মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরীর শেষ জীবনের একটি সাক্ষাৎকার

 

        ২২ শাবান ১৪৪১ হি. মোতাবেক ২১ এপ্রিল ২০২০ খ্রীষ্টাব্দ । দারুল উলূম দেওবন্দের সাবেক শাইখুল হাদিস ও সদরুল মুদাররিসিন হযরত মাওলানা মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী রা. তখন বোম্বেতে অবস্থান করছেন । তার খাস মেযবান জনাব হাফেয আসিফ সিদ্দিকী সাহেবের “কারিশমা এপার্টমেন্ট” জুগেশ্বরীর বাসায় । সেখানের এক মজলিসে দিলখুলে নিজের ছাত্র জীবনের কিছু স্মৃতিচারণ করেন । যাতে রয়েছে উলামা তালাবাদের জন্য শিক্ষণীয় অনেক উপাদান । রেকর্ডার থেকে সেগুলোকে পত্রস্থ করেন মুফতি সাহেব রা. এর একজন খাঁটি ভক্ত মৌলবী মুহাম্মাদ সাঈদ পালনপুরী । পরবর্তীতে তা “মাসিক আরমুগান” ২০২০ এর জুন সংখ্যায় প্রকাশিত হয় । সাক্ষাতকারটি  অনুবাদ করেছেন হযরতপুর মাদরাসা আলী ইবনে আবি তালিব রা.-এর মুদাররিস মাওলানা মুশতাক আহমাদ। 

 

…শরহে বেকায়া কিতাবের চারও খন্ড নিজে মুতালাআ করে হল করেছি । তারপর “হুসাইন বখশ মাদরাসায়” শরহে বেকায়া কিতাবের পরীক্ষা দিয়ে হেদায়া জামাতে ভর্তি হই । এমন যোগ্যতা নিচের জামাতগুলো থেকে অর্জিত হয়ে থাকে । এখন আর এমন যোগ্যতা পরিলক্ষিত হয়না । মেশকাত, জালালাইন জামাতে যেয়ে পড়ালেখার আগ্রহ পয়দা হয় । কিন্তু “চড়ুই পাখি ক্ষেত সাবাড় করে ফেলার পর আফসোস করে লাভ কী?” যখন নিচের যোগ্যতাই অপরিপক্ক তখন উপরে কতটুকুইবা অগ্রসর হওয়া সম্ভব?

প্রশ্ন: এর কারণ কী?

উত্তর: এর বেশ কটি কারণ রয়েছে । একটি কারণ হলো প্রথম বর্ষ থেকে চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত অপরিপক্ক শিক্ষকগণ পাঠ দান করে থাকেন । যারা অসলে নিজেরাই ভালো করে পড়ালেখা করেনি । বর্তমানে এমন অযোগ্যদের হাতে  শিক্ষকতার মত গুরু দায়িত্ব অর্পণ করা হয় । আমাদের সময় দক্ষ এবং অভিজ্ঞ হেড মাষ্টার ছোটদেরকে পাঠদান করতেন । ছোটদের রুচি প্রকৃতি তারা খুব ভালো বুঝতেন । ছোটদেরকে পড়ানো এবং তাদের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার কলা কৌশল তাদের খুব ভালো রপ্ত ছিলো । আজকাল সবেমাত্র পড়ালেখা শেষ করে আসা কাউকে বাচ্চাদের শিক্ষক বানিয়ে দেয়া হয় । যে নিজেই ভাল করে পড়তে পারে না সে আবার বাচ্চাদের কী পড়াবে? একটি কারণ হলো এই । শিক্ষক যোগ্যতাবান এবং অভিজ্ঞ হলে ছাত্রদের বেশি বেশি অনুশীলন করান । বাচ্চাদেরকে সবক জিজ্ঞেস করেন । ছাত্ররা না পারলে কায়দা-কানুন রপ্ত করান । এখনকার শিক্ষকদের অতীতের পড়ে আসা বিষয়গুলোর কোন খোঁজ খবর থাকে না । যাই হোক একটি কারণ এই ।

