নদী আর ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার চামড়া

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: ‘পানির দরে’ কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হওয়ায় চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় কোথাও চামড়া ফেলা হচ্ছে ভাগাড়ে, ডাস্টবিনে। আর কোথাও সোজা নদীতে।

অবহেলা, সিন্ডিকেট, কম দাম ইত্যাদি নানা কারণে এবার প্রচুর চামড়া নষ্ট হচ্ছে। চট্টগ্রামের হাটহাজারী সড়ক থেকে প্রায় আট হাজার নষ্ট চামড়া উদ্ধার করে ফেলে দিয়েছেন সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা। এ ছাড়া নগরের চৌমুহনী, পাথরঘাটা, চামড়ার গুদাম এলাকা থেকেও আরও নষ্ট চামড়া ফেলে দেওয়া হয়।

সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. মোরশেদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা থেকে আনা কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে। আড়তদারদের গাফিলতি ছিল। দেরি করেছে। দাম কম দিতে চেয়েছে বলে এসব চামড়া অনেকে বিক্রি করতে পারেনি। এ ছাড়া সুন্নিয়া আহম্মদিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রায় পাঁচ হাজার চামড়া নষ্ট হয়েছে। এই চামড়াগুলো আড়তদারেরা কিনে নিয়েছিলেন। কিন্তু শ্রমিকের অভাবে সঠিক সময়ে লবণ দিতে পারেনি। এভাবে প্রায় ১৫ হাজার চামড়া নষ্ট হয়েছে।

বিবিরহাট আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ থেকে বিকেলে নষ্ট চামড়াগুলো সিটি করপোরেশন সরিয়ে নেয়। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন চামড়া কেন নষ্ট হয়েছে সে বিষয়ে আড়তদারদের কাছ থেকে কৈফিয়ত চেয়েছেন। এর আগে সকালে উপজেলা থেকে আসা পচে যাওয়া সরাতে গেলে আড়তদারদের লোকজন বাধা দেয়। তাদের দাবি এই চামড়া আড়তদারেরা কিনেছে। এ নিয়ে পরিচ্ছন্ন কর্মীদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়। পরে এসব চামড়া রাস্তা থেকে তুলে ময়লার গাড়িতে করে নিয়ে যায় পরিচ্ছন্ন কর্মীরা।

চামড়া নষ্ট হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির আহ্বায়ক মাহবুব আলম বলেন, উপজেলা থেকে আনা কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে। যার কারণে কেনা যায়নি। প্রায় আটশো চামড়া রিফ লেদার নিয়ে গেছে। এগুলো কিছুটা নষ্ট ছিল। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা হাজার দু-এক নষ্ট চামড়া ফেলে দিয়েছে। এবার সার্বিকভাবে কোরবানি কম হয়েছে। তবে গতবারের মতো চামড়া নষ্ট হয়নি।সব মিলিয়ে (গরু–ছাগল) চার লাখের বেশি চামড়া সংগৃহীত হয়নি বলে তাঁর অভিমত।

ব্যবসায়ীদের মতে করোনার কারণে অনেকে গরু না দিয়ে ছাগল কোরবানি দিয়েছে। যার কারণে চামড়া সংগ্রহ তুলনামূলক কম হয়। এ ছাড়া দামও ছিল অনেক কম। চট্টগ্রামে প্রায় আড়াই শ আড়তদার রয়েছে। তারা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার কয়েক দিন পর ঢাকা থেকে ট্যানারি মালিকেরা এসে এগুলো কিনে নেবেন।

আড়তদার সমিতির সাবেক সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, এবার চামড়া একটু কম হয়েছে। কিছু চামড়া গ্রামেগঞ্জে লবণ দিয়ে রাখা হয়েছে। তবে সেভাবে কোনো চামড়া নষ্ট হয়নি। সুন্দর ব্যবস্থাপনা ছিল। কয়েক দিন পর ঢাকার কারখানা থেকে লোকজন এসে চামড়া নিয়ে যাবেন। এখনই প্রক্রিয়াজাত করে রাখা হয়েছে।

এদিকে রাজশাহীতে এবার কোরবানির চামড়া বিক্রি হয়েছে পানির দরে। গত বছরের তুলনায় এবার কোরবানির পশুর চামড়ার দাম ২০-২৯ শতাংশ কমিয়ে নির্ধারণ করেছিল সরকার। সেই দামও পাওয়া যায়নি চামড়া বিক্রির সময়। ছাগলের চামড়া রাজশাহীতে ৫ থেকে ৩০ এবং গরুর চামড়া ১০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

মৌসুমী ব্যবসায়ীরা অবশ্য একটু বেশি দামে চামড়া কিনেছিলেন। তারা ধরা খেয়েছেন। আড়তে বিক্রি করতে না পেরে সেই চামড়া পদ্মা নদীতেও ফেলে দিতে দেখা গেছে।

