১৪৪০ হি. রাবেতার মক্কা সনদ নিয়ে বাংলাদেশের এক শীর্ষ আলেমের অভিমত

ইসলাম টাইমস ডেস্ক:  ১৪৪০ হিজরীর শেষে রাবেতা আলমে ইসলামীর পক্ষ থেকে মক্কা মুকাররমায় ‘কিয়ামুল ওয়াসাতিয়্যাহ ওয়াল ইতিদাল ফী নুসূসিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’ তথা ‘কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ’ শিরোনামে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যবর্গের পক্ষ থেকে ‘ওয়াছীকাতু মাক্কাতাল মুকাররামা’ বা ‘মক্কা সনদ’ নামে ২৯টি ধারা সম্বলিত একটি প্রজ্ঞাপন জারি হয়। আর এই সনদকে জুড়ে দেওয়া হয়- ‘ওয়াছীকাতুল মাদীনা মুনাওয়ারা’ তথা ‘মদীনা সনদ’-এর সাথে। বলা হয় যে, এটি নাকি সেই ‘মদীনা সনদ’-এর আলোকেই প্রস্তুতকৃত!

এ সম্মেলন সম্পর্কে বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মালেক লেখেন,  এই সম্মেলনে যাকে ‘মক্কা সনদ’ নাম দেওয়া হয়েছে এবং ঐতিহাসিক ‘মদীনা সনদ’-এর সাথে মেলানো হয়েছে, তাতে ইসলামের তালীম নেই; রয়েছে পশ্চিমা দর্শনের তরজুমানী। এতে পশ্চিমাদের গলায় গলা মিলিয়ে তো সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে খুব বলা হয়েছে, কিন্তু এ ব্যাপারে টু শব্দটিও করা হয়নি, যারা সন্ত্রাস মোকাবেলার নামে দুনিয়াব্যাপী হত্যা লুণ্ঠন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালিয়ে বেড়াচ্ছে- তাদের ও তাদের দোসরদের কী বিধান হবে। তাদেরও বা কী বিধান হবে, যারা অস্পষ্ট শব্দ ও গোঁজামিল দিয়ে ইসলাম ও শরীয়তে ইসলামের উপর ওদের চিন্তা-দর্শন আরোপ করে যাচ্ছে।

তিনি আরও লেখেন, কোনো সন্দেহ নেই, এই প্রস্তাবনাকে ‘মক্কা সনদ’ নাম দেওয়া এবং ‘মদীনা সনদ’-এর সাথে তুলনা করা হারামাইন শরীফাইনের আদব পরিপন্থী। ‘মদীনা সনদ’-এ জিহাদ ও কিতাল ফী সাবীলিল্লাহ্র কথা আছে। ‘মদীনা সনদ’-এ সেক্যুলার রাজত্ব নয়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের রাজত্বের উল্লেখ আছে। এ সুপারিশ যদি বাস্তবেই মক্কা সনদ হত এবং প্রকৃত অর্থেই মদীনা সনদের প্রতিচ্ছায়া হত তাহলে তাতে এ আহ্বান অবশ্যই থাকত- মুসলিম শাসকবর্গ সকলে নিজেদের শাসনকার্য কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামী শরীয়া মোতাবেক বানিয়ে নিন। আল্লাহর যমীনে আল্লাহর বিধান কার্যকর করুন। আল্লাহর হুকুম মোতাবেক আল্লাহর মাখলুকদের পরিচালনা করুন।

‘সুপারিশে একথাও থাকত- বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান এবং বিধান একমাত্র ইসলামের নিকটেই রয়েছে। অতএব সন্ত্রাস দমনের অধিকার রয়েছে একমাত্র ইসলামেরই। তাই সময়ের অনিবার্য দাবি হল, মুসলিম শাসকবর্গ একসাথ হয়ে সন্ত্রাস মোকাবেলার নামে যারা হত্যা লুণ্ঠন ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঝাণ্ডা বুলন্দ করা। ইসলামী জিহাদই একমাত্র বিষয়, যা সর্ব প্রকার ত্রাস-ফাসাদ ও জুলুম নিগ্রহ দূর করতে পারে। এই ইলাহী নির্দেশনার সম্বোধিত পাত্র এবং তা কার্যকর করার যিম্মাদার তো মুসলিম শাসকেরাই।’ যোগ করেন এই বিদগ্ধ আলেম।

