একটি জীবন্ত মসজিদ

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব।।

সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখার জন্য আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ব্যবস্থার নাম ‘নূরানী পদ্ধতি’। এছাড়াও রয়েছে ‘নাদিয়া’, ‘নূরীয়া’সহ বিভিন্ন নামে এবং বিভিন্ন শিরোনামে কুরআন শিক্ষার অনেক আয়োজন। ঢাকা শহরে এবং দেশের অন্য অনেক শহরে, গ্রামে গঞ্জে, বিভিন্ন মসজিদে এবং বিভিন্ন স্থানে এইসব পদ্ধতিতে কুরআন শিক্ষার কোর্স হয়ে থাকে। সেই কোর্সের উসিলায় ছোট বড় সব বয়সের অসংখ্য মানুষ সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত শিখে।

জানা কথা, বিশুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখা একটি ফরয বিধান। পৃথিবীর সকল দেশের, সকল শ্রেণি, বর্ণ, গোত্র, পেশা ও মতবাদের, সকল মুসলমানের উপর বিশুদ্ধভাবে কুরআন মাজীদ তিলাওয়াত শেখা ফরয। সেজন্য আমরা দেখতে পাই- দূর অজানা অচেনা দেশের কোনো মানুষ যখন কুরআন তিলাওয়াত করে, মনে হয় যেন সে আমার কত চেনা, কত কাছের, কত আপন। আমাদের উভয়ের কণ্ঠে একই কুরআন, একই শব্দ, একই বাক্য, একই উচ্চারণে এবং প্রায় একই সুরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়।

এটাও জানা কথা যে, সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখার সবচে সুন্দর ও উপযুক্ত সময় হলো শৈশব। এসময় খুব সহজেই এবং অনেকটা অনায়াসেই বিশুদ্ধ তিলাওয়াত শেখা যায়। তাতে জীবনের প্রথম ফরয নামাযটিও বিশুদ্ধ তিলাওয়াতের মাধ্যমে আদায় করা সম্ভব হয়।

কিন্তু বিভিন্ন কারণে যাদের পক্ষে সেসময় তিলাওয়াত শেখা সম্ভব হয়নি, তাদের জন্যে যতদ্রুত সম্ভব সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত শেখা আবশ্যক। বয়সের আধিক্য ও অনভ্যস্ততার অজুহাত এক্ষেত্রে অর্থহীন।

বাংলাদেশের শত শত বরং হাজার হাজার মসজিদে সহীহ শুদ্ধভাবে কুরআন শেখার ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের উচিত, অন্তত এর কোনো একটিতে অংশগ্রহণ করে যথাদ্রুত এই ফরয আদায় করা। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অলসতা বা উদাসীনতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া।

গত কয়েকদিন যাবৎ এমনই একটি মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ছি। যেখানে প্রতিদিন এশার নামাযের পর সব বয়সের মানুষের জন্য কুরআন শিক্ষার একটি কোর্স চলছে। আলহামদুলিল্লাহ, তাতে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা মুগ্ধ হবার মতো। তার চেয়েও বেশি মুগ্ধ হবার মতো বিষয় হলো, তাদের আগ্রহ ও প্রস্তুতি। এশার নামাযের বেশ আগে তারা নিজস্ব জায়নামায, কায়দা ও খাতা কলম নিয়ে হাজির হয়ে যায়। নামাযের পর যে সবক আজ শোনাতে হবে সেটা মুখস্থ করে। নামাযের পাঁচ মিনিট আগের দৃশ্য সত্যিই অভূতপূর্ব। আমার বিশ্বাস—এই দৃশ্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দৃশ্যগুলোর একটি। ছোট বড়—স্কুল পড়ুয়া, কলেজ পড়ুয়া, বয়স্ক কর্মজীবী, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং পৌঢ়-বৃদ্ধ, সব শ্রেণির মানুষ একসাথে পড়ছে। সত্যিই না দেখলে বুঝানো কঠিন—কেনো এই দৃশ্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দৃশ্যগুলোর একটি!

আমি খেয়াল করে দেখেছি, জামাত শুরু হবার আগের মুহূর্তটিতে যেন কী এক মধু-গুঞ্জরণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সবাই মৃদুস্বরে পড়ছে। হালকা হালকা দুলছে। সবার মুখে একই পড়া, একই সুর। এমন সময় ইমাম সাহেব আসেন এবং কাতার সোজা করে দাঁড়ানোর ঘোষণা হয়। তখন এক মুহূর্তে পুরো মসজিদ নীরব হয়ে যায়। একটু আগের সেই মধু-গুঞ্জরণ, এরপর মুহূর্তে নীরব হয়ে যাওয়া পরিবেশ, কীসের সাথে এর তুলনা করব? কী আছে পৃথিবীতে এমন, যার সাথে এর তুলনা করা যায়!

কয়েকদিন এই দৃশ্য দেখার পর আমার ভেতরেও কেমন যেন উতলা ভাব তৈরি হলো। খুব ইচ্ছে হলো, এই কাফেলায় শরিক হতে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির বিভিন্ন বয়সের মানুষের সাথে একত্রে কুরআনের পাঠ গ্রহণ করতে।

সত্যি সত্যিই একদিন বসলাম তাদের সঙ্গে। তাদের মতো করেই যুক্ত হয়ে গেলাম তাদের মাঝে। যদিও ভেতরে উৎকণ্ঠা ছিল, না জানি উস্তাদজী জিজ্ঞেস করে বসেন— কে তুমি নতুন? কিন্তু না। তিনি কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। তবে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে কয়েকবার আমার দিকে তাকালেন। সব মিলিয়ে অন্য রকম এক আবেগের মধ্য দিয়ে সময়গুলো কাটছিল। সেই আবেগ ও আনন্দের পূর্ণতা পেল তখন, যখন দেখলাম উস্তাদজীর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য একদিকে যেমন বয়োবৃদ্ধ মুরুব্বী হাত তুলছেন। অন্যদিকে হাত তুলছেন পনেরো থেকে বিশ বছর বয়সী নওজোয়ান। এরপর তাদের মাঝে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাবার কী টানটান প্রতিযোগিতা!

হে আল্লাহ! আপনার কুরআন শেখার এই দৃশ্য নিশ্চয় আপনার বড় পছন্দ হয়েছে। এর উসিলায় আপনি এদেশের সর্বত্র কুরআন ও দ্বীন চর্চার ব্যাপক পরিবেশ তৈরি করে দিন। আমাদেরকে তাওফীক দিন জীবনের সকল ক্ষেত্রে আপনার হুকুম মানার। বিশুদ্ধভাবে কুরআন শেখার লক্ষ্যকে করে দিন সাফল্যময়।

পূর্ববর্তি সংবাদসিলেটের এমসি কলেজে স্বামী‌কে আট‌কে রেখে স্ত্রী‌কে গণধর্ষণ
পরবর্তি সংবাদএবার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে সুদান!