সোহবতের গল্প: এক আলেমের সান্নিধ্য যেভাবে পাল্টে দিল রাজমিস্ত্রির জীবন

মাওলানা মাহমূদুল হাসান।।

আমার মেয়ে ফাতেমাতুয যাহরা-এর বয়স এখন তের দিন চলে। মনে করেছিলাম, নরমাল ডেলিভারিতে তার আগমন হবে। কিন্তু নরমাল হোক কিংবা সিজার সবই তো উপরের ফায়সালা। আর তাকদীরের উপর খুশী থাকাই মুমিনের কর্তব্য। গত পনের জিলহজ মোতাবেক ৫ আগস্ট সকালে আমার মেয়েটির জন্ম হয়। তার আগমন উপলক্ষে হাসপাতালে তিন দিন থাকা হল।

করোনা পরিস্থিতিতে হাসপাতালে ডেলিভারি রোগী ছাড়া অন্য কোন রোগী ছিলো না। প্রাইভেট হাসপাতাল। দ্বিতীয় দিন আমাদের পাশের রুমে আরো একটি দ্বীনদার পরিবার আসে। তাদের মহিলারাও আমাদের মত পূর্ণ পর্দা করে থাকে। এবং পুরুষ ভদ্রলোককে তো দেখতে আলেমই মনে হয়। মুখে লম্বা দাড়ি, পরনে পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি। তার ছেলে কওমি মাদ্রাসায় পড়ে, হাফেজ। প্রথম দিন তাদের সাথে তেমন কোনো কথা-বার্তা হয়নি। শুধু সালাম ও হালকা কুশলাদিতে কেটে গেল। তারা পেরেশানিতে ছিল।

দ্বিতীয় দিন তাদের একটি পুত্র সন্তান হয়। এটি ছিল ভদ্রলোকের বড় মেয়ের ঘরের প্রথম সন্তান। সেদিন রাতে কৌতুহল জাগলো, তার দ্বীনদারী সম্পর্কে জানলে ভালই হতো। এমনিতেও তো হাসপাতালে রাত কাটাতে হয় জেগে থেকে। সেই থেকে মুরব্বির সাথে কথাবার্তা আলোচনা। তিনি একজন রাজমিস্ত্রি। তার দ্বীনদারীর আসল রহস্য কী? তা জানতে চেষ্টা করলাম। একে একে তিনি তার জীবন কাহিনী বললেন। তার জীবনের পরিবর্তন ছিল একজন আলেমের নেক-নজর। অনেক আগ থেকেই তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। আলেমদের সোহবত সান্নিধ্য গ্রহণ করা পছন্দ করতেন। তাদের কষ্টের কারণ হতেন না। একসময় তিনি গ্রাম থেকে ঢাকা আসেন এবং রাজের কাজ চালিয়ে যান।

Image may contain: tree, sky, plant, grass, outdoor and nature

লোকটার গ্রামের বাড়ি মনে হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ। তিনি যখন ঢাকা আসেন, ফুলবাড়িয়া মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেবের মাধ্যমে চাঁদপুর একটি বড় মসজিদের কন্টাকট নেন। সেই মসজিদের উদ্বোধন করতে আসেন খেড়িহড় মাদ্রাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা শামসুল হক সাহেব ( প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের আব্বা)। তিনি রাজমিস্ত্রি বাতেনকে  তোমার নাম কি? বাড়ি কোথায়? ঠিক মত কাজ করবে। হালাল হারাম বেঁছে চলবে। হারাম থেকে দূরে থাকবে। নামাজ পড়বে। এভাবে তিনি মসজিদ উদ্বোধন করে চলে যান।

