প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা: শেষ গম্বুজটাও ভেঙে পড়তে দেখলাম ৪টে ৪৯ মিনিটে

ভারতের উগ্রবাদী হিন্দুরা ভেঙ্গে ফেলে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ

দেবব্রত ঠাকুর।।

দিনটা শুরু হয়েছিল ভোর ৫টায়। ফৈজাবাদের হোটেল থেকে বেরিয়ে ৫ কিলোমিটার দূরের অযোধ্যার পথে যখন যাত্রা শুরু, তখন ঘড়ির কাঁটায় ৬টা। উত্তরপ্রদেশের শীতের সকাল। হু-হু করে হিমশীতল হাওয়া বইছে। তবে দিনটা রোদ ঝলমলে।

ঘড়িতে বেলা ১১টা। ফিরে এলাম মাটির ঢিবির উপরে। এত ক্ষণ নোটবই-পেন হাতে ছিল। গলায় প্রেস কার্ড। সে সব গুটিয়ে পকেটে চালান করলাম। বার করলাম আগের দিন ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর তৎকালীন অ্যাসোসিয়েট এডিটর স্বপন দাশগুপ্তের মজা করে কিনে দেওয়া ‘জয় শ্রীরাম’ লেখা সিল্কের ফেট্টি।

৬ ডিসেম্বরের বারবেলায় সেই ফেট্টি বাঁধলাম মাথায়। রক্ষাকবচ! রামকথা কুঞ্জের মাইকে তখন ভজন থেমে গিয়েছে। বার বার ‘অনুশাসন’-এর হুঁশিয়ারি আসছে। ভেসে আসছে সিঙ্ঘলের গলা, কাটিয়ারের গলা, ‘‘যাঁরা বিশৃঙ্খলা তৈরি করছেন তাঁরা আমাদের লোক নয়। করসেবা ভণ্ডুল করতে আসা ষড়যন্ত্রী। পিভি, মুলায়ম, ভিপি-র পাঠানো লোক। তাদের কোনও প্ররোচনায় পা দেবেন না।’’

এরই মধ্যে শিবসেনা সাংসদ মোরেশ্বর সাভেকে নিয়ে করসেবাস্থলে এলেন অশোক সিঙ্ঘল। হনুমানগড়ির দিক থেকে ভিড় ঠেলে দুজনে ঢুকতেই শৈবসৈনিকদের তুমুল আওয়াজ উঠল— ‘‘জয় ভবানী, হর হর মহাদেও।’’ সাভেকে ষোল আনা ভিআইপি ট্রিটমেন্ট দিয়ে করসেবাস্থল ঘুরিয়ে দেখালেন সিংঘল। মিনিট দশেকের মধ্যেই এলেন আডবাণী, জোশী। চোখাচোখি হতেই জোশী জানতে চাইলেন, কবে এসেছি। তার পর দু’জন চলে গেলেন রামকথা কুঞ্জের মঞ্চে।

হঠাৎ দেখি ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এর মণিময় দাশগুপ্ত, অশোক মালিক এবং ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’-র এসএনএম আবদি এসে দাঁড়িয়েছেন। মণিময় আর আমি হোটেলের একই রুমে রয়েছি। করসেবাস্থলে এসেছিও এক সঙ্গে। তার পরে ছিটকে গিয়েছিলাম। মণিময় বলল, ‘‘আমরা এইমাত্র পিছনদিক থেকে আসছি। ওখানে গাঁইতি, শাবল, হাতুড়ি আর মোটা দড়ি নিয়ে কয়েকশো করসেবক জড়ো হয়েছে।’’

আবদি বললেন, ‘‘মসজিদ অক্ষত থাকবে বলে মনে হয় না।’ কিন্তু তখনও নাগপুরের তথাকথিত অনুশাসনের উপর আস্থাশীল হয়ে বললাম, যদি চড়েও বসে, তা হলেও বড়জোর কাঠামোর তিন গম্বুজের মাথায় গেরুয়া ঝাণ্ডা ওড়াবে। তার বেশি কিছু করতে পারবে না।

