ইয়ারমুক যুদ্ধ: কিছু শিক্ষা

মাওলানা হাসান মুরাদ।।

অধিকাংশ মতে ইয়ারমুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৫ হিজরিতে। ইয়ারমুক সিরিয়ার এক নদীর নাম। বর্তমানে এই নদী সিরিয়া, জর্দান এবং ইসরাইলের মধ্যে প্রবাহিত। হজরত আবু বকর সিদ্দিক রা:-এর খেলাফতের শেষ এবং হজরত ওমর রা:-এর খেলাফতের শুরুতে। রাসূল সা:-এর ইন্তেকালের পর ইয়ারমুকের যুদ্ধই ছিল মুসলমানদের জন্য বড় বিজয়।

মুসলিম সেনাবাহিনী সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। রোমানরা এ সংবাদ শুনে সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে জানায়। সম্রাট তখন হিমসে অবস্থান করছিলেন। সম্রাট মুসলিমদের প্রতিরোধের আদেশ দেন। রোমানরা প্রস্তুতি শুরু করে যুদ্ধের। প্রথমে তাদের সৈন্য দাঁড়ায় ৬০ হাজার। তারপর বাড়তে বাড়তে মোট সৈন্য সংখ্যা হয় দুই লাখ ৪০ হাজার। অপর দিকে মুসলিমদের সেনাপতি ছিলেন হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রা:। তিনি ইরাকে ছিলেন। খলিফা আবু বকর রা:-এর আদেশে সেনাপতি হয়ে সিরিয়া এসে পৌঁছলেন তিনি। আজো পৃথিবীবাসী খালিদ বিন ওয়ালিদ রা:-এর বীরত্ব নিয়ে অবাক হয়। মুসলিমদের সৈন্য প্রথমে ছিল ৬ হাজার। তারপর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজারে। কী অবাক! মাত্র ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করলেন মুসলমানরা। আর পৃথিবীবাসীকে অবাক করে সেই যুদ্ধে জয়লাভ করলেন। মুসলিমদের মাত্র ৩ হাজার মুজাহিদ শাহাদতবরণ করেন। আর রোমান সৈন্য নিহত হয়েছিল ১ লাখ ২০ হাজারের মতো।

রোমানরা যখন পরাজিত হয়, সম্রাট হিরাক্লিয়াস তখন ইন্তাকিয়াতে অবস্থান করছিলেন। সম্রাটের কাছে পরাজয়ের সংবাদ দেয়া হলে তিনি ক্ষিপ্ত হন। তারপর একটি ভাষণ দেন। এতে বলেন, যারা তোমাদের হত্যা করেছে তারা তোমাদের মতো মানুষ নয়? উত্তর দেয়া হলো হ্যাঁ, তারা আমাদের মতো মানুষ। সম্রাট বললেন, সংখ্যাতে ওরা বেশি না তোমরা? বলা হলো আমরাই বরং বেশি। সর্বক্ষেত্রেই আমাদের সংখ্যা তাদের চেয়ে অনেক বেশি। সম্রাট বললেন, তাহলে কি হলো যে, তোমরা একের পর এক পরাজিত হচ্ছ? তখন তাদের মধ্যকার একজন বিজ্ঞ লোক বলেন জাঁহাপনা, আমাদের পরাজয় ও তাদের বিজয়ের কিছু কারণ আছে। এ জন্যই আমরা পরাজিত হচ্ছি। সে কারণগুলো হলো, মুসলিমরা রাতে ইবাদত করে, দিনে রোজা রাখে। প্রতিশ্রুতি দিয়ে রক্ষা করে। সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজে বাধা দেয়। নিজেদের মধ্যে ন্যায়, ইনসাফের প্রতিষ্ঠা করে। অন্য দিকে আমরা রোমকরা ব্যভিচার করি, মদ পান করি, হারাম খাই, অঙ্গীকার ভঙ্গ করি, নিজেদের মধ্যে ইনসাফের বাছবিচার করি না, আমরা রাগান্বিত হই, জুলুম করি। স্রষ্টা যাতে সন্তুষ্ট হয় সেরকম নিজেরাও করি না অন্যদেরও করতে দেই না। আর আমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় ও অশান্তি সৃষ্টি করি।
এ কথা শুনে সম্রাট হিরাক্লিয়াস বললেন, আপনি আমাকে সঠিক তথ্য দিয়েছেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে একজন খ্রিষ্টানকে পাঠানো হয়েছিল মুসলিমদের সংবাদ নেয়ার জন্য। তখন সে খ্রিষ্টান মুসলিম শিবিরে ঘুরে এসে বিবরণ দিলো। ‘আমি এমন একদল লোকের কাছ থেকে ফিরে এসেছি তারা হালকা-পাতলা দেহ বিশিষ্ট। তেজী অশ্বে আরোহণে অভ্যস্ত। রাতে ইবাদত করে দিনে অশ্বারোহী। তারা নিজেরা বর্শা তৈরি করে এবং ধার দেয়। নিজেরা তীর বানায়। তারা এত উচ্চ আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির করে যে, আপনি যদি সেখানে আপনার সাথীকে কোনো কথা বলেন তবে তিলাওয়াত ও জিকিরের কারণে সে কোনো শব্দ শুনতে পারবে না। (আল বেদায়া ওয়ান নেহায়া-৭/৩৭ পৃ.)

শিক্ষা : খ্রিষ্টান গুপ্তচরের বিবরণে বোঝা যায়, তদানীন্তন সময়ের মুজাহিদরা জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক উভয় শক্তিতে ছিলেন শক্তিমান। ছিলেন অত্যধিক কর্মঠ। আল্লাহর প্রতি ছিল দৃঢ় আস্থা। ইবাদতে পূর্ণ মনোযোগ। দুঃখ! আজকের পৃথিবীতে মুসলিম দেশগুলো যুদ্ধে বিধ্বস্ত। চার দিকে গ্লানিময় পরাজয়। বিজয়স্বপ্ন সুদূর পরাহত। আফসোস হলেও সত্য, বর্তমানে মুসলিম শাসকরা হয়েছে স্থবির, আত্মবিলাসী, গদি রক্ষার মোহে উন্মাদ। দ্বীন-ধর্ম ছেড়ে বন্ধু বানিয়েছে ইহুদি আর নাছারাদের। অথচ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, হে মুমিনগণ তোমরা ইহুদি নাছারাদের বন্ধু বানিও না। তারা একে অপরের বন্ধু। (সূরা মায়েদা-৫১)

তবে ইতিহাস সাক্ষী, সাহাবায়ে কেরাম আমাদের বিজয়ের পথ-পন্থা দেখিয়েছেন। আমরা শাসক আর শাসিত যদি বর্ণিত কাজগুলো করি, তবে আমাদের বিজয়ও সুনিশ্চিত হবে। শত্রুপক্ষ ছাড়াও আমরা প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। জীবনের প্রতি ধাপে আসে নানান পরীক্ষা। সাহাবা নির্দেশিত পথে যদি আমরা চলি অন্তত জীবনযুদ্ধে জয়ী হবো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজে বাধা, তিলাওয়াত, জিকির, রোজা, দোয়া নিয়মিত করব। ব্যভিচার, হারাম, ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকব। এতটুকু শিক্ষা কী আমরা এখান থেকে নিতে পারি না!

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম বুজরুক গড়গড়ী, চুয়াডাঙ্গা