হজ মুমিনের স্বপ্ন, মুমিনের ভালোবাসা

মুহাম্মদ আব্দুস সালাম ।।

আমরা এখন যাপন করছি একটি বরকত পূর্ণ সময়। হজের মৌসুম, সম্মানিত মাস, পুণ্যময় দশ রজনী আর তাসবীহ তাকবীর ও কোরবানিময় দিনরাত। এটি মুমিনের জন্য বছরের সেরা দুটি সময়ের একটি। আর অপরটি হচ্ছে রমযান মাস।

প্রতি বছর এই সময় হজের উদ্দেশ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটতে থাকে পৃথিবীর দিক দিগন্ত থেকে বাইতুল্লাহ ও মসজিদে নববির আঙিনায়। মক্কা মদিনার সাথে সাথে পুরো মুসলিম বিশ্বময় সৃষ্টি হয় হজের ঈমান জাগানিয়া এক আমেজ ও আবহ।

কিন্তু এবার তৈরি হলো কোভিড ১৯ এর প্রকোপে এক ভিন্ন চিত্র। পাশ্চাত্যায়নমুখী সৌদি সরকার করোনার ঝুঁকি এড়াতে সম্ভাব্য বিকল্পের পথে না গিয়ে বরং একক সিদ্ধান্ত দিলো, এবার বাইরের দেশ থেকে কেউ হজে আসতে পারবে না। রাজার ঘোষণা আবার তার ‘রাজ্য’ বলে কথা!

সৌদির এই অবস্থানে কষ্ট পেয়েছে মুসলিম বিশ্ব। ব্যথিত হয়েছে হজে গমনেচ্ছু প্রতিটি মুমিন। কেনই বা হবে না! হজ তো ইসলামের অন্যতম রোকন ও ফরয বিধান। হজ মুমিনের ভালোবাসা ও স্বপ্নময় ভুবন। মুমিন জীবন জুড়ে স্বপ্ন দেখে বায়তুল্লাহর হজ ও যিয়ারতে মদিনার। মুমিন সারাটি জীবন ধরে কাবা, মাতাফ, তালবিয়া, মাকামে ইবরাহিম, হজরে আসওয়াদ, সাফা মারওয়া, ও মসজিদে হারামের সম্মোহনে আবেগাপ্লুত হয়ে থাকে এবং রওযায়ে নববির শীতল শিশির, সাহাবাগণের স্মৃতি বিজড়িত মদিনার অলিগলি এবং হিজাযের প্রতিটি ধূলিকণার ছোঁয়া পেতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। তাই দেখা যায়, সামর্থ্যবানরা ব্যয়বহুল যাত্রা হওয়া সত্বেও বারবার ছুটে যান মক্কা মদিনার পথে। আর সামর্থ্য যাদেরকে সঙ্গ দেয়নি তারা প্রভুর দরবারে হাত তুললে হজের তাওফিক দানের প্রার্থনা করতে ভোলে না। দেখা যায় অনেক হতদরিদ্র দিনমজুরও কানাকড়ি করে সঞ্চয় করতে থাকে হারামাইনের প্রাঙ্গণে ছুটে যাবার জন্য।

এই স্বপ্ন, এই ভালোবাসা, এই ব্যাকুলতা ও প্রেরণা মুমিনের ঈমান, ঈমানের আবহ এবং রবের প্রতি ভালোবাসা ও ভালোবাসার উন্মাদনা। হজ মানে তো রবের ঘরের অতিথি-সম্মানে ভূষিত হওয়া। রবের বিশেষ সান্নিধ্য লাভ করা। তার দরবারে সরাসরি তার সাথে কথা বলা এবং তার ভালোবাসায় তার দুয়ারে নিজেকে চূড়ান্তভাবে সমর্পিত করা। হজ মানে তো আল্লাহর প্রতি বান্দার পূর্ণ বিশ্বাস ও অন্তহীন অবোধ ভালোবাসা। এই যে হজের আমলসমূহ, তার সব তো আল্লাহর প্রতি ইবরাহিম আ. ও তার পরিবারের ঈমান ও ভালোবাসার এবং তাদের প্রতি আল্লাহর সীমাহীন ভালোবাসার স্মৃতি স্মারকই। কেমন ছিল সেই ভালোবাসা! যা তিনি এতই পছন্দ করলেন যে, কেয়ামত অবধি আগত ও আগতব্য উম্মাহর জন্য তা পালনের ধারা চালু করে দিলেন। এমনও কি হয় ভালোবাসার প্রকাশ!