প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার তারাই ঠিকমতো বাজার বুঝতে পারেননি। একদিনের জন্য চামড়া কিনতে এসে মৌসুমী ব্যবসায়ীরাও বোঝেননি। ফলে তাদের লোকসান বেশি। একজন মৌসুমী ব্যবসায়ীও লাভ করতে পারবেন না।

চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। রাজধানীতে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ৩৫-৪০ টাকা। আর রাজধানীর বাইরে দেশের অন্যান্য জায়গায় দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ২৮-৩২ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম ধরা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ২৮-৩২ টাকা। এছাড়া চামড়ার দরপতন ঠেকাতে ঈদের তিনদিন আগে কাঁচা ও ওয়েট-ব্লু চামড়া রফতানির অনুমতি দিয়েছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

ঈদের দিন রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চামড়া ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামও দিতে চাইছিলেন না। চামড়া দেখে তারা নিজেরা ইচ্ছে মতো দাম নির্ধারণ করছিলেন। ক্রেতা-বিক্রেতার কোন দরকষাকষি দেখা যায়নি। এক রকম নিজেদের নির্ধারণ করে দেয়া দামেই চামড়া কিনছিলেন ব্যবসায়ীরা। চামড়া নিতে তাদের খুব একটা আগ্রহও দেখা যায়নি। মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনতে দেখা গেছে। আর বড় আকারের গরুর চামড়ার দাম দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। ছাগলের চামড়ার দাম দেয়া হয়েছে ৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কুমরপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু জাফরসহ সাতজন ব্যক্তি একসঙ্গে একটি গরু কোরবানি দেন। আবু জাফর বলেন, আমাদের গরুটার দাম ছিল ৯০ হাজার টাকা। মাংস হয়েছে চার মণ। চামড়ার দাম ২০০ টাকা। এ দামেও চামড়া কিনছিলেন না ব্যবসায়ী। এক রকম জোর করেই তাকে চামড়াটা দেওয়া হয়েছে। আমাদের এলাকায় পাঁচ টাকাতেও খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে।

এদিকে, দর দামে না হলে প্রকৃত ব্যবসায়ী চলে যাওয়ার পর কোথাও কোথাও সামান্য কিছু দাম দেশি দিয়ে মৌসুমী ব্যবসায়ীদের চামড়া কিনতে দেখা গেছে। কিন্তু সেসব চামড়া আর কেনা দামেও তারা বিক্রি করতে পারেননি। এতে তারা লোকসানে পড়েন। রবিবার সকালে রাজশাহী নগরীর আই-বাঁধ এলাকায় কয়েকজন মৌসুমী ব্যবসায়ীকে প্রায় দেড় হাজার গরু-ছাগলের চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দিতে দেখা গেছে।

এসব ব্যবসায়ীরা জানান, তারা রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে চামড়া কিনেছেন। তারপর বিক্রির জন্য চামড়া রাজশাহী নগরীর রেলগেট এলাকায় আড়তে নিয়ে যান। কিন্তু তারা যে দামে কিনেছেন তার তিন ভাগের এক ভাগও দাম বলা হয়নি। এসব চামড়া তাদের অন্য কোথাও বিক্রি করতে বলা হয়। কিন্তু তারা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, কোথাও চামড়ার চাহিদা নেই। তারা যে দামে চামড়া কিনেছেন তার অর্ধেক দামও পাবার সম্ভাবনা নেই। তাই ক্ষোভে তারা এসব চামড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছেন।

রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ বলেন, আমাদের বকেয়া টাকা পড়ে আছে ট্যানারি মালিকদের কাছে। করোনার কারণে হাতেও টাকা নেই। সরকার কমিয়ে দাম নির্ধারণ করে দিলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে সেই দামেও চামড়া কেনার টাকা নেই। ফলে কম দামে তারা চামড়া কিনেছেন।

তিনি জানান, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা নিজেরা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা ঢাকায় ট্যানারি মালিকদের কাছে পাঠান না। তারা কেনার পর সেই চামড়া আবার প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রি করেন। কিন্তু এবার তাদের কাছ থেকে চামড়া কেনার আগ্রহ নেই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের। এ কারণে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।

রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর জানিয়েছে, কোরবানির আগে জেলায় গরু-মহিষ ছিল প্রায় এক লাখ। আর ছাগল ছিল দুই লাখ ২৮ হাজার। অন্যান্য পশু ছিল ৪২ হাজার। সব মিলে কোরবানির জন্য পশু ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার। জেলায় আড়াই লাখের মতো পশু কোরবানি হওয়ার কথা। তবে প্রকৃত হিসাবটা এখনও প্রস্তুত হয়নি।

পূর্ববর্তি সংবাদকরোনা সাধারণ পানিতেই মরবে, রুশ বিজ্ঞানীদের দাবি
পরবর্তি সংবাদবিষাক্ত মদ খেয়ে ভারতে ৮৬ জনের মৃত্যু