মুফতী আযীযুর রহমান উসমানী রহ.: অন্তিম মুহূর্তেও ব্যস্ত ছিলেন মানুষের দ্বীনী সমাধানে

ছাদীক আতফাল।।

দারুল উলূম দেওবন্দ। ভক্তি ও ভালবাসার একটি নাম। শ্রদ্ধা ও আস্থার একটি ঠিকানা। ভারতবর্ষের মুসলমানদের দ্বীন-ঈমান হেফাযতে দারুল উলূম দেওবন্দ এবং উলামায়ে দেওবন্দের অবদান তুলনাহীন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে দারুল উলূম দেওবন্দের অনুসারী অসংখ্য মাদরাসা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ-মহাদেশে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য ‘দারুল উলূম’। এর সন্তানেরা ইলমে নববীর সূধা বিতরণ করে চলেছে বিশ্বের আনাচে-কানাচে। বিশ্বব্যাপী হেদায়েতের আলো ছড়িয়ে দিতে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতে দারুল উলূম দেওবন্দের সন্তানদের রয়েছে অনন্য অবদান।

এই দেওবন্দেরই এক কৃতী সন্তান ছিলেন হযরত মুফতী আযীযুর রহমান উসমানী রাহ.। আকাবিরে দেওবন্দের তালিকার শীর্ষে যে নামগুলো উচ্চারিত হয় তার একটি হিন্দুস্তানের মুফতী আযম মুফতী আযীয রাহ.। আযীযুর রহমান মানে দয়াময় আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা। হাঁ, বাস্তবেই আল্লাহ তাআলার প্রিয় হওয়ার মতো অনেক গুণ ছিল তাঁর মাঝে।

তিনি ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের সর্বপ্রথম মুফতী। প্রায় দীর্ঘ চল্লিশ বছর তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে ফিক্হ-ফতোয়ার খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। দেওবন্দে তার উপাধি ছিল ‘মুফতী আযম’।

তাঁর হাত ধরে অনেক তালিবুল ইলম ফিক্হ-ফতোয়ার কাজ শিখেছে। পাকিস্তানের মুফতী আযম মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ. ছিলেন তাঁর শাগরেদদের একজন। এরকম বড় বড় আলেমগণ ছিলেন হযরতের ছাত্র।

এত বড় আলেম হওয়া সত্ত্বেও হযরতের জীবন-যাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। দেখলে বোঝার উপায় ছিল না, তিনি এত বড় আলেম, এত বড় বুযুর্গ। আর তাঁর আখলাকের কথা!  সুবহানাল্লাহ! অসাধারণ বিনয়ী এবং অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের সাদা দিলের একজন মানুষ ছিলেন তিনি।

দিল ছিল একেবারে নরম। কখনো কারো উপর রাগ হতেন না। কঠোরতা জানতেনই না। কাউকে কিছু বলতেন না; বলা যায়, বলতে পারতেন না। এমনকি তার বিরুদ্ধে কেউ মুখিয়ে উঠলেও ভদ্রতা তাকে জবাব দিতে বারণ করত। এমনই নানাবিধ অনন্য গুণের অধিকারী ছিলেন এই মহান বুযুর্গ।

তাঁর জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল, তিনি ছিলেন খিদমতে খাল্ক তথা মানবসেবার জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাঁর জীবন-রুটিনের একটি অংশ জুড়ে থাকত মানুষের সেবা করা। তিনি কেবল নিজের কাজ নিজেই করতেন- তা নয়; অন্যের কাজ করে দেওয়াও ছিল তাঁর একটি বড় কাজ।

আল্লাহর এ প্রিয় বান্দা নিজের ঘরের বাজার নিজেই করতেন। শুধু কি তাই?! বাজারে যাওয়ার আগে প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা করে যেতেন- কারো কিছু লাগবে কি না। বিশেষ করে এলাকার অসহায় বিধবা নারীরা, যাদের ঘরে কর্মক্ষম পুরুষ থাকত না, তিনি যেন ছিলেন তাদের আস্থার স্থল, তাদের খাদেম। বাজারে যাওয়ার সময় তিনি তাদের প্রয়োজন জেনে যেতেন। যার যা লাগত- গোশত, সব্জি, তরি-তরকারি ইত্যাদি নিত্য প্রয়োজনীয় সব নিজেই কিনে আনতেন। বাজার করতে করতে প্রায় সময়ই তা বোঝার রূপ নিত। হাতে করে তা আনা সম্ভব হত না। তখন তিনি কাঁধে-কাঁখে করে সে বোঝা বহন করে নিয়ে আসতেন। নিজ হাতে পৌঁছে দিতেন যার যার ঘরে।

হাঁ, এ কাজগুলো তিনিই করতেন, যিনি ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের মতো মহান প্রতিষ্ঠানের প্রধান মুফতী! হিন্দুস্তানের মুফতীয়ে আযম! এত বড় বড় আলেম-উলামা ছিলেন যার ছাত্র! তিনি নিজেই এ কাজগুলো করতেন।