রাজমিস্ত্রি বাতেন বলেন, চার মাস পর আমি হুজুরের সাথে গিয়ে একদিন সাক্ষাৎ করি। আমি আমার পরিচয় কিছুই বলিনি। তখন আমার মুখে দাড়ি। তিনি প্রথমে আমাকে দেখে চিনতে পারেননি। বললেন, তোমাকে কোথাও যেন দেখেছি। তারপর বললেন, তুমি অমুক মসজিদের কন্টাকটার না। তিনি আমাকে চিনতে পারলেন। তখন মুখে দাড়ি ছিল না। এখন দাড়ি আছে। তখন থেকে হুজুরের সাথে সম্পর্ক। বড় হুজুর মাদ্রাসার বিল্ডিং-এর বিভিন্ন কাজ আমার দ্বারা করিয়েছেন। মাদ্রাসার পূর্ব-পশ্চিম লম্বা বিল্ডিংটা নতুন হয়েছে। সেটির ফাউন্ডেশন এবং ফাউন্ডেশন-এর উপরের অনেকটা কাজ আমার হাতে করা। সেই এলাকায় প্রায় ছয় সাত বছর ছিলাম। বড় হুজুরের সাথে কথাবার্তা দেখা সাক্ষাৎ সব সময় চালু ছিল।

হুজুরের কাছে আমার ছেলেকে একবার নিয়ে এসেছিলাম। তিনি তাকে কোলে নিয়েছেন। এবং হাফেজ বানাতে বলেছেন। এখন সে হাফেজ। হুজুর আমাদেরকে মুড়ি চানাচুর দিয়ে মেখে খাইয়েছেন। হুজুর আমাকে বিভিন্ন সময় খেজুর নাস্তা করিয়েছেন, খানা খাইয়েছেন। পুকুরে হুজুরের সাথে গোসল করেছি।

Image may contain: house, tree and outdoor

রাজমিস্ত্রি বাতেন মিয়া আরো বলেন, হুজুর যখন বাজারে যেতেন মহিলারা তো বাজারে এমনিতেই থাকত না, পুরুষ যারা বিভিন্ন কাজে থাকতো তারা সবাই এসে হুজুরকে সালাম দিত। কারো হাতে সিগারাট থাকলে তা এমনিতেই পড়ে যেত। সবাই দোকানে নিয়ে নাস্তা করানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তো।

তিনি বলেন, আমরা হুজুরের কামরার সামনে একটি ছাপড়া ঘরে থাকতাম। সেখানে জিনদের খুব উৎপাত ছিল। হুজুরকে জানালে হুজুর বললেন, আমি মুফতি সাহেবকে বলে দেবো, যেন মুফতি সাহেব বলে দেন যে, এখানে রাজমিস্ত্রিরা থাকবে, তোমরা তাদেরকে কষ্ট দিবে না। মুফতি সাহেব যখন একথা বলে দিলেন, এরপর থেকে জিনেরা আমাদেরকে কোন কষ্ট দেয় নি।

আমি বড় হুজুরের কামরায় আসতে খুব ভয় পেতাম। যখন আমি হুজুরের কামরার সামনে দিয়ে দুর থেকে যেতাম, হুজুর বুঝে ফেলতেন, আমার টাকার প্রয়োজন। হুজুর আমাকে ডেকে এনে টাকা দিতেন। চাঁদপুর যাওয়ার দু’বছর পরই আমার পরিবার ঢাকা নিয়ে আসি। তখন থেকে আমার পরিবারে খাস পর্দা। এমনিতেও আমার পূর্ব থেকেই নিয়ত ছেলে-মেয়েদের হাফেজ আলেম বানাবো। আবার হুজুরও বলেছেন, তোমার ছেলে-মেয়েদেরকে মাদ্রাসায় পড়াবে। আমার বড় মেয়ে হাফেজাহ আলেমাহ। ছেলে হেফজ শেষ করেছে। আর দু’মেয়ে এখনো ছোট। তাদের জন্যও দোআ চাই।

Image may contain: tree and outdoor

এভাবেই হাসপাতালের রাত কেটে গেল রাজমিস্ত্রি বাতেন সাহেবের জীবন পরিবর্তনের গল্প শুনতে শুনতে। বড় ঈর্ষা হল তার জীবন নিয়ে। সত্যি, দ্বীনের উপর ওঠার জন্যে, দ্বীনের উপর চলার জন্যে, এবং দ্বীনের উপর অটল থাকার জন্যে আল্লাহওয়ালাদের সোহবতের বিকল্প নেই।

 

 

শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া বিক্রমপুর বাদশাহি মাদরাসা, আড়িয়ল, টঙ্গিবাড়ি, মুন্সিগঞ্জ,। 

২৭ যিলহজ্জ ৪১হি. ১৮ আগস্ট ২০ঈ.