দ্বিতীয় কারণ হলো ছাত্ররা নিজের জন্য পড়াশুনা করে না । বাবার জন্য পড়াশুনা করে । নিজের জন্য পড়াশুনা করার ফল যেমন হবে, বাবার জন্য পড়ার ফল তেমন হবে না । আমি আমার নিজের উদাহরণই দিই । “কালেরায়” মক্তবে পড়েছি । বাবার জন্য পড়েছি । বাবা ভর্তি করে বলেছিলেন যে পড়তে হবে । তাই পড়া । তারপর মামা “ছাপি” নিয়ে গেলেন । সেখানেও বাবার জন্য পড়েছি । তারপর “পালনপুরে” চার বছর পড়েছি । সেখানেও বাবার জন্যই পড়েছি । আসলে কিছুই পড়তাম না । ডং করতাম, খেলাধুলা করতাম আর শিক্ষকদেরকে ফাঁকি ‍দিতাম । শিক্ষদেরকে এভাবে ধোঁকা ‍দিতাম । “আলফিয়া ইবনে মালেক” পড়াতেন হযরত মাওলানা আকবর সাহেব । তিনি সবক শুনতেন না । তাই আমরাও সবক শিখতাম না । যখন তিনি সবক শুনা শুরু করলেন তখন আমরাও সবক শিখা শুরু করলাম ।

আমরা দুজন এক ক্লাসে পড়তাম । আমি আর উস্তাদজির ছেলে মৌলবী আব্দুল কাদের । কখনো সে তরজমা জিজ্ঞেস করে আসতো । আর কখনো আমি যেতাম । এভাবে আমরা সবক শিখতাম । এভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা ফাঁকি দেয়ার কৌশল পেয়ে গেলাম । আমরা দেখলাম যেদিন আমরা বারবার জিজ্ঞেস করে সবক ‍শিখি সেদিন আর ক্লাসে সবক জিজ্ঞেস করেন না । আর যেদিন বারবার জিজ্ঞেস করা হয় না সবকও শিখা হয় না । সেদিন আমাদেরকে সবক জিজ্ঞেস করেন । ব্যাস তখন থেকে আমরা ফয়সালা করলাম যে এখন থেকে উস্তাদজীকে বারবার সবক জিজ্ঞেস করে করে শুধু বিরক্ত করবো তাতে ক্লাসে সবক শুনানো থেকে বেচে যাব ।  তাই করলাম । আসলে আমরা নিজের জন্য পড়তাম না ।

