খ্রীস্টানদের মধ্যে ব্যাপকভাবেই রয়েছে উপাসনালয় বিক্রি করে দেওয়ার চর্চা

তারিক মুজিব ।।

তুরস্কের ঐতিহাসিক স্থাপনা আয়া সোফিয়াকে ৮৬ বছর পর পুনরায় মসজিদে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে অন্যতম আলোচিত ইস্যু। পশ্চিমের বুদ্ধিবৃত্তিকতার জায়গা থেকে এরদোগান সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হচ্ছে। অবশ্য রাজনৈতিকভাবে এই ইস্যুতে এখনও কোনো রাষ্ট্রকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ের বিরোধিতা দেখা যায়নি।

কারণ ১৯৩৪ সালে মসজিদকে জাদুঘরে রূপান্তর করার সিদ্ধান্তকে বাতিল ঘোষণা করে তুর্কি সর্বোচ্চ আদালত বর্তমানে যে রায় প্রকাশ করেছে তা আইনত যুক্তিসঙ্গত। আইনি এ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার শক্ত কোনো দলিল-দস্তাবেজ পশ্চিমাদের হাতে নাই।

এ ঘটনার সমালোচনায় লিপ্ত হয়ে বরং কেচু খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে বিরোধীতাকারীদের। দেখা যাচ্ছে, অর্থাভাবে পড়ে খ্রীস্টানদের চার্চ বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। প্রাচীনতম গীর্জা আয়া সোফিয়াকে ক্রয়-বিক্রয়ের করে দেওয়ার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের বিভিন্ন রকম মত থাকলেও চার্চ বা গীর্জা বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা পশ্চিমে এখনও চলমান। অনলাইনে হরহামেশায় চার্চ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়।

আরো পড়ুন: ফিরে দেখা।। তুরস্কে সেনা অভ্যুত্থান: ক্ষমতাসীনরা কী শিক্ষা নিতে পারেন

মসজিদ আল্লাহর ঘর। কোনো স্থানকে মসজিদের জন্য নির্ধারণ করা হলে তা কিয়ামত পর্যন্ত মসজিদ থাকে। ইসলামে মসজিদ বিক্রির অনুমতি নেই। মসজিদকে অন্যকিছুতে রূপান্তরও বৈধ নয়। তাই আয়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে নির্ধােণের পর তা জাদুঘরে রূপান্তর ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ। আইনত এবং ধর্মীয় উভয় বিবেচনায়।

চার্চ বা উপাসনালয় বিক্রি করে দেওয়ার ব্যাপারে খ্রিস্টানদের ধর্মীয় বিধান জানা নেই তবে খ্রীস্ট ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে এই চর্চা বিদ্যমান। চার্চ কর্তৃপক্ষ অর্থাভাবে পড়ে এগুলো বিক্রি করে দেন। তা কিনে কেউ বসবাসের কাজে ব্যবহার করে কেউ মিউজিয়াম বানায় কেউ নিজ নিজ ধর্মের উপাসনালয় বানায়। সম্প্রতি ইউরোপে এবং খ্রীস্টান দেশগুলোতে এমন অনেক মসজিদ হয়েছে যেটা খ্রীস্টানদের চার্চ কিনে বানানো হয়েছে।

নিউইয়র্কের সাইরাকুসে অবস্থিত মসজিদে ঈসা ইবনে মারয়াম। দীর্ঘদিন পর্যন্ত এটি চার্চ ছিল। স্থানীয়দের উদাসীনতার কারণে কয়েক বছর আগে এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে স্থানীয় মুসলিমরা কয়েকজন মিলে চার্চটি ক্রয় করে মসজিদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। এখন সেখানে নিয়মিত নামায আদায় হয়। মসজিদের পাশেই ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার গড়ে উঠেছে। মুসলিমরা এখানে এসে ধর্মীয় বিষয়ে পড়াশোনা করে।

 

খ্রীস্টানদের তীর্থভূমি খ্যাত রুমের একটি মসজিদের নাম মসজিদ আল বেলাল। এটিও পূর্বে চার্চ ছিল। চার্চ কর্তৃপক্ষ থেকে কিনে মসজিদের জন্য ওয়াকফ করে দেন আমিরাত প্রবাসী বেলাল। এই মসজিদের পাশেও একটি ইসলামি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

মোটকথা অর্থাভাবে পড়ে বা অন্য কারণে চার্চ বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনা বিরলও নয় নতুনও না। অধিকন্তু পরিচালনার খরচ যোগাতে জার্মানিতে মুসলমানদের কাছে জুমআ এবং ঈদের নামাযের জন্য চার্চ ভাড়াও দেওয়া হয়। অতএব আয়া সোফিয়া মসজিদ নিয়ে পশ্চিমের বিতর্ক স্ববিরোধী।

কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ভাষ্যমত অনুযায়ী নিজেদের ধর্মীয় একটি ঐতিহাসিক স্থাপনাকে বিক্রি করে দেওয়ার ব্যর্থতা তাদের কাছে অপরাধ নয়। বরং মুহাম্মদ আল ফাতিহ কেনো তা কিনে মসজিদে রূপান্তর করলেন এটাই তাদের সমালোচনার বিষয়।

আরো পড়ুন: যুগে যুগে দেশ দখলের পর খৃস্টানরা অন্যদের ইবাদতখানা কী করত!

তদ্রুপ মুসলমানদের ওয়াকফিয়া সম্পত্তি আয়া সোফিয়াকে অন্যায় এবং অবৈধভাবে জাদুঘরে পরিণত করা নিয়ে সমালোচনার পরিবর্তে নিজেদের অধিকার আদায়ে তুর্কিরা যখন পুনরায় এটিকে মসজিদে রূপান্তর করল তা নিয়ে শুরু হলো সমালোচনা। এটিই পশ্চিমের দ্বিচারিতা। এবং এটি তাদের চিরন্তন অভ্যাস।

কাফেরদের এবং তাদের অনুসারীদের এ দ্বিচারিতার ব্যাপারে কুরআন আমাদেরকে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। “আহলে কিতাবদের কাছে যখন সত্য (কিতাব) উদ্ভাসিত হয় তখন তারা সে সত্যকে গভীরভাবেই উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু তারা সে সত্যকে সবসময় গোপন করে।”

আরো পড়ুন: আয়া সোফিয়ার মসজিদে প্রত্যাবর্তন, ইতিহাস ও ইসলামের আয়না

পূর্ববর্তি সংবাদস্বাস্থ্যখাতের অস্থিরতা বিষয়ে জাহিদ মালেক: ‘অজস্র চুক্তি হয়, মন্ত্রীরা এসব পড়ে দেখেন না’
পরবর্তি সংবাদকরোনায় মৃতদের কাফন-দাফনে খুলনায় খেদমতে খলকের প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত