করোনা-পরবর্তী বিশ্বে প্রিন্ট মিডিয়া

হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী।।

সোশ্যাল মিডিয়ার রমরমা যখন থেকে শুরু, তখন থেকেই এ প্রশ্নটিও উচ্চারিত হতে থাকে এবং ক্রমেই জোরদার হতে শুরু করে যে, প্রিন্ট মিডিয়ার ভবিষ্যৎ কী, এটি কি টিকে থাকবে? আর এখন বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর তান্ডবের মুখে প্রশ্নটি আরো জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্বে কেমন হবে গণমাধ্যম এবং মুদ্রিত সংবাদমাধ্যমের চেহারা? তথ্যপ্রযুক্তি জগতের ডিজিটালাইজেশনের ফলে উদ্ভব হয়েছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার ইত্যাদি হরেক নামের সোশ্যাল মিডিয়ার। এসব সোশ্যাল মিডিয়া কোনো-না-কোনোভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে মিডিয়ার, হয়েছে অলিখিত, অঘোষিত প্রতিদ্বন্দ্বী। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মতো তারাও মিনিটে মিনিটে ‘খবর’ দিচ্ছে, যদিও সাংবাদিকতার মানদন্ডে সেসব কতোটা সংবাদ আর কতোটা গুজব, তা নিয়ে জোর বিতর্ক আছে।

এ বিতর্ক থেকেই উদ্ভব হয়েছে ‘ফেক নিউজ’ নামে নতুন শব্দবন্ধের। গণমাধ্যমের কয়েক শ’ বছরের ইতিহাসে তার ভাগ্যে এতোটা অপমানজনক অভিধা আর কখনও জোটেনি। শুধু অপমানই নয়, বিশ্বব্যাপী সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা এ শব্দবন্ধকে কাজে লাগিয়ে মিডিয়ার গলা টিপে ধরে তাকে বশংবদ বানানোর লক্ষ্যে নানা রঙের অপ-আইনও প্রণয়ন করে চলেছে।

মোটের ওপর বলা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ার উদ্ভবের ফলে অবাধ তথ্যপ্রবাহের যে ইতিবাচক জোয়ারের আশাবাদ জাগ্রত হয়েছিল, তা অনেকাংশে স্থান হয়ে গেছে অবাধ তথ্যপ্রবাহের পাশাপাশি অবাধ অপ-তথ্যপ্রবাহের ধারা প্রবল হাওয়ায়। এর ইতিবাচক দিকটা হলো, এর ফলে সচেতন মানুষ আবার মুখ ফিরিয়েছে মিডিয়ার মূল ধারার প্রতি। আর নেতিবাচক দিক হলো, পাঠকদের একটা বড় অংশই এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবাদ সন্ধান করে এবং নিজেরাও ভুল-শুদ্ধ সংবাদের যোগান দেয়। অবশ্য অনেকে এদের পাঠক বলেই স্বীকার করতে চান না। বলেন, পাঠক নয়, এরা হলো দর্শক। এদের পড়ার দৌড় টেলিভিশনের স্ক্রলে সংবাদ শিরোনাম পাঠ করা পর্যন্তই।

তা যেমনই হোক, সংবাদের গ্রাহক হিসেবে এ বিপুল অংশটিকে একেবারে বাদ দেয়া যাবে না। পাঠক কিংবা দর্শক, যেটাই হোন না কেন, সংবাদে এদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ আছে। আর আছে বলেই সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিশ্বব্যাপী একটা বিস্ময়কর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেখা গেছে, কোভিড-১৯ অতিমারীর কারণে একদিকে মুদ্রিত সংবাদপত্রের সার্কুলেশন বা প্রচারসংখ্যা বেশ কমে গেছে, অন্যদিকে সংবাদের প্রতি মানুষের আগ্রহ গেছে বেড়ে। সংবাদ পাওয়ার জন্য তারা টেলিভিশন, ওয়েব পোর্টাল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে হাত বাড়াচ্ছে অনেক বেশি করে। এমন অবস্থায় তো মিডিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়াই চলে। নয় কি?