আসলে তার আগে ১৯৯১ সালের ৩১ অক্টোবর একই ভাবে করসেবকদের গম্বুজে চড়তে দেখেছি। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যে ভিতরে মোতায়েন সিআরপি জওয়ানরা তাদের নামিয়ে এনেছে। কয়েক মাস আগেও একই ভাবে কয়েকশো করসেবক চড়াও হয়েছিল কাঠামোয়। বাইরের প্রাচীরের খানিকটা তারা ভেঙেও ফেলে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তার বেশি এগোতে পারেনি। আর এ বারে তো নিরাপত্তা কয়েক গুণ বেশি। তাই আবদির আশঙ্কাকে পাত্তা দিইনি। ভাবিনি দাঁড়িয়ে রয়েছি ইতিহাসের এক সঙ্কটময় মোড়ে।

 

ভিতরে ভিতরে উত্তেজনার পারদ বেড়ে চলেছে। একটার পর একটা সিগারেট খেয়ে যাচ্ছি। হঠাৎই একজন করসেবক এসে সিগারেট চাইলেন। সিগারেটটা দিয়ে তাঁকে একপাশে টেনে আনলাম। নাম শঙ্কর। বাড়ি শরদ পওয়ারের বারামতী জেলায়। তাঁর সাফ কথা, ‘‘আদালতের আদেশ মানি না। নেতাদেরও মানি না। আমাদের নিয়ে প্রত্যেকবার রাজনীতি হচ্ছে। বার বার ডেকে ফেরত পাঠাচ্ছে নেতারা। এর একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার।’’

 

ঘড়ি বলছে বেলা সাড়ে ১১টা। পরিষদের স্থানীয় নেতা মহেশ নারায়ণ সিংহ মাইকে লাগাতার ঘোষণা শুরু করেছেন, ‘‘আমাদের কাজে যারা বিঘ্ন ঘটানোর চেষ্টা করছে তারা কেউ রামভক্ত নয়। এরা কেউ করসেবকও নয়। মুলায়ম, ভিপি, নরসিমা রাওয়ের পাঠানো লোক। ওদের ফাঁদে করসেবকরা পা দেবেন না।’’ কিন্তু নেতৃত্বই তো তখন প্রশ্নের মুখে! ঢিপির উপর দাঁড়িয়ে দেখলাম, আরও একটা দল ঢুকে পড়ল করসেবাস্থলে। ধরমদাস একটা বেতের লাঠি নিয়ে বেধড়ক পিটতে শুরু করলেন তাঁদের। করসেবকরা খানিকটা পিছু হটলেও পরের মুহূর্তেই পালোয়ান ভূমিশয্যা নিলেন। তাঁর উপরে চলতে লাগল এলোপাথাড়ি ঘুসি আর লাথি। কোনও মতে উঠে গেরুয়া লুঙ্গি হাঁটুর উপরে তুলে ধরমদাস পড়ি কি মরি দৌড় লাগালেন।

একদিকে ধরমদাস পালাচ্ছেন রামকথাকুঞ্জের দিকে, অন্যদিক থেকে বিতর্কিত কাঠামোর দিকে বন্য বাইসনের মতো ধেয়ে আসছেন করসেবকরা। শুরু হল ইতিউতি দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের উপরে ইটবৃষ্টি। পাশে তাকিয়ে দেখি শুধু দাঁড়িয়ে ‘সানডে মেল’-এর সীতা সিদ্ধার্থন। ডান পাশে গম্বুজের মাথায় সেই অন্ধ্রবাহিনীর দুই প্রতিনিধি। যেন এভারেস্টের মাথায় এডমণ্ড হিলারি- তেনজিং নোরগে!

 

পরিস্থিতি সামাল দিতে করসেবাস্থলে এলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ অশোক সিঙ্ঘল। তবে পরিস্থিতি তখন হাতের বাইরে। চারদিক থেকে ধেয়ে আসা করসেবকদের থামাতে সিংঘল কংক্রিট প্ল্যাটফর্মের উপর দু’দিকে দু’হাত ছড়িয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু বাগ মানল না কেউ। উল্টে গালাগাল করতে করতে তাঁর পাশ দিয়ে মসজিদ ভাঙতে পাগলের মতো দৌড়তে লাগল মানুষ। সিংঘল অসহায় ভাবে মারমুখী জনতার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ধ্বস্তাধ্বস্তিতে তখন তাঁর ধুতির কাছা খুলে গিয়েছে। কোনদিকে যাব বুঝতে পারছিলাম না। তারপর কী ভেবে করসেবকদের সঙ্গে দৌড়ে গেলাম বিতর্কিত কাঠামোর মধ্যে। এসএসপি ডি বি রাই কাঁদানে গ্যাস চার্জ করার নির্দেশ দিচ্ছেন। কিন্তু কাঁদানে গ্যাস ছুড়বে য়ারা, উত্তরপ্রদেশের সেই বাহিনী তখন নির্দেশ উপেক্ষা করে চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

 

গোটা কাঠামো তখন করসেবকদের দখলে। পাঁচিলের উপর, কাঠামোর ছাদে, গম্বুজে থিক থিক করছে করসেবক। ধাক্কাধাক্কিতে কেউ কেউ উপর থেকে ছিটকে এসে পড়ছে নীচের বাঁধানো চাতালে। শুরু হয়ে গিয়েছে ইটবৃষ্টি। শেষ ভরসা সিআরপিএফ-ও বেতের ঢালে মাথা ঢেকে ছেড়ে যাচ্ছে গোটা চত্বর। এক জওয়ান পরামর্শ দিলেন, ‘‘আপ ভি চলো, নেহি তো মর যাওগে।’’ তাঁর ঢালে মাথা বাঁচিয়ে নেমে এলাম সীতা রসুইয়ের সামনের রাস্তায়।

 

সহকর্মী সাংবাদিকরা কে কোথায় ছিটকে পড়েছে। প্রাক্-মোবাইল যুগ। যোগাযোগের কোনও সুযোগ নেই। উপরে তাকিয়ে দেখলাম মানস কুঞ্জের ছাদের প্রেস গ্যালারিতে থিকথিকে মাথা। গম্বুজ ভাঙার কাজ তখন শুরু হয়ে গিয়েছে। কংক্রিট নয়, চুন-সুরকির শক্ত ৫০০ বছরের পুরনো গাঁথনির গম্বুজ। ২০ ইঞ্চি চওড়া দেওয়াল অবশ্য মূলত মাটি দিয়েই গাঁথা। গম্বুজ কব্জা করতে না পেরে করসেবকদের লক্ষ্য তখন ছাদ ও গম্বুজের জোড়। পাশাপাশি দেওয়াল ভাঙা।

 

ঠিক সাড়ে ১২টায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল বাঁদিকের প্রথম গম্বুজটি। মির বাকির গড়া ‘বাবরি মসজিদ’ ধুলোয় মিশে যাওয়ার তখন আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা।

 

রাম দিওয়ার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধ্বংসলীলা দেখছি। মাথায় বাঁধা গেরুয়া ফেট্টি। কিন্তু কপালে মেটে সিঁদুরের টিপ আর মাথায় ‘জয় শ্রীরাম’ ফেট্টি থাকলেই যে করসেবকের ছদ্মবেশ ধরা যায় না, তা বুঝলাম বাঁশ হাতে এক করসেবকের তাড়া খেয়ে। চেনা জায়গা। এ গলি, সে গলি ঘুরে ফিরে এলাম উত্তর-পূর্ব গেটের কাছে। ফের তাড়া। চেনামুখের রাগী যুবক বান্টি, ‘‘দাদা ভাগিয়ে হিঁয়াসে। নেহি তো অনর্থ হো যায়গা।’’

