কামাল আতা তুর্ক: আয়া সোফিয়াকে যে বিতর্কিত ব্যক্তি জাদুঘর বানিয়েছিল

আবু নোমান ।।

ঐ ক্ষেপেছে পাগলি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই….

ছোট বেলায় পাঠ্য বই থেকে দুর্ভাগ্যক্রমে যে সব ভুল শেখা হয়েছে, বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি, কামাল আতা তুর্ক সম্পর্কে আমাদের জানাশোনাটা সেই সব ভুলের অন্যতম। বড় হয়ে অনেক দিন পর্যন্ত প্রশ্ন ছিল,  যে লোক সম্পর্কে এমন কবিতা পড়লাম সেই লোক কি করে এমন ইসলাম বিদ্বেষী হয়? কি করে আজান নিষিদ্ধ করে? আরবী অক্ষর নিষিদ্ধ করে? হিজাব নিষিদ্ধ করে? মসজিদকে জাদুঘরে পরিণত করে?

তার জন্ম বংশ সম্পর্কে কী জানা যায়
১৯ মে ১৮৮১ সালে জন্ম হয় ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত কামাল আতাতুর্কের। কামাল আতাতুর্কের পিতা ছিলেন আলী রেজা এফেন্দী এবং তার মা ছিলেন জোবায়দা হানিম।এটা নিয়ে প্রচন্ড সংশয় রয়েছে যে কামালের আসল জাতিগত পরিচয় কোনটি।

কামালের পিতা আলী রেজা এফেন্দি নৃতাত্ত্বিকভাবে ছিলেন আলবেনীয় স্লাভিক।যদিও তার জন্ম হয় কোদযাদিকে,যা একটি তুর্কি বসতিপূর্ণ শহর ছিলো।উসমানীয় খিলাফাতের সময় আলী এফেন্দি একজন বর্ডার গার্ড হিসেবে চাকরী নেন এবং জোবায়দা হানিমকে বিয়ে করেন।যদিও জানা যায় জোবায়দা খুবই ধর্মপ্রাণ ছিলেন তবে কামালের পিতা ছিলেন আলাভি শিয়া এবং ইসলামী শাসন বিদ্বেষী।

অনেকে ঐতিহাসিকই তাকে খাজার ইহুদী বংশদ্ভূত বলে অভিহিত করেছেন।জোবায়দা হানিম চেয়েছিলেন তার সন্তানকে ইসলামিক শিক্ষায় শিক্ষা দিতে কিন্তু তার পিতা তাকে পশ্চিমা শিক্ষাপ্রদানকারী স্কুলে ভর্তি করেন।কামালের ৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।তবে কামালের সাথে তিনি সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন এবং কামালের জীবন গড়ার মূল ফাউন্ডেশনে তিনি ছিলেন।তাই চিরাচরিত সুন্নী মুসলিম তুর্কিদের সাথে কামালকে নামাজ কালাম আদায়ে দেখা যেত না।

কামালের ব্যক্তিজীবন ছিল খুবই অন্ধকারাচ্ছন্ন

কামালের ব্যক্তিজীবন ছিল খুবই অন্ধকারাচ্ছন্ন। তিনি অতিশয়  মদপানে আসক্ত ছিলেন। দৈনিক এক থেকে দেড় লিটার মদ না খেলে তার হত না। মদের পাশপাশি ছিলেন সীমাহীন ধুমপায়ী। ব্যক্তিগত জীবনে নিজ কোলে বড় হওয়া চাচত বোনের সাথে তার ছিলো সম্পর্ক।পরবর্তীতে তিনি ততকালীন তুরস্কের বেহায়াতম মহিলা লতিফে উশাকলিগলিকে বিয়ে করেন। আধুনিকতার নামে যৌন উদ্দীপনাপূর্ণ ড্রেস পড়ে রাস্তায় ঘুরা ও মহিলাদের বোরখা ও হিজাব খুলে ফেলে আধুনিকতা শিক্ষা দেয়ার বিষয়ে এই মহিলার বেশ নামডাক ছিল বলে জানা যায়। তবে সাংসারিক ও যৌন জীবনে লতিফেকে নিয়ে কামাল সুখী ছিলেন না। বিয়ের কয়েক বছর পরেই অজানা কারনে ডিভোর্স হয়ে যায়। এবং এ সম্পর্ক নিয়ে তিনি কখনোই মুখ খোলেননি। কামালের সাথে তার একান্তে কাটানো সময় খুব কম। এবং মূলত ঝগড়াই বেশি হত।

কামালবিরোধীরা কামালকে গে (সমকামী) হিসেবে ধারণা করে থাকেন। কামাল তার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে সুন্দর সেনাদেরকে তার ভিলাতে রাখতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে তার স্ত্রী যৌনতা বা আধুনিকতা যে কারণেই হোক পার্টিতে পার্টিতে থাকতেন বলে শোনা যায়।

কীভাবে মৃত্যু হয় কামালের

মদপান, ধুমপান, উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত কামাল শেষ জীবন প্রচন্ড কষ্টে পার করেন। বার্ধক্যে নানান কঠিন ও জটিল রোগে ভোগেন। অজানা রোগে তার লিভার পচে যায়।স্বাস্থ্য বিগড়ে কাদাকার হয়ে চেহারা ও শরীর অমানবীয় অবস্থা  ধারন করে বলে শোনা যায়। অবশেষে ১০নভেম্বর ১৯৩৮সনে তার মৃত্যু হয়। বলা হয়, মৃত্যুর পর আপনজন ছাড়া সাধারণ মানুষকে তার লাশ দেখানো হয়নি।

কামাল আসলেই কি বীর ছিলেন?