তো এবারও বিশ্বের মুসলমানগন সেই ভালোবাসার টানে ও ইবরাহিমি আহবানে সাড়া দেবার লক্ষ্যে অপেক্ষা করছিলেন বছরজুড়ে। কিন্তু যখন সময় ঘনিয়ে এলো। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এগিয়ে এল হজের মৌসুম, আর তখনই তাদের হৃদয়গুলোকে ভেঙে দিল একটি ঘোষণা।

এবার সৌদির সীমিত কিছু লোক ছাড়া বাকিরা হজ করতে পারবে না। কিন্তু তাই বলে কি এই হজের মৌসুমে আমাদের কোন করণীয় নেই? অবশ্যই আছে। আমরা তো অবস্থান করছি হজের দিনগুলোতেই। যিলহজের ফযিলতপূর্ণ প্রথম দশকে। এই সময়গুলোর আবেদন আছে আমাদের ওপর অনেক কিছুরই। যেমন, রোযা রাখা, নফল ইবাদত আমল বাড়িয়ে দেয়া, রাত জাগরণ করা, সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা, তাওবা ইস্তেগফার করা, সম্মানিত মাসের সম্মান রক্ষা করা, আগতব্য তাকবীরে তাশরীকের দিনগুলোতে তার প্রতি যথাযথ যত্নবান হওয়া ও কোরবানি আদায়ের প্রস্তুতি নেয়া।

হজের মলূ উদ্দেশ্য তথা আল্লাহর নৈকট্য, সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভের জন্য অন্য সকল ইবাদত ও আমলের মাধ্যমে চেষ্টা করে যাওয়া। হজ সম্পর্কে কোরআন সুন্নাহর যেই শিক্ষা ও নির্দেশনা রয়েছে এবং যুগে যুগে আল্লাহ-পাগলদের হজ সম্পর্কিত যেই জ্যোতির্ময় ইতিহাস রয়েছে সেসব অন্তত এই হজের দিনগুলোতে বিস্তারিত পড়ে নেয়া। প্রতি বছর হজ ও কোরবানি আমাদেরকে যেসব বার্তা দিয়ে যায় সেগুলো হৃদয়ে ও বাস্তব জীবনে ধারণ করা। আর রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিদায় হজের ভাষণটি তো অতি প্রসিদ্ধ। সেই ভাষণের প্রতিটি কথা আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে অতি প্রাসঙ্গিক। তাই সেই মহিমান্বিত অমোঘ ভাষণটি এই মুবারক দিনগুলোতে নতুন ভাবে আবারো চর্চার প্রয়াস নেয়া।

সর্বোপরি হজ করতে না পারার আক্ষেপ হৃদয়ে জাগরুক রেখে এবং তা যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্রোধ ও বঞ্চনা না হয় সেই ভয় মনে পোষণ করে তার দরবারে প্রার্থনা করতে থাকা, তিনি যেন আমাদেরকে ক্ষমা করেন। যেন করোনার এই সংকট অতি দ্রুত দূর করে দেন। পৃথিবীকে আবারো স্বাভাবিক করে দেন এবং বিশ্বের সকল মসজিদসহ তার প্রিয় কাবা ও প্রিয় নবীর রওযা কে উন্মুক্ত করে দেন সকল মুমিনের জন্য। তিনি তো সব কিছুর মালিক। সবকিছু তারই অধীন।

পূর্ববর্তি সংবাদহাসিনা-ইমরান ফোনালাপে ছিল কাশ্মির ইস্যুও
পরবর্তি সংবাদআয়া সোফিয়ার নামায নিয়ে গ্রীস-তুরস্কের বাদানুবাদ, গ্রীসের গির্জায় শোক ঘন্টা