কয়েক দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রংপুর অঞ্চলের দুই লাখ কৃষক

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: এবারের কয়েক দফা বন্যায় তিস্তার ১৫২ কিলোমিটার এবং ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার এলাকার ৩৬০ কিলোমিটার অববাহিকার ক্ষতবিক্ষত দুই লাখ কৃষক। ক্ষতি হয়েছে দেড় শ’ কোটি টাকার বিভিন্ন ফসল। ফলে বিবর্ণ এখন কৃষকদের জীবন। কিভাবে চলবে বাকি দিনগুলো, সেই চিন্তায় দিশেহারা তারা। কিন্তু মাঠে তাদের পাশে নেই কৃষি বিভাগ। এমনকি কৃষি প্রণোদনার কথাও জানেন না তারা। ফলে এবার ৬ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। যদিও কৃষি বিভাগ বলছে ১৪ হাজার হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলেও আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমস্যা হবে না। তবে আবার পানি বাড়লে ২৮ হাজার কৃষককে আমনের বদলে মাষকলাই সাপোর্ট দেয়ার প্রস্তুতি আছে কৃষি বিভাগের।

রংপুর আঞ্চলিক খামারবাড়ি সূত্র জানিয়েছে, খামারবাড়ির নথিতে কয়েক দফা বন্যায় রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত তালিকাভুক্ত কৃষকের সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯ জন। টাকার অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে ১৭২ কোটি ৫৪ লাখ ১১ হাজার ৩৮৪ টাকার ফসল। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ২৫ হাজার ৭৫৯ হেক্টর জমির মধ্যে সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে ১৪ হাজার ৪৪৬ হেক্টর জমির আবাদ। আর আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ৫০৫ হেক্টরের ফসল। কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাট। এ অঞ্চলের ৬ হাজার ৪৪২ দশমিক ৭৭ হেক্টর জমির ৫২ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৮০০ টাকার পাট নষ্ট হয়ে গেছে। এতে পথে বসেছেন ৬৫ হাজার ১০৯ জন পাটচাষি। ৩৬ হাজার ১৮৩ জন কৃষকের ৪ হাজার ৫৯৭ দশমিক ৬৩ হেক্টর জমির আউশ আবাদ নষ্ট হয়ে ক্ষতি হয়েছে ৪৮ কোটি ২৬ লাখ ৫ হাজার ৬৪০ টাকার। ১৬ হাজার ৯২৩ জন কৃষকের ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২ হেক্টর জমির ৪১ কোটি ৮১ লাখ ৬১ হাজার ৪০০ টাকার শাকসবজি নষ্ট হয়ে গেছে। এ ছাড়াও আমনের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে ১৮ কোটি ৭৬ লাখ ১ হাজার ৪৫৪ টাকার। এতে ১ হাজার ২৬৫ দশমিক ৭৮ হেক্টর জমির বীজতলা নষ্ট হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৮ হাজার ২৩০ জন কৃষক। ১ হাজার ২২২ জন কৃষকের ১১০ দশমিক ৭৪ হেক্টর জমির ১ কোটি ১৬ লাখ ২৩ হাজার ৮৪০ টাকার রোপা আমন, ৬২২ জন কৃষকের ২৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ৩৫ লাখ ৮৯ হাজার ৭৫০ টাকার ভুট্টা, ২ হাজার ৩৬৮ জন কৃষকের ২০৫ হেক্টর জমির ৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার মরিচ, ৩ হাজার ৯০ জন কৃষকের ৩৭৮ দশমিক ৫ হেক্টর জমির ৩ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকার তিল, ৩০৫ জন কৃষকের ৩০ দশমিক ৬ হেক্টর জমির ২৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫০০ টাকার চীনাবাদাম এবং ১ হাজার ২২৫ জন কৃষকের ২০ হেক্টর জমির ১৮ লাখ টাকার কাউনের ফসল পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দিশেহারা কৃষক। বিস্তীর্ণ মাঠে এখন বন্যার দগদগে ক্ষত। নষ্ট হওয়া আমন লাগানো নিয়ে দুশ্চিন্তা সবচেয়ে বেশি। কারণ এই আমনেই পেটে ঢুকবে অন্ন। হাতেও নেই টাকা। চড়া সুদে টাকা লগ্নি নিলেও মিলছে না বীজ। পেলেও দাম লাগামহীন। হতাশ কৃষকের সামনে এখন ঘনঘোর অন্ধকার। কিভাবে চলবে জীবন, চোখেমুখে অনিশ্চিত জীবন-জীবিকার ছাপ তাদের।

রংপুরের গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারীর মহিপুরের সামর্থ্যবান চাষি আনারুল ইসলাম জানালেন, বাবা মারা যাওয়ার পর মা, ভাইবোন, ভাগনীসহ সাতজনের সংসারের বোঝা এখন তার ঘাড়ে। এবার চার বিঘা জমিতে লাগিয়েছিলাম। কিন্তু বন্যায় সব শেষ। ১ হাজার টাকা সুদের ওপর নিয়ে কিছু চারা কিনে খোসা দেয়ার চেষ্টা করছি। আরো আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা লাগবে চারা কিনতে। সুদের ওপর টাকা খুঁজছি। কিন্তু এখনো পাইনি। টাকা পেলেও বাজারে চারা পাওয়া যাচ্ছে না। যদি ধান লাগাতে না পারি তা হলে খাবার নিয়ে খুব সমস্যায় পড়তে হবে। দেখি আল্লাহ কী করেন।

একই এলাকার কৃষক সাব্বির আলী জানালেন, মহাজনরাও সুদ দিতে চাইছেন না। কারণ শোধ করতে পারব না। আবাদ শেষ। জমি এবার শুকনায় পড়ে থাকবে।
কাউনিয়ার মর্নেয়ার চরের কৃষক আবদুল আজিজ জানালেন, আমন এবার লাগাতে পারব না। সব শেষ। চারার দাম এত বেশি। কোথায় পাব টাকা।
এ দিকে কৃষি বিভাগ প্রণোদনার মাধ্যমে ক্ষতি পোষানোর কথা জোর দিয়ে বললেও বিষয়টি জানেনই না ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক। এমনকি এত দুর্যোগে কৃষকের কাছেও যায়নি মাঠ বিভাগের কৃষি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

পীরগাছার তাম্বুলপুরের চরের কৃষক আমজাদ আলী জানালেন, আমরা জানি না সরকার চারা কিংবা টাকা দিতেছে। বন্যায় সব আবাদ শেষ হয়ে গেল। কৃষি বিভাগের লোকজন কোনো দিন আমাদের কাছে আসেনি। খোঁজও নেয়নি।

পূর্ববর্তি সংবাদআরও ৩ দিন বৃষ্টি থাকতে পারে: আবহাওয়া অধিদফতর
পরবর্তি সংবাদতরুণীকে হোটেলে আটকে রেখে পালাক্রমে ধর্ষণ, ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