মাওলানা বুখারি সাহেব বাবাকে পরামর্শ দিলেন আমাকে দেওবন্দে ভর্তি করার জন্য । তার কথামত বাবা আমাকে নিয়ে দেওবন্দের উদ্দেশ্যে বের হলেন । প্রথমে “পালনপুর” থেকে “মিটারগেজ”। তারপর ‍“দিল্লি” এসে গাড়ি পরিবর্তন করলেন । পথিমধ্যে কোন মাওলানা সাহেবের সাথে বাবার মোলাকাত হয়ে থাকবে হয়ত । এমুহুর্তে আমার ঠিক মনে নেই । তার সাথে আলাপচারিতায় আমার দেওবন্দে পড়তে যাওয়ার বিষয়টি উঠে আসলো । তিনি জানতে চাইলেন আমি কী পড়বো । বাবা বললেন “শরহে জামী” পড়ে এসেছে আবার “শরহে জামী” পড়বে । এ কথা শুনে তিনি বাবাকে পরামর্শ দিলেন যে তাহলে তাকে দেওবন্দে ভর্তি না করে সাহারানপুরে ভর্তি করুন । কারণ সাহারানপুরে “শরহে জামী” ভালো করে পড়ানো হয় । যে কথা সেই কাজ । বাবা দেওবন্দে না নেমে সোজা সাহারানপুর চলে গেলেন । আমাকে আবার “শরহে জামী” জামাতে ভর্তি করলেন । যাইহোক সেখানেও পড়লাম । সেখানে ক্লাসের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিলো । তাই ক্লাস ছুটি হতেই আমি সাইকেল নিয়ে বের হয়ে পড়তাম । সাইকেলের প্রতি আমার অদম্য আগ্রহ ছিলো । সাইকেলে করে পুরো সাহারানপুর চষে বেড়াতাম । হঠাৎ আমাকে টাইফয়েড পেয়ে বসলো । দুমাস টাইফয়েডে আক্রান্ত থাকায় তা মারাত্মক আকার ধারণ করলো । আমার টাইফয়েডে আক্রান্ত থাকার ‍দিনগুলোতে হযরত মাদানী রা. ইন্তেকাল করেন । যখন টাইফয়েডের তীব্রতার কারণে আমি হুশ হারিয়ে ফেলছিলাম তখন মৌলভী মুহাম্মাদ সুরতী (আমার সহপাঠী, আমরা রোমমেট) বাবাকে টেলিগ্রাম করে আমার অসুস্থতার খবর জানিয়ে বললো যদি আপনার ছেলেকে জীবিত অবস্থায় দেখতে চান তাহলে চলে আসুন । ওদিকে আমাদের বাড়ির সামনে আখের দুটি ক্ষেত ছিলো । শীতকাল আসতে আর কিছুদিন বাকি । আখমাড়া কল চলার কথা । মৌলভী আমিন আর আমার এক বড়ভাই মৌলভী আব্দুল মাজীদ তারা মহিষ চড়ানোর সময় আগুন জালালে তা থেকে আগুন লেগে আমাদের দুটি ক্ষেতই জ্বলে যায় । একা বাবার পক্ষে তেমন কিছু করার ছিলো না । বাবা সারাদিন দুশ্চিন্তায় দুর্ভাবনায় কাটিয়ে রাতে ঘরে ফিরেন । এসে টেলিগ্রাম পান । টেলিগ্রাম পেয়ে কাউকে কিছু বললেন না । চুপচাপ শুয়ে পড়লেন । এঅবস্থায় ঘুম কোথ্থেকে আসবে । অনিদ্রায় কোন রকম রাত কাটে । সকালে বাড়ির লোকদের বললেন আমি “সাহারানপুর” যাচ্ছি । আখ ক্ষেতের আগুন নিভানোর সময় কাপড় কালো হয়ে গিয়েছিল । সে কাপড় পরেই  “সাহারানপুরের” উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন । দাদিজান মাকে সবকিছু খুলে বললেন । বাবাকে ভালো কাপড় পরিয়ে ‍দিতে বললেন । মা ঘর থেকে ভালো কাপড় নিয়ে বের হলেন । মা “সিদনি” নামক গ্রামে যেয়ে বাবাকে পেলেন । এবং বাবাকে ভালো কাপড় পরালেন । যাইহোক বাবা “সাহারানপুর” আসলেন । আমি অচেতন আবস্থায় ছিলাম । আমার চিকিৎসা করছিলেন একজন শিখ ডাক্তার । তিনি আমাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বারণ করে বললেন এই ছেলে বাঁচবে না । “সাহারানপুর” মাদরাসার নাযেম হযরত মাওলানা আসাদুল্লাহ সাহেবও আমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে বারণ করলেন । প্রতি উত্তরে বাবা বললেন মরতে তো একদিন হবেই । আমি একে বাড়ি নিয়ে যাব । বাবা আমাকে নিয়ে বের হলেন । “সাহারানপুর” মাদরাসার ছাত্ররা ষ্টেশন পর্যন্ত আমার সাথে এসে আমাকে গাড়িতে বসিয়ে দিলো । কিন্তু দিল্লি রেলষ্টেশনের এক প্লাটফর্ম থেকে অন্য প্লাটফর্মে যাওয়ার সময় বাবা আমাকে হাটিয়ে হাটিয়ে নিলেন । বাবা জানতেন না যে রেলষ্টেশনে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা আছে । সে মূহুর্তে আমি অনুভব করলাম যে আমার দেহে সামান্য হলেও প্রাণ আছে । তারপর আরেক গাড়িতে বসিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কিছু খাবে? আমি আসলে দুমাস যাবত ভালো করে কিছুই খেতে পারিনি । আমি বললাম হ্যাঁ খাব । বাবা আমার জন্য গোশত পুরি নিয়ে আসলেন । আমি সব খেয়ে সাফ করে দিলাম । বাবা আবার এনে দিলেন । তাও খেয়ে শেষ করলাম । “পালনপুর” পৌঁছতে পৌঁছতে তিনবার খাওয়ালেন । তাতে আমার শরীরে যথেষ্ট শক্তি সঞ্চারিত হলো । আমি স্বাভাবিক ভাবেই গাড়ি থেকে বের হলাম । বাবা আমাকে সোজা মাওলানা নাযির সাহেবের কাছে নিয়ে গেলেন । তিনি তখন জীবিত ছিলেন । বাবা তার কাছ থেকে অষুধ নিলেন । ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন যে একে কিছুই খাওয়াবেন না । খাওয়ালে এ আর বাঁচবে না । বাবা বললেন মরে গেলে লাশ নিয়ে যাব । মরলে খেয়েই মরুক, না খেয়ে মরবে কেন । যাইহোক বাবা অষুধ নিলেন । এক সপ্তাহ বাড়িতেই ছিলাম । এবপর ধীরে ধীরে আমি হাটাচলা করতে পারি ।

