পড়ন্ত বেলায় শতবর্ষী এক আশেকে মাদানী: মাওলানা আবদুল বারী লক্ষীপুরী দা বা.

মুহাম্মদ আবদুস সালাম ।।

তিনি এখন ক্ষণে ক্ষণে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। হয়ত অচিরেই প্রভুর ডাক এসে যেতে পারে- এমন কিছু আঁচ করছেন। তাই দুদিন থেকে বিদায়ের একেবারে শাব্দিক অর্থে প্রস্তুতি শুরু করেছেন। সন্তান-সন্ততিদের ডেকে আনছেন। ওসিয়ত-নসীহত করছেন। তার চোখে মুখে প্রস্থানের পূর্ণ অপেক্ষা। যেন এখনই ডাক এসে যাচ্ছে। সময় মাত্র কিছুক্ষণ। তাই এক ভিন্ন রকম আনন্দ, বেদনা ও তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়েই সবাইকে উপদেশ দিচ্ছেন। আবার মাঝে মাঝে কেঁদেও উঠছেন।

নানাজান অতীতেও ওসিয়ত করেছেন বহুবার। কিন্তু আজকের মতো এমন অবস্থা আগে আর হয়নি। ভিডিও কলের কল্যাণে অনেক দিন পর আজ সুদূর মিশর থেকেও তাকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি মোবাইলে দেখেন না, শুনেনও না। কিন্তু যখন তাকে আমার কথা বলা হলো তখন কোথাও চলে যাবার মুহূর্তে যেমন তাড়াহুড়ো করে কথা বলা হয় তেমনি করে বললেন অনেক কথা। দিলেন অনেক উপদেশ। আদুরে কন্ঠে নামটা নিয়ে কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলতে লাগলেন, তোমাকে যেই কিতাবগুলো দিয়েছি সেগুলো পড়বে এবং অন্য যাদেরকে দিলে ফায়দা হবে মনে করো তাদের পড়তে দেবে। এগুলো বড় অমূল্য কিতাব। সহজেই এগুলো পাবে না। আমার বড় প্রিয় সম্পদ এই কিতাবগুলো। এই সমস্ত কিতাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা-চেতনার কথা আছে। শাইখুল ইসলাম হযরত মাদানী রাহ.-এর বহু চিন্তা ও আদর্শের কথা এগুলোতে রয়েছে। এগুলো ধারণ করবে, লালন করবে এবং জীবনকে সেভাবে প্রস্তুত করবে।

সব সময়ের মতো এই অল্পকথনেও চলে এলো শাইখুল ইসলাম হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ.-এর প্রসঙ্গ। বড় জযবা আর মহব্বত নিয়ে বলতে লাগলেন তার কথা। তার অন্তিম বেলার কথা। বললেন কত সুন্দর ছিল তাঁর মৃত্যু। এবং কিভাবে সম্পন্ন হয়েছে তার কাফন-দাফন।

বলছি নানাজান হযরত মাওলানা আবদুল বারী লক্ষীপুরী দামাত বারাকাতুহুম এর কথা। তার বয়স এখন একশ’ এর কোঠা ছুঁইছু্ঁই। বড় সাফল্য ও সংগ্রামমুখর দীর্ঘ জীবনের পর প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি বার্ধ্যক্যের ক্লান্ত সময় পার করছেন। এই সময়টা কাটছে তার নিজ বাড়িতেই। সদর লক্ষ্মীপুরের জয়পুর গ্রামে। কর্মক্ষমতা যতদিন তাকে সঙ্গ দিয়েছে ততদিন বার্ধক্যের ভার নিয়েও নিজ এলাকায় কোনো না কোনো দ্বীনী কাজ করে গেছেন।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী ও বড় উদ্যোমী। মেধা ও বুদ্ধির মতো তার ভাগ্যও বড় সুপ্রসন্ন। ছাত্র জীবনের শুরু থেকেই বড় বড় মনীষীদের শিষ্যত্ব, সান্নিধ্য ও সবিশেষ স্নেহ লাভ করেছেন। নোয়াখালীর চৌমুহনী ইসলামিয়া পড়াকালীন ভারতের হযরত আবদুল হামীদ সিদ্দীকী ও রশিদ আহমদ সিদ্দীকীর মতো মনীষীদের সংশ্রবে তিনি ধন্য হয়েছেন। তারা দুজনই ছিলেন হযরত মাদানী রহ. এর  অত্যন্ত প্রিয় শাগরিদ এবং বাংলা অঞ্চলে জমিয়তের শীর্ষ নেতা। এছাড়াও চৌমুহনী ইসলামিয়া ও নোয়াখালী মাইজদী ইসলামিয়ায় তার উস্তাদগণের অরো অনেকেই ছিলেন হযরত মাদানীর শাগরিদ বা খলিফা। তাই তারুণ্যের প্রথম থেকেই তিনি হযরত মাদানীর আত্মশুদ্ধির ও রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। তখন থেকেই তাঁর শিরা-উপশিরায় তীব্র বেগে প্রবাহিত হতে লাগলো হযরতের চেতনা ও ভালোবাসা। সদ্য তারুণ্যে লাভ করা এই দুটি সম্পদ তার ভবিষ্যত জীবনকে করেছিল বড় সমৃদ্ধ ও সাফল্যমণ্ডিত।

