বিশ্বাস করবে আবার তার বিধানকে অস্বীকার করবে—এমনটা করা যাবে না! মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বে, মেয়েরা মাথায় হিজাব পরবে এবং একই সঙ্গে এটাও সমর্থন করবে যে LGBTQ-এর অধিকার মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার! ইসলামের মধ্যে এমন দ্বিচারিক বিশ্বাসের সুযোগ নেই। আল্লাহর বিধানকে ব্যক্তিস্বাধীনতার ফাঁকা বুলির নিচে পদদলিত করে নিজেকে মুসলিম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আল্লাহই বলেছেন, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো। আট আনা বিশ্বাস করে আর আট আনা অবিশ্বাস করে মুসলমানিত্ব রক্ষা করা যাবে না।

আরো পড়ুন: ডিয়ার ডিপ্রেশন, তোমাকে স্বাগতম

ইসলামে শতভাগ বিশ্বাস করতে হবে। কেউ পরিপূর্ণভাবে ইসলামের বিধি-বিধান মানতে না পারলে সেটা আল্লাহ দেখবেন, কিন্তু ঈমানের আবশ্যিক বিষয়ে বিশ্বাস তাকে শতভাগ রাখতে হবে। এখানে কোনো ছাড় নেই। সারা জীবন নামাজ না পড়লেও কেউ কাফের হবে না, কিন্তু পায়ুকামের পক্ষে অবস্থান নিলে বা নিরব সমর্থন দিলে অথবা এ ব্যাপারটিকে সমর্থন করে কিছু লিখলে সেটি আল্লাহর বিধানকে সরাসরি অস্বীকার করার সমতুল্য।

মনে রাখতে হবে, ইসলাম বিশ্বাসের ধর্ম, কেবল আচরিক প্র্যাকটিসের ব্যাপার না। নামাজ পড়লাম, রোজা রাখলাম, হিজাব পরলাম আবার LGBTQ অধিকারের ব্যাপারেও সমর্থন দিলাম—এগুলো সরাসরি আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ। আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবি করা বোকামি ছাড়া আর কী হতে পারে

পূর্ববর্তি সংবাদভ্রুণ হত্যার অভিযোগে নোয়াখালীতে চিকিৎসকসহ গ্রেফতার ৪
পরবর্তি সংবাদকরোনা থেকে সুস্থ হলেন নিম্ন আদালতের ৩৫ বিচারক