এরপর যা ঘটলো তা আমার চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দিলো । আমাদের ছিল লম্বা ঘর । পার্টিশান দিয়ে রুম ভাগ করা । আমি এক পাশের রুমে শুয়ে আছি । পাশেই ছিলো রান্নাঘর । অপর পাশের রুমে বাবা আর দাদি কথা বলছিলেন । আমি শুয়ে শুয়ে তাদের কথাবার্তা শুনছিলাম । বাবা দাদিকে বললেন আহমাদকে আর পড়াব না । আমার আসল নাম আহমাদ । মা জিজ্ঞেস করলেন কেন পড়াবেন না ? বাবা বললেন প্রথমবার যখন আমি তাকে “সাহারানপুর” রেখে এসেছি তখন কতগুলো টাকা খরচ হলো, অসুস্থ হওয়ার পর কতগুলো টাকা ব্যায় হলো, তাকে বাড়ি পর্যন্ত আনতে আবার কি পরিমাণ অর্থ খরচ হলো, আমার ক্ষেত আগুনে পুড়ে কী পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি হলো, এখন একে আবার মাদরাসায় পাঠালে আবার পকেট খালি করতে হবে, দুমাস পর যখন আবার বাড়ি ফিরবে তখন আবার রাহা খরচ বহন করতে হবে, অথচ পড়াশুনার কোন খবর নেই ।

প্রশ্ন : তখন আপনার দাদি কী বললেন ?

উত্তর : তখন আমি দৃড় প্রতিজ্ঞা করি যে যে করেই হোক আমি পড়ব । আমকে পড়তে হবে । নির্ঘূম কোন রকম রাত পেরিয়ে সকাল হলো । ফজরের আযানের সময় আমি বিছানা ত্যাগ করে মার খাটের পাশে যেয়ে বাসলাম । শব্দ শুনে মার ঘুম ভেঙ্গে গেলো । মা জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে ? শরীর খারাপ লাগছে ? আমি বললাম না কিছু হয়নি । আমার জিনিসপত্র প্রস্তুত করে ‍দিন আমি সাহারানপুর যাচ্ছি । অসুস্থ শরীর নিয়ে কীভাবে যাবে ? মা বললেন । আমি বললাম দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই আমি যেতে পারব । তিনি জিনিসপত্র এবং খাবার প্রস্তুত করে দিলেন । তখনকার সময়ে গাড়িতে সচরাচর খাবার পাওয়া যেতোনা । খাবার সাথে করে নিয়ে যেতে হতো এবং জেনারেল বগিতে সীটের ব্যবস্থা ছিলনা । সবাই এভাবেই যাতায়াত করতো । ততক্ষণে বাবা জেগে গেছেন । শীতকাল ছিল তাই তিনি বিছানা ছাড়লেন না । আমি বের হওয়ার সময় মা আমার সাথে জিনিসপত্র নিয়ে বের হলেন । বের হতে হতে আমি বাবাকে লক্ষ করে বললাম, বাবা আমি “সাহারানপুর” যাচ্ছি । তখন তিনি হাত বের করে মুসাফা করলেন । “সিদনি” পর্যন্ত মা আমার সাথে আসলেন । তারপর মামা । আমি “পালনপুর” ‍গিয়ে আলমগীর হোটেলের বাইরে মাটির মটকার উপর যেয়ে বসলাম । এ হোটেলটি ছিল মুসলমানদের । আমি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর দাদি বাবাকে ধমকালেন, রাগারাগি করলেন । তাই বাবা পরের বাসে করে “পালনপুর” এসে পৌঁছলেন । এসে আমার পাশে বসলেন । আমার সাথে কোন কথা বলেননি । ষ্টেশানে গাড়ি আসলে আমি কুলি দিয়ে জিনিসপত্র গাড়িতে উঠালাম । বাবাও আমার সাথে সাথে আসলেন । মা আমাকে দেড়শ রুপি দিয়েছিলেন । আমি কাউন্টার থেকে টিকেট সংগ্রহ করলাম । বাবা আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তকিয়ে রইলেন । তারপর আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম । গাড়ি সচল হল । বাবা দাড়িয়ে দাড়িয়ে অপলক তাকিয়েই রেইলেন কিন্তু কিছুই বললেন না । সেদিন থেকে অদ্যবধি সাইকেলের সাথে আমার কোনো সাক্ষাৎ নেই । সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত কিতাব থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হইনি । কিতাবকে আমি পরম বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছি । নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেতনাই আমাকে গতিশীল করেছে । এজন্য বলেছি নিজের জন্য পড়া আরা বাবার জন্য পড়া এক কথা নয় ।

প্রশ্ন : এটা কবের ঘটনা ?