কিন্তু না, বাস্তব পরিস্থিতি এমন আশাবাদে সমর্থন দিচ্ছে না, বরং অশনি সঙ্কেতই দিচ্ছে। এই তো ক’দিন মাত্র আগে করোনা অতিমারীজনিত পরিস্থিতির কথা উলে­খ করে বড় ধরনের ছাঁটাইর ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটেনের দু’টি বৃহৎ মিডিয়া আউটলেট – দ্য গার্ডিয়ান ও বিবিসি।

দ্য গার্ডিয়ান বলেছে, করোনা অতিমারীর কারণে চলতি বছর তাদের রাজস্ব আয় ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডে নেমে এসেছে। এ কারণে তারা ১৮০ জন কর্মী ছাঁটাই করবে। এদের মধ্যে ৭০ জন সম্পাদকীয় বিভাগের।

পত্রিকাটির সম্পাদক ক্যাথরিন ভিনার ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অ্যানেট টমাস কর্মীদের উদ্দেশে এক বিবৃতিতে বলেন, করোনা অতিমারীর ফলে পত্রিকার পাঠক এবং পাঠকদের চাঁদা বেড়েছে, কিন্তু বিজ্ঞাপন কমে গেছে ব্যাপকভাবে, যা গার্ডিয়ানের জন্য একটি টলটলায়মান আর্থিক অবস্থার জন্ম দিয়েছে।

একই দিন ৭০টি পদ কমানোর ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ মিডিয়া বিবিসি-ও। কারণ হিসেবে তারাও দুষেছে করোনা অতিমারীজনিত অর্থনৈতিক টানাপোড়েনকে। বলেছে, ব্রডকাস্টারদের বেতন আসে টেলিভিশনের লাইসেন্স ফী থেকে। করোনা পরিস্থিতির কারণে ওই ফী আসা বিলম্বিত হচ্ছে।

এর আগে গত জানুয়ারি মাসে সংবাদকক্ষের ৪৫০ জন কর্মী ছাঁটাই করে বিবিসি। গত জুন মাসে বিভিন্ন আঞ্চলিক সংবাদকক্ষের আরো ৪৫০ জন কর্মী ছাঁটাই করে প্রায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্থাটি। এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, আগামী দশকে বিবিসি-র অস্তিত্ব থাকবে কি?

এ রকম প্রশ্ন ওঠার সঙ্গত কারণও রয়েছে। করোনার তাণ্ডব শুরু হওয়ার আগেই সরকারের দিক থেকে প্রবল চাপে ছিল বিবিসি। তাদের বলা হচ্ছিল ১২৫ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ কমাতে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সরকার টেলিভিশনের লাইসেন্স ফী পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। সরকারের লক্ষ্য, টেলিভিশনের লাইসেন্স ফী ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করে দেয়া।

পদ কমানো প্রসঙ্গে বিবিসি নিউজ বলেছে যে তারা অ্যাংকর ও রিপোর্টারের সংখ্যা কমিয়ে ফেলবে। যারা টিকে থাকবে তাদের বলা হবে আরো বেশি বিষয় নিয়ে কাজ করতে। এছাড়া কমানো হবে স্টূডিও এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মীর সংখ্যা। ছাঁটাই থেকে বাদ যাবে না সিনিয়র ম্যানেজমেন্টও।

এ প্রসঙ্গে শোনা যেতে পারে বিবিসি নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক ফ্র্যান আনসওয়ারথ-এর অসহায় কণ্ঠস্বর। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, যদি পরিবর্তন না-করি, তাহলে আমরা টিকে থাকতে পারবো না। এ সঙ্কট প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যথার্থ পদ্ধতি নিয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে।

শুধু ব্রিটেন নয়, সারা বিশ্বেই এ রকম এক অনিশ্চিত পথে হাঁটছে মিডিয়া। ভবিষ্যতে সংবাদক্ষেত্রের বিজনেস মডেলটি কেমন হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। আর এ অনিশ্চয়তাটার জন্ম এমন এক সময়ে, যখন ইনফরমেশন বা তথ্য প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে একটি প্রধান ইস্যু।