নানা ও নানি দুজনই হযরত মাদানীর হাতে বাইআতে ধন্য। দীর্ঘ কয়েক বছর হযরতের সাথে ইসলাহী সম্পর্ক ও চিঠির আদানপ্রদানও হয়েছিল। ধীরে ধীরে তার সাথে সম্পর্ক যখন গভীর হচ্ছিল তখনই হযরত মাদানি রবের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন। পরবর্তীতে তিনি বাইআত হন হযরত আসআদ মাদানি রহ. এর নিকট। হযরত তাকে খেলাফত দান করেন এবং তাকে এতটাই ভালবাসতেন যে, নিজ থেকেই লক্ষীপুরের অজপাড়া গাঁ জয়পুরে নানার বাড়িতে চার বারের মতো তাশরীফ আনেন।

নানাজানের এক বিশেষ কীর্তি হল, তিনি ছিলেন পাক-ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত কলকাতা আলিয়ার প্রথম বছরের কামেলের প্রথম স্থান অধিকারী ছাত্র। তার মেধা ও মননে আলিয়ার প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল ও হেড মুহাদ্দিস সহ অন্যান্য উস্তাদ -যাদের মধ্যে চার-পাঁচজনই ছিলেন হযরত মাদানী রহ. এর খলিফা – ছিলেন বড় মুগ্ধ।  তারা তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে কলকাতা আলিয়ার পক্ষ থেকে তাকে ‘মুমতাযুল মুহাদ্দিসীন’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

এই পুনঃপ্রতিষ্ঠিত কলকাতা আলিয়া কেন্দ্রিক তার এক বিশেষ অবদান হল, কলকাতা আলিয়া ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে ভারত সরকার কলকাতায় তার স্থগিতাদেশ ঘোষণা করে। তখন হযরত মাদানী রহ. প্রতিবাদ করে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠাকরণের আওয়াজ তোলেন। সে সময় নানাজান ছিলেন জমিয়তের ছাত্রনেতা। আলিয়ার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হলে তিনি একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তখনকার দাঙ্গা-বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই বড় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

পড়াশোনা শেষ হলে হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. খলিফা মাওলানা তাহের রহ.যিনি নানাজানের একজন প্রিয় উস্তাদ ছিলেন, তিনি নানাজানের কর্ম জীবনকে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন। তিনি তাকে ২৪ পরগনার একটি হাইস্কুলে মৌলভী শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেন। কারণ সেখানকার ছাত্র, ও সে এলাকার সমাজ শিরক, বেদআত ও হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দীন ও সুন্নাহর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।

নানাজান একজন প্রখর মেধাবী ও যোগ্যতা সম্পন্ন আলেম হওয়া সত্ত্বেও শায়খের কথা মেনে সেখানে চলে গেলেন। তারপর তার জীবনের প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় সেখানকার আলো-বাতাসে কেটে গেল। আল্লাহ তাআলা তার চেষ্টা-সাধনা ও দাওয়াতে প্রভূত বরকত দান করেন। ধীরে ধীরে সেই স্কুল ও এলাকাটি হয়ে ওঠে শরিয়াহ ও সুন্নাহ ঘনিষ্ঠ একটি সমাজ। সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একাধিক মাদরাসা-মসজিদ। তার প্রতিষ্ঠিত মদীনাতুল উলুম কাঠালিয়া এখন ২৪ পরগনার একটি বৃহৎ কওমী মাদরাসা। যা দীনি শিক্ষাদানের পাশাপাশি বহুমুখী সেবা ও দাওয়াহ কেন্দ্রিক কাজও আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এই মাদরাসার পরিচালক মাওলানা শওকত আলী সেই স্কুলেরই তার দীক্ষাপ্রাপ্ত একজন ছাত্র এবং তার খলিফাও বটে।

নানাজান তার কর্মজীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন ২৪ পরগনার ঊষর ভূমিকে উর্বর করার কাজে। সফলতাও পেয়েছেন যথেষ্ট। যখন বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়লেন তখন জীবনের সাধারণ নিয়ম মেনে সেই জায়গা ছেড়ে ফিরে আসতে হলো জন্ম ভূমিতে। তবে সেখানকার পরতে পরতে মিশে থাকা ভালোবাসা তাকে মাঝে মাঝেই নিয়ে যেত সেখানে। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভক্তির টানে ছুটে আসত তারাও। এখনো আসে মাঝেমধ্যে।

এই বর্ষীয়ান ক্লান্ত মুসাফির এখন জীবনের পড়ন্ত বেলায় অন্তিম সময় পার করছেন। দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছে; কিন্তু শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো এখন তার দিন রাত, সকাল সন্ধ্যে অতিবাহিত হয় রবের যিকিরের অমিয় সুধায়।

আরেক বিস্ময় হলো, সারাটি জীবনের মত এখনো প্রায়শই কাছের লোকদের সাথে বিশেষ কোন প্রসঙ্গ ছাড়াই হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী ও হযরত আসআদ মাদানী রহ. এর নানান স্মৃতি মন্থন করতে শুরু করেন। তাদের বিভিন্ন বাণী ও ভূমিকার কথা বলতে থাকেন এবং আওলাদে রাসূলের প্রতি ভালোবাসা ও আকর্ষণে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তখন যেন তার দুর্বল হাড্ডিসার শরীরেও কোথা থেকে এক ঐশী শক্তি জেগে ওঠে। মাদানী চেতনা আর ভালোবাসাই ছিল তার সংগ্রাম মুখর জীবনের নেপথ্য শক্তি এবং এখনও। শায়খের প্রতি এমন স্বভাবজাত ভালোবাসা এই যুগে একেবারেই বিরল।

বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা বড় আশঙ্কাজনক। তাই সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী, আল্লাহ যেন এই আশেকে মাদানী কে সুস্থতা দান করেন। এই প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন আরও অনেক দিন। আর যখন তাঁর চূড়ান্ত ডাক এসে যাবে তখন যেন তিনি খাতিমাহ বিল খায়রের সুন্দর আয়োজন করেন- আমীন।