বলা হয়, কামাল বাহাদূর ছিলেন। কিন্তু এখানেও অনেক  ঐতিহাসিক আপত্তি তুলেছেন।  তিনি আসলেই কি বীর ছিলেন? বলা হয়, তিনি মূলত যুদ্ধের সময় টেলিকমিউনিকেশন এর কাজ করতেন।গালিপলির যুদ্ধে নির্বোধের মত ৫৭ তম আনাদুলু রেজিমেন্টকে তিনি নিশ্চিত শত্রু গোলাবর্ষণের সামনে মেশিনগান সম্বলিত ট্রেঞ্চ এটাক করার হুকুম দেন।যার ফলে ৫৭ রেজিমেন্টের সকল সৈন্যই নিহিত হয়।একই ভাবে বিভিন্ন সময়ে তিনি বিভিন্ন দলকে শত্রুদের জাহাজের গোলাবর্ষণের সামনে ফেলে ধ্বংস করেন।তিনি ইরাক থেকে সৈন্যবাহিনীকের রিট্রিট করান এবং দামেস্ক গ্যারিসনকে ভুল তথ্য দিয়ে রিট্রিট করিয়ে ফিলিস্তিন,সিরিয়াকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেন।তিনি বিভিন্ন সময় এমন চিঠি লিখেছেন যার কোনো হদীস পাওয়া যায়নি।যদিও চিঠি সবসময় সেনাবাহিনীর চিঠি দপ্তরের মাধ্যমে পাঠানোই নিয়ম। কিন্তু তিনি যুদ্ধের সময় একবারও তার পরিবারকে চিঠি লেখেননি।ধারনা করা হয় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের সাথে তার সখ্যতা ছিলো।

গালিপলিতে তার অকর্মণ্যতা সত্ত্বেও তুর্কি মুসলিমদের সাহসীকতায় ও ইমানী দৃঢ়তায় জয়লাভ করে তুরস্ক।তাকে পরে পাঠানো হয় উত্তরের ককেশাস ফ্রন্টে। সেখানে তিনি যখন পৌছায় সেসময় তুর্কিদের পরাজয় দ্বারপ্রান্তে।ঠিক এসময় ক্রিপ্টো-জিও লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লবে জার পরিবারকে হত্যা করা হয় এবং একইসাথে রণে ভঙ্গ দেয়া হয়।ব্রিটিশ এবি ফরাসী শক্তি এসময় তুর্কিদের ভূমি কেড়ে নিয়ে তাদের আবার মধ্য এশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা করে যাতে করে ইউরোপকে ইসলামের নাগালের বাইরে রাখা যায়।এসময় কামাল উসমানীয় সুলতানকে অপসারণ করেন এবং নির্বাসন দেন।ব্রিটিশ ও ফরাসী সমর্থনে গ্রীক সেনারা যখন তুরস্ক আক্রমণ করে তখন সেনাবাহিনীর মার্শাল হয়েও ফ্রন্টে তাকে দেখা যায় না।তিনি ভীরুতার সাথে তার ফ্রিম্যাশনিস্ট সহযোগী ইসমত ইনোনুকে পাঠান।

আরো পড়ুন: ৮৬ বছর পর আয়া সোফিয়ায় আজান শুনতে পেয়ে খুশিতে মেতে উঠে তুর্কিরা

কামালের কাপুরুষতা ও যুদ্ধে অপারগতার সর্বোচ্চ প্রমাণ সাখারিয়ার যুদ্ধ যেইযুদ্ধে তুর্কি বাহিনীর প্রায় ৭৫% অফিসার মারা যায়।এরা প্রায় সবাই ছিলো প্রাক্তন উসমানীয় সেনা।এভাবে করে তাকে বাধা দেয়ার মত সকল মুসলিম অফিসারকে হত্যা করা হয়।নির্দিষ্ট কো-অর্ডিনেট ছাড়া, ফ্রেইন্ডলি ফায়ারে নিজের সেনাকে নিজেই হত্যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।গ্রীক বাহিনী রিট্রিটের পর কোন যুদ্ধ ছাড়াই তিনি ইস্তানবুল দখল করেন ব্রিটিশদের কাছ থেকে।যা কল্পনা করা অসম্ভব।কেনই বা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার ব্রিটেন কোনো যুদ্ধ ছাড়াই ইস্তানবুল দান করে দেন? তার কারন হলো ১৯২৪ সালে ইসলামের শেষ খলিফা আব্দুল মজিদকে অপসারণ করে কামাল।ব্রিটেন জানত,খলিফা থাকা মানেই মুসলিমরা একতাবদ্ধ। আজ না হয় কাল তারা আবার শক্তি ফিরে পাবে। তাই তাদের একতা ধ্বংস করতে খলিফ অপসারণ ছিলো খুবই প্রয়োজনীয়। বাকি সেক্যুলার তুর্কি গঠনের জন্য কামালের শয়তানী কীর্তি সবই প্রসিদ্ধ।