শুধু তাই নয়, কখনো এমনও হত, বাজার আনতে গিয়ে কিছুটা বেশকম হয়ে গেছে। সবসময় অন্যের জিনিস তো আর তার মনমতো হয়ে ওঠে না। তো যার এমন হত সে অনেকসময় তাঁকে ঠাস করে বলে বসত- মৌলবী ছাহেব, আপনি আমার সদাই তো ঠিকমতো আনতে পারেননি। এই এই সদাই ঠিক মতো আসেনি। আপন ভেবেই তারা তাঁকে এভাবে বলত। হযরতেরও মন-দিল কতটা ছাফ ছিল! তিনি আবার বাজারে গিয়ে তার সদাই বদল করে সে যেভাবে চেয়েছে সেভাবে নিয়ে আসতেন।

বর্ষার মৌসুমে মানুষের ঘর বেঁধে দিতেন। ঘরের চাল মেরামত করে দিতেন। এভাবে গরীব অসহায় বিধবাদের যখন যা প্রয়োজন হত, হযরত বিভিন্নভাবে তাদের সহায়তা করতেন।

এটা আমাদের নবীজীর অনেক বড় সুন্নত। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা অপরের উপকারে এগিয়ে আসতেন এবং অসহায়ের সহায় হতেন। এক প্রসঙ্গে উম্মুল মুমিনীন খাদিজা রা. নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন-

إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ، وَتَحْمِلُ الكَلَّ، وَتَكْسِبُ المَعْدُومَ، وَتَقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الحَقِّ.

আপনি তো অত্মীয়তা রক্ষা করেন,  অসহায়ের ভার বহন করেন, নিঃস্বের উপার্জনের ব্যবস্থা করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং দুর্যোগ-দুর্বিপাকে (মানুষের) সহযোগিতা করেন। -সীহহ বুখারী, হাদীস ৩

তো এগুলো হল আমাদের নবীজীর সুন্নত। এই সুন্নতের অনুসরণেই তিনি এভাবে অন্যের উপকার করতেন।

উম্মতের দ্বীনী প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রেও রয়েছে মানবসেবী এ মহান মানুষটির বড় অবদান। ‘ফতোয়া দারুল উলূম দেওবন্দ’ ও ‘আযীযুল ফতোয়া’ যার সাক্ষী। তিনি মানুষের বিভিন্ন সমস্যার দ্বীনী সমাধান পেশ করতেন। দারুল উলূম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগের সূচনাকাল থেকে তিনি আজীবন মানুষের মাসআলা মাসায়েলের জবাব দিয়ে গিয়েছেন। বলতে গেলে, মানুষের জাগতিক প্রয়োজন এবং দ্বীনী জরুরত পুরা করাই ছিল তাঁর জীবন। জীবনের শেষ পর্যন্ত ফিকহ-ফতোয়া, মাসআলা-মাসায়েল, যিকির-শোগল নিয়েই মশগুল থেকেছেন তিনি। আর করে গেছেন দুঃখী মানুষের সেবা। থেকেছেন অসহায়ের সহায়  হয়ে।

এ মহান মানুষটির জীবনের শেষ মুহূর্তটিও কেটেছে মানুষের দ্বীনী সেবা করতে করতে। তাঁর সুন্দর জীবনের সমাপ্তিটিও ছিল এক সুন্দর সমাপ্তি।

১৭ জুমাদাল আখিরাহ ১৩৪৭ হিজরী মোতাবেক ০১ ডিসেম্বর ১৯২৮ ঈসাব্দ। অন্তিম মুহূর্ত। হযরত বিছানায়। দীর্ঘ চার দশক অবিরাম যে খেদমতটি করে এসেছেন আজও হাতে সেই কাজ। মানুষের পক্ষ থেকে আসা লিখিত প্রশ্ন। হযরতের হাতে একটি ছোট্ট চিরকুট। এমন সময়েও তিনি তাতে নজর বুলাচ্ছেন। সমাধান পেশ করতে হবে বলে। চলে আসল আল্লাহ তাআলার ফায়সালা। দরস-তাদরীস, ফিক্হ-ফতোয়া, তালীম-তরবিয়ত, যিকির-আযকার এবং খিদমতে খালকে উৎসর্গিত দীর্ঘ সাধনায় কর্মক্লান্ত শরীর নিথর হয়ে এল। এখনো হাতে সেই কাগজটি। ধরে রেখেছেন। অবশেষে মউত এসে হাত থেকে চিরকুটটি ছুটিয়ে রেখে দিল বুকের উপর! এভাবেই হযরত মুফতী আযীযুর রহমান লাব্বাইক বলে চলে গেলেন ‘রহমানের প্রিয়’ হয়ে।

আল্লাহ তাআলা হযরতের মাগফিরাত নসীব করুন, কবরকে নূর দিয়ে ভরে দিন। তাঁর ইলম থেকে আমাদেরকে উপকৃত করুন, তাঁর মানবসেবার আদর্শ গ্রহণের তাওফীক দিন- আমীন।

[তথ্যসূত্র : চান্দ আযীম শাখছিয়্যাত, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ., পৃ. ২৯, ৩০;  ফতোয়া দারুল উলূম দেওবন্দ, পেশ লফয : হযরত কারী তৈয়ব ছাহেব রাহ.; আকাবিরে দেওবন্দ কেয়া থে, মুফতী মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দা. বা., পৃ. ১০১, ১০২; আযীযুল ফতোয়া, ভূমিকা]