মধ্যপন্থার সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে এই আলেম মাসিক আল কাউসারে আরও লেখেন, “ইসলাম একমাত্র সত্য এবং ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এর শিক্ষাসমূহ বাড়াবাড়ি ও শৈথিল্য এবং সর্ব প্রকার প্রান্তিকতামুক্ত ন্যায়-নিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত। তবে ইসলামের মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ তো সেই মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধ, যা মানবের স্রষ্টা শরীয়তদাতা স্বয়ং রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং তাঁর আখেরী নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ব্যাখ্যাকৃত এবং বাস্তবায়িত। এ তো সেই মধ্যপন্থা নয়, ওহীর নূর থেকে বঞ্চিতরা যাকে মধ্যপন্থা বলে। আর ওই মধ্যপন্থাও নয়- পশ্চিমা-চিন্তাধারায় প্রভাবিত প্রাচ্যের চিন্তাবিদরা ওদের সুরে সুর মিলিয়ে যাকে মধ্যপন্থা বলে। ইসলামের মধ্যপন্থার প্রথম কথাই হচ্ছে ‘শাহাদাত বিল হক্ব’- সত্যের সাক্ষ্য প্রদান। যেখানে এই উম্মতকে ‘উম্মতে ওয়াসাত’-মধ্যপন্থী উম্মত বলা হয়েছে সেখানে এই শাহাদাতের বৈশিষ্ট্যের বিবরণও এসেছে। ইরশাদ হয়েছে-

وَ كَذٰلِكَ جَعَلْنٰكُمْ اُمَّةً وَّسَطًا لِّتَكُوْنُوْا شُهَدَآءَ عَلَی النَّاسِ وَ یَكُوْنَ الرَّسُوْلُ عَلَیْكُمْ شَهِیْدًا.

(হে মুসলিমগণ!) এভাবেই আমি তোমাদেরকে এক মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা অন্যান্য লোক সম্পর্কে সাক্ষী হও এবং রাসূল হন তোমাদের পক্ষে সাক্ষী। -সূরা বাকারা (২) : ১৪৩

যেখানে ‘উম্মতে ওয়াসাতের’ সমর্থ শব্দে এই উম্মতকে ‘খাইরে উম্মত’ বলা হয়েছে সেখানে তাদের বৈশিষ্ট্য বিবৃত হয়েছে- ‘আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার’। ইরশাদ হয়েছে-

كُنْتُمْ خَیْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَ تُؤْمِنُوْنَ بِاللهِ.

তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত! মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান কর, অসৎকার্য হতে নিষেধ কর এবং আল্লাহ্র প্রতি ঈমান রাখ। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১১০

ভারি আশ্চর্যের কথা, মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের নামে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল বটে, তবে সেখানে ঘোষিত প্রস্তাবনায় না শরীয়তে ইসলামিয়ার কথা আছে, যা মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের একমাত্র সুসংহত ও সুরক্ষিত ইলাহী শরীয়ত, আর না রয়েছে ‘আমর বিল মারূফ ও নাহি আনিল মুনকার’-এর বিন্দুমাত্র ইশারা।”

প্রসঙ্গত, ১৩৮১ হিজরী মোতাবেক ১৯৬২ ঈসাব্দতে হজ্বের মৌসুমে গোটা বিশ্বের ইসলামী ব্যক্তিত্ববর্গের উপস্থিতিতে মক্কা মুকাররমায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রাবেতা আলমে ইসলামী’ বা ‘ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগ’। এর উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের সামনে দ্বীন-ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেয়া, ইসলামের উপর আরোপিত আপত্তিসমূহের জনসাধারণের বোধগম্য ভাষায় জবাব দেয়া, বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের সংকট নিরসনে এগিয়ে আসা। রাবেতা চায়- উম্মতে মুসলিমা যেন কিতাব ও সুন্নাহ পাবন্দ হয়ে যায়। ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সকল স্তরে যেন শরীয়তে ইসলামিয়া যথাযথ বাস্তবায়িত হয়।

রাবেতার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন রয়েছে। তন্মধ্যে ‘আল মাজমাউল ফিকহী’ তথা ‘ফিকহ একাডেমি’ (মাজমা মক্কা) সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৩৮৪ হিজরীতে তা প্রতিষ্ঠা হয়। ইসলামী শরীয়ার বিধি-বিধান এবং নিত্যনতুন বিষয়াবলির ক্ষেত্রে শরীয়তের সমাধান স্পষ্ট করা এবং এর ব্যাখ্যা প্রদান করা একাডেমির একটি উল্লেখযোগ্য প্রশংসনীয় দিক। ইতিমধ্যে রাবেতার মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় কাজ সামনে এসেছে।

তবে বর্তমানে রাবেতার নিয়ন্ত্রণ এমন কিছু লোকের হাতে যারা পশ্চিমা চিন্তা-চেতনা দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত। তারা পশ্চিমাদের মস্তিষ্কে চিন্তা করেন এবং তাদের সুরে সুর মিলিয়ে কথা বলেন। ‘কিয়ামুল ওয়াসাতিয়্যাহ ওয়াল ইতিদাল’ শিরোনামের সম্মেলন এবং ‘মক্কা সনদ’ মূলত এরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

 

পূর্ববর্তি সংবাদনিউজিল্যান্ডে করোনা সংক্রমণ নেই, ১০০ দিন পূর্ণ হল
পরবর্তি সংবাদবৈরুতে নিখোঁজ বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার