কেমন হবে সামাজিক সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুস সালাম ।।

সামাজিক উন্নয়ন মানুষের ভেতরকার সৃষ্টিজাত একটি বিষয়। আল্লাহ তাআলা হযরত আদম আ. এর মাধ্যমে তার সূচনা করেছেন। কোরআন-সুন্নাহয়ও তার প্রতি নানাভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে, আদেশ করা হয়েছে। কোরআনের ভাষায়, ‘আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে পৃথিবীতে তার প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছেন।’ অতএব মানুষ প্রতিনিধিত্ব করবে পৃথিবীতে আল্লাহর দীন ও হুকুমত প্রতিষ্ঠিত করতে এবং এই পৃথিবীর আবাদ ও উন্নয়ন করতে।

কাল-পরিক্রমায় ও জীবনধারার ক্রমাগত বিকাশে সামাজিক উন্নয়নের রূপ বদলেছে, পদ্ধতি বিস্তৃত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় যোগ হয়েছে একটি বিশেষ ধরনের প্রয়াস। তা হচ্ছে দেশ ও সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা ছোট বড় অগণিত সংগঠন। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, বাণিজ্যিক, মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট, সেবামূলক ও দাওয়াহকেন্দ্রিক ইত্যাদি অসংখ্য রকমের সংগঠন। প্রতিষ্ঠাতাদের চিন্তা-চেতনা, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও কাজের ধরনের বিভিন্নতায় একেক সংগঠনের আঙ্গিক একেক রকম। তবে তাওহীদে বিশ্বাসী, সত্য-ন্যায়ের পথে অবিচল, আমানতদার ও নিষ্ঠাবান প্রতিটি সংগঠনই জাতির জন্য ইতিবাচক ও কল্যাণপ্রসু।

সংগঠন একটি সামাজিক একক বা বিশেষ কোন ঐক্যবদ্ধ কর্মপ্রয়াস। আর ঐক্যের ধর্ম ইসলাম বড় জোরালোভাবে ঐক্যের আহ্বান করেছে এবং তা প্রতিষ্ঠিত করার আদেশ দিয়েছে। কারণ মানুষ সৃষ্টির নিয়মে যৌথ ও সামাজিক জীবনে আবদ্ধ। আর যৌথ জীবনধারায় ঐক্য না থাকলে যে সমাজের পরতে পরতে বিশৃঙ্খলা নেমে আসবে, তা বলাই বাহুল্য। এজন্য ঐক্য ও সংহতির কোনো বিকল্প নেই। চাই সেই ঐক্য ছোট হোক কিংবা বড়। এবং চাই তা সকল সূত্রে হোক কিংবা কিছু সূত্রে। সর্বাবস্থায় ঐক্যের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কত হৃদয়গ্রাহী উপমা দিয়ে বলেছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

‘মুমিন মুমিনের জন্য প্রাচীর স্বরূপ। যার একাংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে। এরপর তিনি তার দু’হাতের আঙ্গুলগুলো প্রবিষ্ট করে দেখালেন।’ সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০২৬, সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৫

প্রতিটি সংগঠনই ঐক্যের ছোট ছোট প্ল্যাটফর্ম। তবে আরো বড় ও বিশাল একটি প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে সংগঠনসমূহের আন্তঃসাংগঠনিক ঐক্য। এই ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এবং প্রতিটি সংগঠন নিজ নিজ লক্ষ্যে সফল ও অগ্রসর হতে অপরিহার্য হলো, সংগঠনসমূহের পারস্পরিক সৌজন্য ও সুসম্পর্ক বিদ্যমান থাকা। পরস্পরের মাঝে যোগাযোগ ও সহযোগিতার বন্ধন থাকা। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হওয়া। কারণ, সংগঠন তো সমাজ ও জাতির উন্নয়নের জন্য। তাদের মধ্যকার সংকট, সংঘাত ও বিরোধ দূর করার জন্য। সুতরাং যদি খোদ সংগঠনগুলোই পরস্পরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কোন্দল সৃষ্টি করে বেড়ায় তাহলে যেমন সংগঠন তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে, তেমনি অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হবে। তাই সংগঠনগুলোর মাঝে পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও মেলবন্ধন আবশ্যক।