উত্তর : এটা “শরহে জামীর” বছরের ঘটনা ।

প্রশ্ন : তখন আপনার বয়স কত ?

উত্তর : তখন আমার বয়স মাত্র এগার বছর । এগার বছর বয়সেই “শরহে জামী” পড়েছি ।

প্রশ্ন : কত বছর বয়সে আপনার পড়ালেখার হাতে খড়ি?

উত্তর : পড়ালেখাতো ছোটবেলাতেই শুরু করেছি । আমার ঠিক মনে নেই আমি বালেগ কবে হয়েছি । তবে “সাহারানপুর” পড়াকালীন বালেগ হয়নি ।

প্রশ্ন : হেফয করেছেন কবে?

উত্তর : হেফযের ঘটনা হল “সাওয়ানেহে নাযিরে” একটি ঘটনা রয়েছে যে “ইউপির” একজন আলেম মাওলানা নাযির সাহেবের কাছে এসেছিলেন । মাওলানা নাযির সাহেব একজন তালিবে ইলমকে ডেকে পাঠালেন এবং মেহমানকে মুখস্থ কুরআন শুনাতে বললেন । সে কয়েকটি আয়াত মুখস্ত শুনাল । এরপর আগন্তুক মাওলানা সাহেব অবাক হয়ে বললেন আপনাদের এখানে ছাত্ররা হেফয পড়ে না । নাযির সাহেব বললেন নাযেরা পড়াই ত অনেক গনিমত হেফয কে পড়বে? আমার বড় মামা মাওলানা ওলি মুহাম্মাদ সাহেব ওখানের তালিবে ইলম ছিলেন । তিনি বলেন তখন আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম যে পুরো কুরআন শরীফ হেফয করা কি করে সম্ভব ? এরপর মামা “পালনপুর” ছেড়ে “ডাবেল” চলে গেলেন । তার ছোট ভাই মাওলানা হাবিবুর রহমান তিনি “ডাবেলে” পড়াশুনা শেষ করে “মাহি” পড়াতেন । একেবারে যৌবনেই তিনি ইন্তেকাল করেন । তাকে নিয়ে “ডাবেল” গেলেন এবং হেফয বিভাগে ভর্তি করে ‍দিলেন । আমাদের পুরো খান্দানে ইনিই প্রথম হাফেয । এর আগে আমাদের খান্দানে কোন হাফেয ছিল না । তিনি সেখানে হেফয শেষ করে বাকী  পড়ালেখাও সেখানেই সমাপ্ত করেন । আমাদের খান্দানে তিনিই সর্বপ্রথম হজ্জ করেন । তখন চরশ রুপিতে হজ্জ করা যেত । পড়াকালীন উনাকে যে খরচাদি উনার বাবা দিতেন সেখান থেকে তিনি এ অর্থ সঞ্চয় করেছিলেন । পড়াশুনা শেষ করেই তিনি হজ্জের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন । পোনে চারশ রুপিতে তিনি হজ্জ সম্পন্ন করেন । পচিশ রুপি উদ্বৃত্ত থেকে যায় ।  তিনি খুব ভালো হাফেয ছিলেন । রমযান মাসে প্রতিদিন এক খতম কুরআন পড়ে তার মায়ের জন্য ইসালে সওয়াব করতেন ।