করোনা অতিমারী দু’টি মাত্রাকেই সামনে এনে দিয়েছে। করোনার কারণে ঘরবন্দী মানুষ বেশি করে খবর জানতে চাইছে। এটা নিউজ ইন্ডাস্ট্রির জন্য উৎসাহব্যঞ্জক একটা খবর হতে পারতো। কিন্তু হচ্ছে না। কারণ, পাঠকের এ আগ্রহ ইন্ডাস্ট্রিকে কোনো আর্থিক সুবিধা দিতে পারছে না।

চলতি বছরের গোড়ার দিকে রয়টার্স ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা ও জাপানসহ বিশ্বের ৩২টি দেশে সংবাদ প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল মিডিয়ার শীর্ষ ব্যক্তিদের ওপর এক জরিপ চালায়। জরিপে ২৩৩ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়া হয়।

দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারী মিডিয়া এক্সিকিউটিভদের বেশিরভাগই নিজ কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রবল আস্থাশীল হলেও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ প্রশ্নে অতোটা দৃঢ়চিত্ত হতে পারছেন না।

স্থানীয় পর্যায়ের মিডিয়া এখানে গুরুত্বের সাথে আলোচনায় এসেছে। বলা হয়েছে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে পরিণামে তার দায়ভার পুরো মিডিয়ার ওপরই চাপে। আর এর ফলে সাংবাদিকতার ওপর সরকারের চাপ বাড়ার আশঙ্কা প্রবল হয়। এ রকম চাপদাতাদের ”রোল মডেল” হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা উলে­খ করা যায়। অবশ্য পাশাপাশি জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮৫ শতাংশই ভুয়া ও অর্ধসত্য সংবাদের বিরুদ্ধে লড়াই আরো জোরদার করার পক্ষে মত দিয়েছেন। ওই লড়াই কিভাবে হবে, সেটা এখনও পরিষ্কার নয় যদিও।

মিডিয়া পরিচালনার অর্থ কোত্থেকে আসবে, সে-বিষয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অর্ধেকই নিশ্চিত করে বলেন যে গ্রাহক চাঁদাই হবে তাদের আয়ের প্রধান উৎস। পক্ষান্তরে এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, শুধু গ্রাহক চাঁদায় চলবে না, পাশাপাশি লাগবে বিজ্ঞাপনের আয়ও। কেবল ১৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, তারা শুধু বিজ্ঞাপনের আয় দিয়েই চলতে পারবেন।

এসব মতামতের মধ্য দিয়ে মিডিয়া-মালিকদের মনোভঙ্গী পরিবর্তনটাও ফুটে ওঠে। তারা হয়তো ভাবছেন, গ্রাহক চাঁদা বাড়িয়ে আয় সমন্বয় করবেন। কিন্তু একজন গ্রাহককে সংবাদ অথবা দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় পণ্য – এ দু’টোর যে-কোনো একটিকে বেছে নিতে বলা হলে তিনি নিশ্চয়ই শেষেরটিকেই পছন্দ করবেন। সংবাদশিল্পের জন্য এটিও বড় ধরনের একটি বাস্তবতা।

অপরদিকে জনগণকে সোশ্যাল মিডিয়ার সুযোগ দানকারী ডিজিটাল প্ল্যাটফরমগুলো ক্রমেই বেশি করে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এ নিয়ে সংবাদপত্র-প্রকাশক ও মিডিয়া প্রজেক্ট লিডারদের মাঝে ব্যাপক উদ্বেগ আছে, কিন্তু উদীয়মান শক্তিকে মোকাবিলায় কোনো সর্বসম্মত কৌশল নেই।

তার ওপর এমন আশঙ্কাও জোরদার হচ্ছে যে, সরকারগুলো এমনসব আইন করবে, যাতে করে মিডিয়ার স্বাধীনতা আরো সংকুচিত হয়ে যাবে। এমন অবস্থায় মিডিয়ার ভবিষ্যৎ কী, এ প্রশ্নের জবাব বোধহয় কেবল ভবিষ্যতই দিতে পারে।