সমাজ উন্নয়নে সাংগঠনিক যাত্রা একেবারে নতুন নয়। তার ইতিহাস অনেক পুরনো। আন্তর্জাতিক সংগঠনের সূচনা খ্রিস্টীয় ষোল শতকে পাওয়া গেলেও আন্তঃদেশীয় সংগঠনের সন্ধান মেলে হাজার হাজার বছর আগে। বর্তমান বিশ্বে তো লক্ষ লক্ষ সংগঠন ও সংস্থা গড়ে উঠেছে। আমাদের দেশেও আছে অর্ধ-লক্ষের অধিক। দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। তাই বর্তমানে সংগঠন প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও সংগঠনসমূহের আন্তঃসাংগঠনিক সম্পর্ক কেমন হবে, তা অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা ও আলোচনার বিষয়। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে অনেক গবেষণা ও লেখালেখিও হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তার উপর উচ্চতর পড়াশোনা রয়েছে।

ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানে জাতি ও সমাজ উন্নয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় এ সম্পর্কে যথেষ্ট মৌলিক চিন্তা ও দিকনির্দেশনা রয়েছে। এই লেখায় সেসব থেকে কেবল তৃতীয় প্রসঙ্গ অর্থাৎ ‘সংগঠনসমূহের আন্তঃসাংগঠনিক সম্পর্ক’ বিষয়ে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।

স্বাভাবিক অবস্থায় আন্তঃসাংগঠনিক সম্পর্ক কেমন হবে?

স্বাভাবিক সময়ে সংগঠনসমূহ এবং তাদের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে ক্রমিকাকারে কিছু নির্দেশনা উল্লেখ করা হলো।

  প্রত্যেক সংগঠন অপর সংগঠনকে প্রতিদ্বন্দী না ভেবে প্রতিযোগী ও সহযোদ্ধা মনে করা এবং শত্রু না ভেবে বরং বন্ধু মনে করা।

২  অন্য সংগঠনের সাথে সহমর্মিতা, সংবেদনশীলতা ও সহযোগিতামূলক শক্তিশালী সেতুবন্ধন গড়ে তোলা।

  সংগঠন সমূহের সদস্যগণের পরস্পরের মাঝে মানবিক ও ঈমানি ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখবার চেষ্টা করা।

৪  সর্বোচ্চ পর্যায়ে পরস্পরের মাঝে আন্তরিকতা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি রক্ষা করা।

  সবার প্রতি সবার কল্যাণকামী মনোভাব থাকা।

6   অন্যান্য সংগঠনের ব্যাপারে নেতিবাচক নয় বরং ইতিবাচক চিন্তা ও মানস লালন করা।

  সমমনা চিন্তার বিষয়গুলোতে ঐক্য ও সংহতির চর্চা করা।

  সংগঠনগুলোর মধ্যে পরস্পরের আলোচনা ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করা।

  সকল সংগঠনের সদস্যগণ পরস্পরে সততা, আমানতদারি, বিনয়, কোমলাচরণ, সচ্চরিত্র ও অন্যান্য উত্তম শিষ্টাচারের পরিচয় দেয়া।

১০  অন্য সংগঠন ও তার সদস্যদের সম্মান ও সব ধরনের হকের প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখা।

১১  প্রতিটি সংগঠন ও তার সদস্যবৃন্দ অপর সংগঠন ও তার সদস্যবৃন্দের ব্যাপারে যথাযথ সংযমী হওয়া।

১২ সার্বিক অবস্থায় পরস্পরের মধ্যকার সম্পর্কে একজন দায়ী ও প্রাক্টিসিং মুসলিমের গুণাবলীর পরিচয় দেয়া।

১৩ অন্যান্য সংগঠনকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা না করা।

১৪  অন্য সংগঠন বা তার ব্যক্তিদের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ পোষণ ও পরনিন্দা না করা।

১৫  কোন সংগঠন বা তার লোকজনদের কোন ধরনের ক্ষতি না করা।

১৬  কোন সংস্থার ভুল চিন্তা, ধ্যান-ধারণা বা কাজের শুধু সমালোচনার জন্য সমালোচনা না করা। বরং তার প্রমাণনির্ভর গঠনমূলক বিশ্লেষণ করা।

১৭  কারো শরীয়তবিরোধী কোন কাজকে ঐক্যের স্বার্থেও সমর্থন না করা।

১৮  অন্য সংগঠনের কোন কাজ ভুল বা অন্যায় না হলে তাতে বাধা না দেয়া।

১৯  এক অঞ্চলের বা এক ইস্যুতে কাজ করা সংগঠনগুলোর পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ জাগিয়ে একসাথে কাজ করার চেষ্টা করা।