তার ইন্তেকালের সময়ের ঘটনা । তিনি উচু আওয়াজে কুরআন পড়তেন, এবং অনেক বেশি তিলাওয়াত করতেন । পরিবাবের লোকজন বারণ করলেও তিনি কারো কথা শুনতেন না । সবাই মিলে পরামরর্শ করলো তার বড়ভাই মাওলানা ওলি মুহাম্মাদকে বিষয়টি জানানো হোক । কারণ তিনি তাকে উস্তাদের মত মান্য করতেন । তাকে জানানো হল । তিনিও এত বেশি কুরআন পড়তে বারণ করলে প্রতিউত্তরে বললেন, আপনি আমাকে কুরআন তিলাওয়াত করতে বারণ করছেন? তিনি বললেন এত জোরে জোরে পড়ো না । তিনি বললেন, হ্যাঁ এটা হতে পারে । এরপর থেকে আস্তে আস্তে তিলাওয়াত করা শুরু করলেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তেলাওয়াত করতে থাকেন । ইন্তেকালের তিনদিন আগ থেকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন জুমা কবে? গ্রাম হওয়ায় সেখানে জুমা হত না । বলা হলো এখনো তিনদিন বাকী । জুমার দিন সব ভাইবোনদেরকে ডেকে পাঠালেন । জুমার আযান হলে বাড়ির পুরুষরা সবাই নামাযে চলে গেলেন । ঘরে শুধু আমার মা আর খালা ছিলেন । তিনি বোনদেরকে পেশাব করার কথা জানালেন । দুবোন মিলে বাহু ধরে নিয়ে চললেন । দরজা পর্যন্ত পৌঁছতেই তিনি একেবারে সোজা দাড়িয়ে পড়লেন এবং বললেন ওয়ালাইকুমুস সালাম । সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তিনি শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন । সবাই নামায পড়ে এসে দেখলেন যে পুরো ঘর খুশবুতে মৌ মৌ করছে । সবাই এসে জিজ্ঞস করতে শুরু করলো যে কেউ কি খুশবু লাগিয়েছে বা আগরবাতি জালিয়েছে ? তিনি আল্লাহ তাআলার অত্যন্ত নেক বান্দা ছিলেন । হাফেযও খুব ভালো ছিলেন । তার তিন সন্তান ছিল । তাদের মধ্যে আমার সহধর্মীনী বড় মেয়ে । তার ছোটবোন “কালেরায়” এখনও জীবিত । তার ছোট ভাইয়ের ইন্তেকাল হয়ে গেছে । তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিয়েছিলেন । পরবর্তীতে “জলসিনীর” মাওলানা নুর মুহাম্মাদের সাথে তার বিয়ে হয় । ছেলে মেয়েরা সবাই বাবার সাথেই ছিল । আর তিনি “মাহিতে” পড়াতেন । ছোটবেলা থেকে আমার বিয়ে বড় মামার মেয়ের সাথে হওয়ার কথা ছিল । ছোট মামা ইন্তেকালের আগে মাকে বলেছিলেন আমার মন চায় যে “সফিনার” সম্বন্ধ আহমাদের (মুফতি সাঈদ আহমাদ সাহেব রা.) সাথে করি । ব্যাস এটুকুই বলেছেন । উনার একথা মার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল । অবশেষে আমার বিয়ে ছোট মামার মেয়ের সাথেই হয় । ছোট মামা মাকে একথাও বলেছিলেন যে আমার মন চায় একে আহমাদের সাথে বিয়ে দিব এবং একে হাফেয বানাব । তার সাথে আমার বিয়ে হওয়ার পর আমি তাকে হিফয করতে বলতাম, কারণ তার কাছ থেকেই আমি এ ঘটনা জানতে পারি, মার কাছে শুনিনি । সে বিভিন্ন ওজর পেশ করত । পরে আমার বড় ছেলে মৌলভী রশীদ আহমাদের যখন হিফযের বয়স হলো তখন আমি তার মাকে বললাম, এবার দুজন একসাথে হিফয শুরু কর । হিম্মত করে সেও শুরু করল । তখন দেওবন্দে আমার ‍নিয়োগ হয় । তখন আমি ছেলেকে সাথে নিয়ে আসি আর সহধর্মীনিকে রেখে আসি । এভাবে দেখতে দেখতেই চার বছর পেরিয়ে যায় । রশীদের মা চার চছর আগে আর রশীদ চার বছর পর হিফয শেষ করে । এরপর সে সব ছেলে মেয়ে এবং পৌত্র এবং তাদের স্ত্রীদেরকেও হিফয করায় । যতদিন জীবিত ছিল ততদিন হিফয করানোর এ ধারা অব্যাহত ছিল ।

প্রশ্ন : তিনি আগে হিফয সম্পন্ন করে নেন?

উত্তর : সে অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করতো । রাশেদা বলছিল শুরু শরুতে যেমনিভাবে কেউ খুব বেশি তিলাওয়াত করে থাকে খালাও তেমনি রমযানে অধিক পরিমাণে তিলাওয়াত করতেন ।

প্রশ্ন: আপনি কবে হিফয করেন ?

উত্তর: আমার নাযেরা অনেক দুর্বল ছিল, তিলাওয়াত বিশুদ্ধ ছিল না । দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করে আমি ইফতা বিভাগে ভর্তি হয়ে বাড়ি এলাম । বাবাতো আমাকে আগে থেকেই পড়াতে রাজি ছিলেন না । কিন্তু সাগ্রহে পড়াশুনা করে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করে এলাম । তখন বাবা এবং বড় মামার মত ছিল আমাকে “আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে” ভর্তি করবেন এবং মাওলানা নাযির আহমাদ সাহেব যেভাবে দু চার পয়সা আয় রোজগার করতেন এবং দ্বীনের খেদমত করতেন আমিও তাই করবো । উনাদের এই সিদ্ধান্তকে আমি সঠিক মনে করতাম না । কেননা মাওলানা নাযির সাহেবের উদাহারণ দূর্লব । আমার তা ভালো করেই জানা ছিল যে মাওলানার মত হওয়া সম্ভব নয় । উভয়ের মাঝে এ বিষয়ে মাশওয়ারা চলছিলো যে আমাকে রামযানের পর “আলিগড়” পাঠাবেন । আপর দিকে আমি আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলাম । আমার মত জানতে চাওয়া হলে আমি বললাম “দেওবন্দে” পড়তে যাব । “দেওবন্দ” থেকেতো তুমি পড়ে আসলে আর কী পড়বে ?  আমাকে বলা হলো । আমি বললাম ইফতা বিভাগে ভর্তি হব । এতে উনাদের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে গেল । বাবা বললেন আমি তোমাকে কানা কড়িও খরচ দিব না । আমি বললাম খরচ নিয়ে আমি চিন্তিত নই । আমিতো আসলে ইফতা পড়ার সিদ্ধান্ত করে নিয়েছিলাম । বাবা বললেন আমি বিরান ভূমিতে থাকি । আমি তোমাকে পড়িয়েছি । তোমার ছোট ভাইবোন আছে । তাদেরকে কে পড়াবে? আমার পিঠাপিঠি ছিল আব্দুর রহমান । তার পড়ালেখার বয়স পার হয়ে গিয়েছিল । তারপর আব্দুল মাজিদ ও মাওলানা আমিন সাহেব । তাদের পড়ালেখার বয়স ছিল । আমি বললাম আমি এদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব এবং এদেরকেও পড়াব । তারপর আমি তাদেরকে সঙ্গে করে নিয়ে আসলাম । মওলানা আব্দুল মাজিদের হিফয পড়ার বয়স ছিলনা । তাই আমি তাকে ফার্সির চার পাঁচটি কিতাব পড়িয়ে ‍দিয়েছিলাম । আর মাওলানা আমিনের হিফযের বয়স থাকায় তাকে হিফয বিভাগের একজন ক্বারী সাহেবের কাছে সোপর্দ করি । আমি তো হাফিয ছিলাম না কিন্তু কখনো কখনো কুরআন খুলে তার পড়া শুনতাম । সে পড়া বেশ ভালই শুনাতো । তার পড়ায় আমি সন্তুষ্ট ছিলাম । ঘটনাক্রমে একদিন এমন একটি সুরা শুনাচ্ছিলো যা আমার ‍মুখস্থ ছিল । তাই আমি কুরআন শরিফ বন্ধ করে দিলাম । সে পড়তে পড়তে হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেলো । আসলে সে আমার সামনে বসে দেখে দেখে পড়া শুনাতো । হঠাৎ আমার মনে সন্দেহ জাগলো । জিজ্ঞেস করলে সে উত্তর দিলো যে আমি চার পারা হিফয করেছি কিন্তু আমার কিছুই মনে নেই । এ কথা শুনে আমি তাকে ইচ্ছেমত মারধর করলাম । পরে মনে হলো শুধু মারধরে কাজ হবে না । সেদিন থেকে আমি হিফয করা আরম্ভ করলাম এবং তাকেও হিফয করাতে থাকলাম । সে বছরটি আমার ইফতার বছর ছিল । পরে আমরা তিন ভাই একসাথে বাড়ি যাই । এরপর থেকে বাবা টাকা পাঠানো শুরু করলেন । মাসে পাঁচ রুপি পাঠাতেন । এদিকে আমি ব্যবসা শুরু করলাম । আসরের পর কুতুবখানায় যেতাম এবং সেখান থেকে খাতা আনতাম । ষোল পৃষ্ঠায় এক রুপি পেতাম এবং আট আনা আমার আর আট আনা আমার সহপাঠীর । তা দিয়ে খুব সুন্দরভাবেই আমাদের দিনকাল চলতো । সেসময় “পালনপুর” থেকে “সাহারানপুরের” ভাড়া ছিল উনিশ রুপি । (মুফতি আমিন সাহেব বর্তমানে দেওবন্দে দাওরায় সবক পড়ান) তার কারণে আমার হিফয পড়া হয়েছে । আর মামার ইচ্ছে অর্থাৎ মামাত বোনের সাথে আমার বিয়ের ইচ্ছে তাও পূ্র্ণ হলো আর আমার স্ত্রীকে হিফয করানোর যে মনোবাসনা ছিল তাও পূর্ণ হলো ।

