ইসলামী শাসন থাকলে এ লোমহর্ষক ঘটনা দেখতে হত না

মুফতি জাওয়াদ তাহের ।।

প্রকৃতির কোলে মাথা তুলে দাঁড়ানো চোখ জুড়ানো নান্দনিক এক শহরের নাম সিলেট। সবুজ শ্যামল পাহাড়ে ঘেরা নৈসর্গিক সৌন্দর্য ছুঁয়ে দেখতে অনেকেই ছুটে যায় এই শহরে। নানা শিল্প আর স্থাপত্য বেষ্টিত এই লীলাভূমি উপভোগ করেন ভ্রমন পিপাসুগণ। আধ্যাতিক রাজধানী খ্যাত সিলেট নগরী পীর আওলিয়াদের পূণ্যভূমি বলা হয়। ওলী আওলিয়াদের পদচারণায় মুখরিত ছিল ৩৬০ আওলীয়া খ্যাত এই নগরী।

সেই ভূমিতেই কিছুদিন পূর্বে ঘটেছে রোমহর্ষক ঘটনা। বখাটে আর ছিনতাইকারীদের হাতে একজন নববধূর সম্ভ্রম লুট হয়েছে। শত করুণ আকুতি ও মিনতি করেও শেষ রক্ষাটুকু হয়নি এই মানুষরুপী জানোয়ারদের কালো থাবা থেকে। বিকৃত যৌন লালসাই তাদেরকে পাশবিক ফণা তুলতে বাধ্য করেছে।

এটি শুধু একটি ঘটনা নয়, এ ধরণের শতশত ঘটনা আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটছে। ভার্চুয়াল জগতে ভাইরাল হওয়াতেই এটা নিয়ে এত তোলপাড়। আমাদের সমাজের সর্বস্তরে এ ধরণের বিকৃত মস্তিস্কের লোক ঘাপটি মেরে আছে। তাদের লোলুপ দৃষ্টি সবসময় সুযোগ খুঁজে। কখন কার উপর নগ্ন থাবা দিবে সেই অপচেষ্টায় তারা লিপ্ত।

সেই যুগল সিলেটের এমসি কলেজের এলাকায় গিয়েছিলেন চিত্তের সুখ আহরণে। তারা কখনো ভাবেননি কি ভয়ঙ্কর পাশবিক দানবেরা ওত পেতে আছে তাদের জীবনটাকেই জাহান্নাম বানিয়ে দিতে। তারা জানেন না, সেই এলাকা এখন আর মানবিক মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তৃত্ব সেখানে চলে না।

যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে প্রকৃত মানুষ বের হয়ে আসার কথা, আজ সেখান থেকে প্রকাশ হচ্ছে এই ভয়ঙ্কর নগ্ন থাবা। সত্যিই ভাবতে আবাক লাগে। আমাদের সমাজের সম্মানবোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে! মানবতা যেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আদর্শহীন রাজনীতি ও মূল্যবোধহীন অবক্ষয়ে পতিত নষ্ট সমাজের অসুস্থ সংস্কৃতির এ দুর্গন্ধ নিয়েই দেশের মানুষ বেঁচে আছে।

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আজ যদি এ ঘটনাটি আপনার কোনো নিকটাত্মীয়, আপনার বোন, স্ত্রী বা অন্য কেউ হতো, তাহলে কেমন লাগতো। ধর্ষকগণ কি কখনো ভেবে দেখেছেন, এ মেয়েটি একজনের বোন। কারো আদরের কোমলমতি মেয়ে বা কারো মা। এমনটা ভাবলে কখনো তারা এ নগ্ন চিন্তা করতে পারতো? কখনই না। বিবেকবোধের যখন অপমৃত্যু ঘটে তখন এমন হওয়া স্বাভাবিক।

আমাদের বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছিলেন অন্ধকার এক যুগে। বর্বরতায় ভরপুর ছিল সে সমাজ। ভালো মানুষ ছিলো অতি অল্প। সেই জাহেলি যুগে এসে রাসূল এ ধরণীকে আলোকিত করেছেন। আদর্শহীন মানুষকে আদর্শের স্বর্ণ শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন। সে মানুষগুলোর জীবন এতটাই আমূল পরিবর্তন হয়েছিলো যে, হয়েছেন এ ধরণীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।