ভাবলাম, অনর্থ হতে আর বাকি কী! রামকথা কুঞ্জের মাইক থেকে তখনও ভেসে আসছে নেতাদের আবেদন। শুনতে পাচ্ছি শেষাদ্রি আবেদন করছেন চারটি দক্ষিণী ভাষায়। তার পর হিন্দিতে। যে গম্বুজের মাথায় করসেবকরা তাণ্ডব করছে তার নীচেই বিরাজমান  রামলালা। আডবাণী গলা চড়িয়ে স্বীকার করলেন, ‘‘আপনারা যা করছেন তাতে আমাদের হিতে বিপরীত হবে। এটা বলিদান দেওয়ার সময় নয়!’’ অশোক সিঙ্ঘলের গলায় আর্তি, ‘‘আপলোগ সুন রহে হ্যায়, ম্যায় অশোক সিঙ্ঘল বোল রহা হুঁ। অশোক সিঙ্ঘল বোল রহা হুঁ।’’ কিন্তু নেতারা তখন অপ্রাসঙ্গিক। রামকথা কুঞ্জের দিকে এগোনর বৃথা চেষ্টা করে ক্ষান্ত দিয়েছি। দেখা এক সিনিয়র সহকর্মীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, আডবাণী খুবই বিভ্রান্ত। ইস্যু হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে প্রমোদ মহাজন মাথা চাপড়াচ্ছেন। সকলেই আশঙ্কায়, যে কোনও সময় রাজ্যের বিজেপি সরকার ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করবে কেন্দ্রের নরসিংহ রাও সরকার। বাকি কাঠামোর সুরক্ষায় ঢোকাবে সামরিক, আধা-সামরিক বাহিনী। কিন্তু কোথায় কী! বেলা ৩টেয় ভেঙে পড়ল দ্বিতীয় গম্বুজ।

 

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকার পর আবার সরব হল মাইক। এ বার ভেসে এল জ্বালাময়ী ভাষণের জন্য বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) সাধ্বী ঋতম্ভরা ও উমা ভারতীয় গলা। এতক্ষণের ‘স্টান্স’ পাল্টে ফেলে হিন্দুত্ববাদী নেতানেত্রীরা এ বার স্লোগান তুললেন, ‘‘এক ধাক্কা অওর দো। বাবরি মসজিদ তোড় দো।’’ নেতারা ভেসে গেলেন ক্যাডারদের স্রোতে। উঠলাম বিতর্কিত কাঠামোর ঠিক পাশের বাড়ি, সীতা রসুই ভবনের ছাদে। রামভক্তদের বিশ্বাস, এখানেই ছিল সীতামাইয়ার রন্ধনশালা। দেখা কয়েকজন সহকর্মী সাংবাদিকের সঙ্গে। অনেকেই তখন অযোধ্যা ছেড়ে ফৈজাবাদের পথ ধরেছেন। কিন্তু আমি ঠিক করেছি, শেষ গম্বুজটা ভেঙে পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব।

 

শীতের সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। বিকেল ৪টে ৪৯ মিনিটে ভেঙে পড়ল মূল গম্বুজ। মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেল। ভাবার চেষ্টা করছি। কিন্তু কিছুই ভাবতে পারছি না। সকাল থেকে পেটে দানাপানি পড়েনি। খিদের বোধও চলে গিয়েছে।

 

নেমে এলাম সীতা রসুইয়ের তিনতলার ছাদ থেকে। চারদিকে থিক থিক করছে করসেবক। কেউ বিতর্কিত কাঠামোর ইট সংগ্রহ করছে। কয়েকজন সহকর্মীও ইট নিলেন। স্মারক। আমি নিতে গিয়েও নিলাম না। সব গাড়ি পালিয়েছে ফৈজাবাদে। আমাদের গাড়িও।  আমার দুরবস্থা দেখে স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদপত্রের ‘বহেনজি বাহিনী’ ডাক দিল, ‘‘দেবু ভাইয়া, হমারা গাড়ি মে আইয়ে।’’ মারুতি ওমনি ভ্যানের ভিতরে ঠাসাঠাসি করে বসে বাহিনী। আমি বসলাম পিছনের ডিকিতে। স্টেপনির উপর। পকেটের সিগারেট কখন শেষ হয়ে গিয়েছে। মুখে ড্রাইভারের কাছে চেয়ে নেওয়া বিড়ি। দরজা খোলা। রাস্তার এপাশে-ওপাশে টায়ার জ্বলছে। কোথাও দোকান জ্বলছে। গলির মুখে ভয়ার্ত মুখের জটলা।

আনন্দবাজার থেকে সংক্ষেপিত