প্রশ্ন : আপনার কোন মামা আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রা. এর শাগরেদ ছিলেন ?

উত্তর : উনার নাম হলো মাওলানা ওলি মুহাম্মাদ সাহেব । “ডাবেলের” রির্পোট/ইতিহাস ছেপেছে সেখানে ওনার নাম রয়েছে । আসল পড়াশুনা “পালনপুরে” করেছেন । সেখানের পড়াশুনার মান তেমন ভালো না থাকায় তিনি “ডাবেল” গমন করেন ।

প্রশ্ন : আপনার দ্বিতীয় ভাই যিনি ইন্তেকাল করেছেন যাকে আপনি ফার্সি পড়িয়েছেন তাকে আর কী কী কিতাব পড়িয়েছেন ?

উত্তর : ফার্সি ছাড় অন্যান্য কিতাবাদিও পড়িয়েছি । দুবছর পর আমি চলে আসি সে পড়াশুনা চালিয়ে যায় এবং “আশরাফিয়া” থেকে পড়াশুনা সম্পন্ন করে ।

প্রশ্ন : মাওলানা আমিন সাহেব আপনার কাছে কী কী কিতাব পড়েছেন ?

উত্তর : সে আমার কাছে অনেক কিতাবাদি পড়েছে । “দেওবন্দও” পড়িয়েছি “রান্দের” শিক্ষকতাকলীনও পড়িয়েছি । সেখান থেকে “দেওবন্দ” যায় এবং সেখানে কয়েক বছর পড়ে । পরবর্তীতে আমি যখন “দেওবন্দে” শিক্ষক হিসেবে আসি তখন সে আদব বিভাগের ছাত্র ।

প্রশ্ন : “দেওবন্দে” কত বছর যাবত পড়াচ্ছেন ?

উত্তর : “দেওবন্দে” আমার শিক্ষকতার বয়স সাত চল্লিশ বছর । আর “রান্দের” পড়িয়েছি নয় বছর ।

প্রশ্ন : হযরত মাদানী রা. এর ইন্তেকালের সময় আপনি কোথায় ছিলেন ?

উত্তর : মাদানী রা. এর ইন্তেকালের সময় আমি মাযাহেরুল উলূমে ছিলাম । ছাএদের মাঝে হৈ চৈ শুনে আমি জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে উনার ইন্তেকাল হয়ে গেছে ।

প্রশ্ন : আপনি কী উনাকে দেখেছেন ?

উত্তর : “পালনপুরে” কয়েকবার দেখেছি । “সাহারানপুরে” হযরত শায়েখের কাছেও আসতেন ।

প্রশ্ন : হুজুর আমাদের জন্য দোয়া করবেন আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের ইলম বাড়িয়ে দেন । আমাদের মাঝে ইলম এবং আমল উভয়ের সম্মিলন যেন ঘটে এবং যেন রমযান ভালোভাবে কাটাতে পারি ।

উত্তর : আল্লাহ তাআলা ইলম বাড়িয়ে দেন । প্রিয় বান্দা বানিয়ে নেন । মাকবুলিয়াত দান করেন এবং সঠিকভাবে রমযান পালন করার তাওফিক দান করুন । আমিন ।