২০  আন্তঃসাংগঠনিক সকল বিষয়ে ভারসাম্য ও মধ্যপন্থার চর্চা করা।

বড় কোন সংকটে কিংবা দুই সংগঠনের বিরোধাবস্থায় কেমন হবে তাদের সম্পর্ক

যদি দেশ ও জাতির উপর প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক এমন কোন বিপদ এসে পড়ে, যা থেকে উত্তরণে এক-দুটি সংগঠনের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন বিপুল অর্থ ও শ্রমের, তখন সংগঠনগুলোর ওপর কী করনীয় বর্তায় । এসময় কেমন হবে তাদের পরস্পরের যোগাযোগ ও সম্পর্ক? একইভাবে দুটি সংগঠনের মাঝে যদি কোন কারণে বিরোধ বা বিভেদ সৃষ্টি হয় তাহলে কিভাবে তার সমাধান করা হবে এবং কী উপায়ে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখবে ? এই দুটি দিক নিয়ে কিছু মৌলিক বিষয় পেশ করা হলো।

  সময়ের জরুরি কোনো দাবিতে নিজেদের ছোট ছোট মতভেদকে এড়িয়ে ঐকমত্যপূর্ণ মৌলিক বিষয়গুলোর সূত্রে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা।

  পরস্পরের ঐক্যের জায়গাগুলোকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা এবং সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তা রক্ষা করা। সেই ক্ষেত্রে মতানৈক্যের প্রসঙ্গগুলো টেনে এনে ঐক্য কে বিনষ্ট না করা।

  মতভেদের ক্ষেত্রে ও সময়ে মানবিক ও ঈমানি ভ্রাতৃত্বের দাবি রক্ষায় পূর্বের চেয়ে অধিকতর সতর্ক হওয়া।

৪  শরীয়ত সম্মত মতপার্থক্যকে মেনে নেওয়া এবং তাকে কলহ-বিবাদে পর্যবসিত না করা।

  মতপার্থক্যের মাঝেও ঐক্য ও বন্ধুত্বের অনুশীলন করে যাওয়া।

  অবৈধ নয় এমন রুচি ও কর্মের ভিন্নতা মেনে নেওয়া।

  যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর অভ্যাস পরিত্যাগ করা।

8 বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্রে মেধা, প্রজ্ঞা, ভদ্রতা ও পূর্ণ শিষ্টাচারের পরিচয় দেওয়া।

  নিজ সংগঠন ও অপর সংগঠনের ব্যাপারে কোন ধরনের গুজব ও অপপ্রচারে কান না দেওয়া।

১০  কেবল সংশয় ও সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো মন্তব্য না করা।

১১  কোন সংগঠন কর্তৃপক্ষ অথবা তার কোন সদস্য রূঢ় ও অভদ্র আচরণ করলে সেই একইভাবে তার মোকাবেলা না করা। বরং শান্ত ও ভদ্রোচিত ভাবে যুক্তির আলোকে তার সমাধানে যাওয়া।

১২  এইসব ক্ষেত্রে সংগঠনের সদস্যবৃন্দের কোন প্রকারের অনধিকার চর্চা না করা। বরং প্রতিটি বিষয় কে তার সাথে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলের উপর ছেড়ে দেওয়া।

১৩  কোথায় আপস করা যাবে আর কোথায় যাবে না, তা শরীয়তের আলোকে নির্ধারণ করে সেভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

১৪  স্পর্শকাতর এসব ক্ষেত্রে নিজেদের মানসিক অবস্থা ও ক্রোধ দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া।

১৫  কোন সংগঠনের গর্হিত বা অন্যায় কাজের প্রতিবাদ শরীয়তসম্মত পন্থা ও ধারাবাহিকতা অনুযায়ী করা।

১৬  নিজেদের দ্বারা অন্যদের উপর এবং অন্যদের কর্তৃক নিজেদের উপর যেন কোন প্রকার যুলুম, বাড়াবাড়ি এবং সম্মান ও অধিকার হনন না হয় সেই বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা।

১৭  সব ধরনের ঝগড়া, কোন্দল ও সংঘাত থেকে দূরে থাকা।

১৮  অন্য সংগঠন ও তার সদস্যদের সম্পর্কে কোনো রকমের অপপ্রচার না করা এবং অপবাদ না রটানো।

১৯  কোন সংগঠন ও তার সদস্যবৃন্দের স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করা।

২০  দুই সংগঠনের মাঝে বিশেষ কোন কোন্দল তৈরি হলে প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তৃতীয় কারো মধ্যস্থতায় সমাধান করা।

এছাড়াও সময় ও অবস্থার তাগিদে শরীয়ত সম্মত যে সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি অবলম্বনের প্রয়োজন হয় তা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই একটি সংগঠন তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে অগ্রসরমান হতে পারবে এবং সামাজিক উন্নয়ন সকলের যৌথ প্রচেষ্টায় দ্রুত এগিয়ে যাবে। সৃষ্টি হবে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর, উন্নত, শান্তিপূর্ণ মানব সমাজ।

শিক্ষার্থী, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় কায়রো, মিশর