তাদের ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ ঘোষণা করেছেন,

رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ ذَٰلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ
আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্যে, যে তার পালনকর্তাকে ভয় কর। (সূরা বায়্যিনাহ ৮)

আমরা আজ ইসলাম ছেড়ে অন্য পথে শান্তি খুঁজছি। যে কারণে আমদের যতই দিন গড়াচ্ছে লাঞ্ছনার যাতাকলে পিষ্ঠ হচ্ছি। এটাই বাস্তবতা। ইসলাম ধর্ষকের জন্য যে শাস্তি নির্ধারণ করেছে, তা যদি আজ বাস্তবায়ন হতো তাহলে আজ আমাদের এ লোমহর্ষক ঘটনা দেখতে হতো না।

হযরত ওমর রা: বলেন,
إنا كنا أذل قوم فأعزنا الله بالإسلام فمهما نطلب العزة بغير ما أعزنا الله به أذلنا الله .
নিশ্চয় আমরা ছিলাম এক নিম্ন জাতি। মহান আল্লাহ নিজ দয়ায় আমাদের ইসলামের ছায়াতলে এনে সম্মানিত করেছেন। এখন আমরা যদি ইসলামকে ছেড়ে অন্য পথে সম্মান তালাশ করি, তাহলে তিনি আমাদের অসম্মান করবেন (পদে পদে লাঞ্ছিত করবেন)। ( মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, হদিস: ২১৪)

মহান আল্লাহ ধর্ষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন:

وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীলতা ও বিপথগামিতা। (সূরা বনী ইসরাইল : ৩২)

ব্যভিচারের কাছে যেতে নিষেধ করেছেন। যে সকল জিনিষ ব্যভিচারের প্রতি ধাবিত করে তা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। যিনা কত নিকৃষ্ট তা বোঝার জন্য এই একটি আয়াতই যথেষ্ট। এখানে ‘যিনা করো না’ এ কথা বলা হয়নি; বরং এর কাছে যেতেও নিষেধ করা হয়েছে। এ থেকে অনুমান করা যায়, এটা কত জঘন্য অপরাধ। কিন্তু আমরা এ ক্ষেত্রে কতটুকু নিয়ম মেনে চলি ? বরং এ সবকে উপেক্ষা করে অশ্লীলতার জাল এমনভাবে বিছিয়ে দিয়েছি, যার ফলাফল আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি।

ব্যভিচারের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,

الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ وَلَا تَأْخُذْكُم بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِّنَ الْمُؤْمِنِين
‘ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’ (সুরা নুর : আয়াত ২)

যে স্রষ্টা আমাদের সৃষ্টি করেছেন তার অনুশাসন যতদিন আমরা গ্রহণ না করবো, ততদিন আমাদের এ ধরণের হৃদয় দগ্ধ করা ঘটনা চোখ বুজে দেখতে হবে।

আমরা কি একবার চিন্তা করেছি, ধর্ষকরা নানান প্রভাবে আইনের ফাঁক-ফোকর গলে কিছুদিন জেল খেটে বেরিয়ে নির্লজ্জের মতো সমাজে বহাল তবিয়তে হাঁটে। পরিবার তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে না। সমাজও তাদের ঘৃণার সঙ্গে বয়কট করে না। উল্টো ধর্ষিতার ওপর ঘটে যাওয়া বর্বরতায় তার দিকে বাঁকা চোখে তাকায়। অথচ একজন ধর্ষিতা তার ওপর সংঘটিত পাশবিকতার বিচার পেলেও আমৃত্যু সেই ধর্ষণের দগদগে ক্ষত হৃদয়ে বহন করে যেতে হয়। শরীরের প্রতি এক ধরনের ঘৃণা কাজ করে। পুরুষ দেখলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে যায়। এর কারণে অনেক সময় যৌন নিপীড়নের শিকার ধর্ষিতা আত্মহত্যার মত জঘন্য পথ বেছে নেয়।
শুভ বুদ্ধির উদয় হোক আমাদের মাঝে- সেই কামনা।

পূর্ববর্তি সংবাদচীনের জাতীয় দিবসে বিএনপি মহাসচিবের শুভেচ্ছা
পরবর্তি সংবাদপদ ছাড়লেন মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, বেফাকের নতুন মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক