কুরবানীর বিষয়ক কিছু ভুল

মাওলানা মনসূরুল হক

মাওলানা মনসূরুল হক ।।

আলহামদুলিল্লাহ প্রতি বছরই মসজিদে কুরবানীর মৌসুমে কুরবানীর মাসায়েল আলোচনা করা হয়। আলোচনার আগে পরে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, প্রশ্নগুলো শুনে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হাসিল হয়। যদিও মাসায়েলগুলো কিতাবে লেখা আছে এবং মনোযোগ দিয়ে পড়লে ভুল হওয়ার কথা না, তারপরেও দেখা যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েলেও কেউ কেউ ভুল করে। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় যেগুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে সেগুলো এখানে  পেশ করছি।

১. নেসাবের ক্ষেত্রে কেউ কেউ স্বর্ণ ও রূপার নেসাবে পার্থক্য  করতে পারে না ।

মহিলাদের সাধারণত কিছু স্বর্ণালঙ্কার থাকে, সাড়ে সাত ভরি হলে মনে করে নেসাব পরিমান হয়েছে, কুরবানী করতে হবে। কিন্তু সাড়ে সাত ভরির কম হলে মনে করে নেসাব পরিমান হয়নি কাজেই কুরবানী ওয়াজিব নয়!

অথচ মাসআলা হলো:   কারো এক/দুই ভরি স্বর্ণালঙ্কারের সাথে অল্প কিছু রূপা অথবা টাকা  অথবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন  জিনিস থাকে তাহলে সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।  সবগুলোর মূল্য যদি রূপার নেসাবের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলে কুরবানী ওয়াজিব হয়ে যাবে।

আহকামুল কুরআন, জাসসাস ৩/১২৮; আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫

 

২. একান্নভুক্ত পরিবারের ক্ষেত্রে কেউ কেউ মনে করে, এক পরিবারের কয়েকজন সামর্থ্যবান থাকা সত্ত্বেও শুধু একজন কুরবানী দিলেই চলবে। যেমন, শুধু বাবা কুরবানী দিল, ব্যাস সবার কুরবানী হয়ে যাবে!

এটা ঠিক নয়।

মাসআলা হলো: যারা সামর্থ্যবান তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকে কুরবানী দিতে হবে। হাঁ, যদি পরিবারের একজন সকল সদস্যদের পক্ষ থেকে তাদের সম্মতিতে কুরবানী দিয়ে দেয় তাহলে সকলের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে।

আল মুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫

 

৩.  কেউ কেউ নিকটাত্মীয়ের ওয়াজিব কুরবানী তাদের অনুমতি ছাড়া আদায় করে দেয়। তাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করে না। চিন্তা করে যে তারা কি আর অমত করবে?

মাসআলা হলো: অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি নিলে এর দ্বারা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।

আলমগীরী ৫/৩০২

 

৪.  কোন কোন তামাত্তু হাজী সাহেব দমে শুকর আদায় করে মনে করে আমার কুরবানী হয়ে গেছে! তারা ঈদুল আজহার ওয়াজিব কুরবানী আদায় করে না।না মক্কায় না দেশে।

অথচ মাসআলা হলো: যারা তামাত্তু হাজী তাদের উপর দমে শুকর ওয়াজিব এবং এই সময়ে যারা সামর্থ্যবান ও মুকিম হিসেবে মক্কায় অবস্থান করে তাদের উপর দমে শুকর ব্যতিত ঈদুল আজহার ভিন্ন কুরবানী করা ওয়াজিব। তবে যারা এই সময় মুসাফির থাকে তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়।

ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩

 

৫.  অনেকে অন্যের সাথে শরিক হয়ে কুরবানী করে, কিন্তু যাদের সাথে শরিক হয় তাদের অবস্থা যাচাই করে না, তাদের ইনকামের অবস্থা জানে না!

এটি অনেক বড় ভুল। কারন শরিকদের   একজনের   নিয়তের মধ্যে গরমিল থাকলে অথবা একজনের অধিকাংশ ইনকাম হারাম থাকলে সকলের কুরবানী বরবাদ হয়ে যাবে।

তাই শরিক নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল: ৪/১৭০

 

৬.  কুরবানীর গোশত তিন ভাগে ভাগ করাকে কেউ কেউ ওয়াজিব মনে করে এবং এর সামান্য ব্যতিক্রম হলে নাজায়েজ মনে করে ।

অথচ সঠিক মাসআলা হলো, তিন ভাগ করা মুস্তহাব। প্রয়োজন ছাড়াও এর ব্যতিক্রম করার সুযোগ আছে। বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪

তবে যেহেতু কুরবানীর সময়  আত্মীয় স্বজন ও গরিব-মিসকিনের  হক আদায়ের সুবর্ণ সুযোগ হয় তাই তিন ভাগ করার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া উচিত।

 

৭.  জবাই করা নিয়ে কেউ কেউ মনে করে, আমি তো জবাইয়ের দুআ পারি না, তাই আমি জবাই করতে পারবো না।

এটা আসলে কম হিম্মতের কথা । নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। এবং এটা সহজ বিষয়,একটু হিম্মত করলেই পারা যায়। শুধু  “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার”

বলে তিনটি রগ কাটলেই জবাই সম্পন্ন হয়ে যায়। আগে ও পরে অন্য দুআগুলো পড়া মুস্তাহাব। না পড়লেও কোন সমস্যা নেই। এবং কেউ আরবিতে না পারলে বাংলায় দুআ করলেও চলবে।

আল মুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১১৩২

 

৮.  কেউ কেউ শরিকের সংখ্যা বেজোড় হওয়াকে জরুরী মনে করে, আবার কেউ কেউ দুই জন মিলে এক শরিক নেয়।

এক্ষেত্রে মাসআলা হলো,শরিকের সংখ্যা জোড় বা বেজোড় যাই হোক কোন সমস্যা নেই।উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাত শরিকে কুরবানী করা যাবে।সাতের অধিক শরিক হলে কারো কুরবানী সহিহ হবে না।  সহিহ মুসলিম ১৩১৮

তবে কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন দুই জন মিলে সাত শরিকের এক শরিক। এক্ষেত্রে কোন শরিকের কুরবানী সহিহ হবে না।

বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

 

৯.  কেউ কেউ মনে করে কুরবানীর সাথে আকীকা করা যায় না। আবার কেউ কেউ মনে করে আকীকার গোশত নিজেরা খাওয়া যায় না বরং বন্টন করে দিতে হয়!

অথচ সঠিক মাসআলা হলো, কুরবানীর সাথে আকীকা করা যায় এবং আকিকার গোশত কুরবানীর গোশতের মতো নিজেরা খাওয়া যায়।

তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২

 

১০.   কেউ কেউ মনে করে কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য যাকাতের মতো নেসাব পরিমান অর্থ সম্পদ এক বছর স্থায়ী হতে হবে।

অথচ সঠিক মাসআলা হলো, কুরবানী ওয়াজিব হওয়ার জন্য বছর ব্যাপী অর্থ সম্পদ স্থায়ী থাকা জরুরি নয়, বরং জিলহজের ১০,১১,১২ এই তিন দিনের মধ্যে নেসাবের ( যা বর্তমান সময়ে ৪০ হাজার টাকার) মালিক হলে তার জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব।

আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫

 

১১.  কুরবানীর পশুর নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হওয়ার পরও শুধুমাত্র দাঁত না উঠার কারণে কেউ কেউ ঐ পশুর কুরবানী করতে সংকোচ বোধ করে!

অথচ সঠিক মাসআলা হলো, পশুর নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হলে তার দাঁত না উঠলেও সমস্যা নেই। এবং বয়সের ক্ষেত্রে বিক্রেতার কথাই গ্ৰহণযোগ্য । আহকামে ঈদুল আজহা ৫, কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬

 

১২. কোন কোন এলাকায় এক স্থানে অনেক পশু জবাই করে। এবং এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করাকে কিছুই মনে করে না!

অথচ  এতে করে সেই পশুকে অহেতুক কষ্ট দেয়া হয়। এবং এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা হলে  সেই পশু জবাই হওয়ার আগেই একবার জবাই হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। হাদীসে অনর্থক কষ্ট দিয়ে জবাই করতে নিষেধ করা হয়েছে।

মুসলিম শরীফ,  হাদীছ নং ১৯৫৫

 

১৩.  কোন কোন কসাই পশু জবাই করার পর নিস্তেজ হওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি পায়ের রগ কেটে ফেলে এবং চামড়া খসানো শুরু করে!

মাসআলা হলো: জবাইয়ের পর পশু নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩; আদ্দুররুল মুখতার ৬/২৯৬

 

১৪.  কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় একজন জবাই সম্পন্ন করার আগেই কষাই বা অন্য কেউ ছুরি ধরে এবং দ্বিতীয় ব্যক্তি বিসমিল্লাহ না বলেই জবেহ সম্পন্ন করে।

এটা মারাত্মক ভুল, জবাইকারীর জন্য যেমন বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলা জরুরী তেমনি জবাইয়ে সহযোগিতাকারীর জন্যেও বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলা জরুরী। ইচ্ছাকৃত ভাবে বিসমিল্লাহ না বললে কুরবানীও সহিহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না।

রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪

 

১৫.  কোন কোন এলাকায় প্রচলন আছে যে,যারা কুরবানী দেয় তাদের কুরবানীর গোশতের একটি অংশ সামাজিক ভাবে একত্র করা হয়, তারপর সেই গোশত যারা কুরবানী দেয় তাদের এবং যারা কুরবানী দেয় না তাদের সকলের মধ্যে বন্টন করা হয়। এতে নিজের কুরবানীর গোশত আবার নিজের কাছে আসে।

এই প্রচলন শরয়ী দৃষ্টিতে অনেক ঘৃণিত। এতে একদিকে কুরবানীদাতা নির্দিষ্ট পরিমাণ গোশত দিতে বাধ্য হয় অন্যদিকে একবার গোশত দান করে আবার দান ফিরিয়ে নেয় এই উভয় বিষয় শরীয়তে আপত্তিকর। মনে রাখতে হবে কুরবানীর আমল ব্যক্তিগত আমল। কুরবানীর গোশত অন্যকে দেয়া না দেয়া প্রত্যেকের ইচ্ছাধীন বিষয়। বাধ্যবাধকতা আরোপের কারণে নানা ধরনের আপত্তিকর বিষয়ের অবতারণা হবে। তাই এসব প্রচলন বন্ধ করা উচিত।

 

১৬.  কসাই বা কুরবানীর কাজে সাহায্যকারীকে কেউ কেউ পারিশ্রমিকের সাথে  কিছু গোশত দিয়ে দেয়ার শর্ত করে। তাতে তারা কম পারিশ্রমিকে রাজি হয়ে যায়।

অথচ পারিশ্রমিকের সাথে কুরবানীর গোশতের কোন সম্পর্ক নেই। এভাবে শর্ত করে যে পরিমাণ গোশত দিবে তার মূল্য সদকা করে দিতে হবে। তবে শর্ত ছাড়া পূর্ণ পারিশ্রমিক দেয়ার পর যদি গোশত দেয় তাহলে কোন সমস্যা নেই।

কেফায়াতুল মুফতি ৮/২৬৫ , বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪

১৭. শরিকে কুরবানী করলে গোশত বন্টনের ক্ষেত্রে কেউ কেউ মনে করে ওজন করার দরকার নেই। অনুমান করে ভাগ করলেই চলবে। একটু কম বেশি হলে অসুবিধা নেই।এর জন্য পরস্পর মনমালিন্য হবে না।

এই ধারণা ঠিক নয়।শরিকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বন্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয় ।

আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭

 

১৮.  বর্তমানে শহরের বিভিন্ন স্থানে এবং কোন কোন গ্ৰামগঞ্জে দেখা যায়, কুরবানী দাতার বাড়ির সামনে গরিব শ্রেণীর মানুষ গোশত নেয়ার জন্য ভিড় করে, লাইন দিয়ে তাদের গোশত বিতরণ করা হয়!

এই পদ্ধতিতে গোশত বিতরণ করা ইবাদতের শান নয়। কুরবানীর গোশত বিতরণ করা তো মানুষকে আল্লাহর পক্ষ থেকে মেহমানদারীতে অংশগ্রহণ করানোর নামান্তর। কাজেই আমার সম্মানিত মেহমানকে যেভাবে আপ্যায়ন করি সেভাবেই কুরবানীর গোশত দিয়ে গরিবের আপ্যায়ন করা উচিত এবং কখনো মেহমানকে হাদিয়া দিলে মেহমানের কষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে তার কাছে পৌঁছে দেই  সেভাবেই কুরবানীর গোশতের হাদিয়া তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া উচিত।

-সূরা হজ্ব (২২) : ১৩৬, সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৭২; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৪৪২৬; মুআত্তা মালিক, হাদীস ২১৩৫

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকভাবে বোঝার এবং আমল করার তাওফিক দান করুন ।আমীন।

 লেখক: ইমাম ধানমণ্ডি ভূতের গলি জামে মসজিদ

পূর্ববর্তি সংবাদচীনে গির্জা ধ্বংস, যিশুর জায়গায় চীনা প্রেসিডেন্টের ছবি
পরবর্তি সংবাদকরোনা ভ্যাকসিন বণ্টনে ন্যায্য নীতিমালা করার আহ্বান জানাল বাংলাদেশ