নামাযে ডুকরে কাঁদা একজন হজ্বযাত্রীর বায়তুল্লাহয় হাযির হতে না পারার আক্ষেপ

তারিক মুজিব ।।

গতকাল মাগরিবের নামায পড়েছিলাম স্টেশন মসজিদে। সালাম ফেরানোর পর ইমাম সাহেব মোনাজাতের জন্য হাত তুললে পাশে থাকা লোকটি ডুকরে কেঁদে উঠল। সংক্ষিপ্ত মোনাজাতে সচরাচর কাউকে এভাবে কাঁদতে দেখা যায় না। আন্দায করলাম ভদ্রলোকের প্রচণ্ড রকম কষ্টবোধ আছে।

মসজিদ থেকে বের হয়ে লোকটির সাথে পরিচিত হলাম। তিনি মুহাম্মদ আবদুল হাকিম। নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া থানার লোক। মেয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছেন। কেন্দুয়াতে একটি মাধ্যমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক। কথা বলে সদালাপী এবং সজ্জনই মনে হলো তাকে।

মোনাজাতে ওভাবে কান্নার ব্যাপারে কৌশলে জিজ্ঞেস করলে ভদ্রলোকের হাস্বোজ্জ্বল চেহারাটা আবার মলিন হয়ে গেল। তিনি জানালেন, বিশেষ কোনো পারিবারিক দুঃখ তার নেই। এই মাগরিব নামায তার হারামে মক্কায় পড়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকদীর তার সহায় হয়নি। সেই আক্ষেপ থেকেই মাঝেমাঝে বেশ আবেগ প্রবণ হয়ে উঠেন।

করোনা পরিস্থিতিতে এ বছর সৌদি আরবের বাইরে অন্য দেশের লোকদের হজ্বযাত্রা বাতিল করা হয়েছে। বিশেষ সুবিধায় কেউ কেউ হয়ত যেতে পারেন। তবে ওপরের ভদ্রলেকের মতো বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ মানুষ হজ্বে যেতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে দিনাতিপাত করছেন।

জিলহজ মাসের আর দু’-তিন দিন বাকী। কয়েকদিন পরেই হজ্বের আনুষ্ঠানিক কার্যাদি শুরু হবে। লোকেরা দল বেধে মিনায় যাবে, সেখান থেকে আরাফা মাঠে। তারপর মুযদালিফায় রাত্রিযাপন করে পরেরদিন জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ কর। কুরবানী, মাথা মুণ্ডন শেষে ফরজ তাওয়াফ আদায় করবে।

অন্য বছর এ সময়টাতে و أذن في الناس بالحج এর হুকুম পালনে কোটির উপরে মানুষ সমবেত হয় হারামে মক্কায়। পৃথিবীর নানা দেশের বিভিন্ন রঙ ও গোত্রের মানুষ। সবার মাঝে বিরাজ করে এক ঐশী সম্মোহন। হজ্বের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বিশ্বজুড়ে এ বছরের জন্য নিবন্ধন করা হজ্বযাত্রীদের আক্ষেপ তত বাড়ছে।

মুহাম্মদ আবদুল হাকিম জানালেন, “তিনি গতবছরই হজ্বের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন। কিন্তু কোঠা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় গত বছর আর যাওয়া হয়নি তার। এবছর তার নাম প্রথমদিকেই ছিল। টাকাও জমা দিয়েছিলেন পুরোটাই। কিন্তু করোনা সব এলোমেলো করে দিলো”। বলতে বলতে ভদ্রলোক আবারও চোঁখ মুছলেন।

তার কথায় মনে হলো, আমাদের চারপাশেই তো এমন অনেক মানুষ আছে যারা সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পরেও হজ্বে যেতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। ভদ্রলোকের কথায় নতুন একটি বিষয় উপলব্ধি হল।

হজ্ব তো মানুষ কেবল ফরজ দায়িত্ব পালনের জন্যই করে না। ধর্মীয় আবেগ, বায়তুল্লাহয় জীবনে অন্তত একবার হাযিরি দেওয়া এবং রওযা আতহারে অন্তত একবার দুরূদ পাঠের তামান্নাই হাজ্বীদের বেশি থাকে। গাছ বিক্রি করে, ডিম বিক্রি করে বা আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপায় অবলম্বন করে দরিদ্র মানুষদের হজ্বে যাওয়ার ঘটনা তো প্রতিবছরই খবরের কাগজে দেখা যায়। আল্লাহর প্রিয় অনেক বান্দা তো প্রতিবছরই বা কয়েকবছর পরপরই আরাফা মাঠে হাযির হন। এখানে তো ফরজ দায়িত্ব পালনের চেয়ে আল্লাহর ভালবাসা এবং ধর্মীয় আবেগটাই বেশি থাকে। এটাই তো হজ্বের রূহানিয়্যাত।

পূর্ববর্তি সংবাদসিরাজগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩, আহত ২
পরবর্তি সংবাদকরোনায় মারা গেলেন বিএনপি নেতা আউয়াল খান